Kaler Alo
রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬
১৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

নড়াইল সংবাদদাতা,কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ১২:১০ পিএম

মাছের আড়ত ঘিরে বদলেছে চাকইয়ের অর্থনীতি

নড়াইল সংবাদদাতা,কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ১২:১০ পিএম

মাছের আড়ত ঘিরে বদলেছে চাকইয়ের অর্থনীতি

ভোরের আলো ফুটতেই নড়াইলের চাকই বাজারে শুরু হয় মাছের বেচাকেনার ব্যস্ততা। ভ্যান, নছিমন, অটোরিকশা ও পিকআপে করে বিভিন্ন ঘের, নদী-খাল ও বিল থেকে তাজা মাছ নিয়ে আসেন চাষি ও জেলেরা। অন্যদিকে মাছ কিনতে ভিড় করেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে বাজারের মাছের আড়ত।

নড়াইল সদর উপজেলার বিছালী ইউনিয়নের চাকই বাজারের এই মাছের আড়ত এখন স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে মাছের বেচাকেনা। বাজার কমিটির সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন এখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়। মাছের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান হয়েছে শতাধিক মানুষের।

একটি দোকান থেকে পাঁচটি আড়ত
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, আড়তদাররা টেবিল পেতে মাছ কেনাবেচার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছেন। একের পর এক নছিমন, ভ্যান, অটোরিকশা ও মিনি ট্রাকে করে মাছ নিয়ে আসছেন ঘেরমালিক ও জেলেরা। কেউ মাছ বিক্রি করছেন, আবার কেউ পছন্দমতো মাছ কিনে নিচ্ছেন। কিছু ব্যবসায়ী মাছের সতেজতা ধরে রাখতে লাইভ ফিশ হোল্ডিং সিস্টেমে মাছ জীবিত রাখছেন। ক্রেতা-বিক্রেতাদের দরদাম ও হাঁকডাকে পুরো এলাকা হয়ে উঠছে প্রাণবন্ত।

আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১০ বছর আগে মাত্র একটি দোকান নিয়ে চাকই বাজারে মাছের আড়তের যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে এখানে পাঁচটি মাছের আড়ত রয়েছে। নবগঙ্গা, চিত্রা ও মধুমতি নদীর মাছ ছাড়াও আশপাশের খাল-বিল এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন মাছের ঘের থেকে মাছ আসে এ বাজারে। ব্যবসায়ীরা এসব মাছ পাইকারি দামে কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে পাঠান। পাশাপাশি ছোট পাইকাররা গ্রামের বাজার ও পাড়া-মহল্লায় মাছ সরবরাহ করেন।

প্রতিদিন বেচাকেনা ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার
চাকই বাজারের মাছের আড়ত শুধু স্থানীয় চাষিদের জন্য নয়, দূর-দূরান্তের পাইকারদের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন বাগেরহাট, ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রংপুর, নাটোরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে মাছ কিনতে আসেন। আড়তদারদের পাশাপাশি অন্তত ২৫ জন খুচরা বিক্রেতা প্রতিদিন বাজারে মাছ বিক্রি করেন। স্থানীয় ও বাইরের ক্রেতারা পাইকারি এবং খুচরা—দুইভাবেই মাছ কেনেন। বাজার কমিটির সদস্যদের হিসাবে, প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয় এখানে।

নাটোর থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল বলেন, তিনি বিভিন্ন এলাকায় মাছের ব্যবসা করেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা আসায় সকাল থেকেই চাকই বাজারের আড়ত জমজমাট থাকে। বাগেরহাট, ঢাকা, রংপুর ও নাটোরসহ নানা জেলার ব্যবসায়ীরা এখানে মাছ কিনতে আসেন।

নিরাপদ পরিবেশে ন্যায্য দামে মাছ বিক্রি
স্থানীয় মাছচাষিদের কাছে চাকই বাজারের অন্যতম আকর্ষণ হলো নিরাপদ পরিবেশ ও সঠিক ওজনে বেচাকেনার সুযোগ। এখানে একাধিক আড়ত থাকায় চাষিরা নিজেদের পছন্দমতো যেকোনো আড়তে মাছ বিক্রি করতে পারেন। এতে ন্যায্য দাম পাওয়ার পাশাপাশি দূরের বাজারে মাছ নিয়ে যাওয়ার সময় ও পরিবহন খরচও বাঁচছে।

নড়াইল সদর উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের শোলপুর গ্রামের মাছচাষি পারভেজ মোল্যা নিজের ঘেরের মাছ নিয়ে নছিমনে করে চাকই বাজারে এসেছিলেন। তিনি বলেন, চাকই বাজারের মতো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অন্য কোথাও পাননি। এখানে কোনো ঝামেলা বা চুরির আশঙ্কা নেই। সঠিক ওজনে মাছ কেনাবেচা হয়। পাঁচটি আড়ত থাকায় যে কেউ নিজের পছন্দমতো জায়গায় মাছ বিক্রি করতে পারেন। এতে তাঁদের সময় ও যাতায়াত খরচও কমে।

আড়ত ঘিরে কর্মসংস্থান শতাধিক মানুষের
চাকই বাজারে মাছের আড়ত গড়ে ওঠায় এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় মাছের ঘের বেড়ে যাওয়ায় কৃষিকাজের সুযোগ কমেছে, সেসব এলাকার অনেক মানুষ এখন আড়তে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। মাছের আড়তে কাজ করা শ্রমিক রুবেল হোসেন বলেন, জেলা শহর তাঁদের এলাকা থেকে অনেক দূরে। রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গেলে যাতায়াতেই অনেক সময় চলে যায়। আবার অনেক জমি মাছের ঘের হয়ে যাওয়ায় মাঠের কাজও কমেছে। চাকই বাজারে মাছের আড়ত গড়ে ওঠায় সেখানে কাজ করে উপার্জনের সুযোগ হয়েছে।

রুবেলের মতো প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন মানুষ এই বাজারে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন। মাছ ওঠানো, নামানো, বাছাই, পরিবহন ও কেনাবেচাসহ নানা কাজে যুক্ত রয়েছেন তাঁরা। মেসার্স রূপালি ফিসের স্বত্বাধিকারী এম এম আজিম উদ্দিন বলেন, মাছচাষিরা যেন তাঁদের উৎপাদিত মাছের ন্যায্য দাম পান এবং হাসিমুখে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেটাই তাঁদের লক্ষ্য। এ বাজারের মাধ্যমে শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব
চাকই বাজারের মাছের আড়ত ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। আগে মাছ বিক্রির জন্য চাষিদের দূরের বাজারে যেতে হতো। এখন বিভিন্ন জেলার পাইকাররা এক জায়গায় আসায় সহজেই মাছ বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন তাঁরা। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে পরিবহন, শ্রম ও খুচরা ব্যবসার ক্ষেত্রেও নতুন কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

চাকই চৌরাস্তা বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, বাজারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের মাছ সকাল থেকে বিক্রি হয়। বাজারটি জমে ওঠায় এলাকার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এখানে আসা ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য বাজার কমিটি তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। একটি দোকান থেকে শুরু হওয়া চাকই বাজারের মাছের আড়ত এখন পাঁচটি আড়ত, প্রতিদিনের লাখ লাখ টাকার বেচাকেনা এবং শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের কেন্দ্র। মাছচাষি, শ্রমিক ও পাইকারদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে বাজারটি নড়াইলের স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

Link copied!