কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ঘিরে গত কয়েক বছরে প্রযুক্তি বিশ্বে যে বিনিয়োগের জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তাতে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। একের পর এক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দরপতন, বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা নিয়ে সংশয় এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণে বাড়তে থাকা নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এআই খাতের স্বর্ণযুগ কি শেষ হতে চলেছে?
২০২২ সালের শেষ দিকে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি উন্মুক্ত হওয়ার পর এআই নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি করপোরেট বিশ্বেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। অনেকটা আধুনিক যুগের ‘স্বর্ণ খোঁজার হিড়িকের’ মতো বিনিয়োগকারীরা অর্থ ঢালতে শুরু করেন এ খাতে। কম্পিউটার চিপ ও নেটওয়ার্কিং অবকাঠামো নির্মাতা, ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে এআই প্রযুক্তি উদ্ভাবনকারী কোম্পানিগুলোও এ বিনিয়োগের বড় সুবিধাভোগী হয়। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারমূল্য দ্রুত বেড়ে যায়।
তবে এখন সেই উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ—এআই খাতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা কি প্রত্যাশিত মুনাফা এনে দিতে পারবে?
বিপুল বিনিয়োগ, মুনাফা নিয়ে সংশয়
গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এআই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই বিপুল বিনিয়োগ প্রযুক্তি অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখলেও এর আর্থিক সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ভবিষ্যতে মুনাফার প্রত্যাশায় অর্থ বিনিয়োগ করেন। কিন্তু এআই খাতে বিপুল ব্যয়ের তুলনায় আয় কতটা বাড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উচ্চ বাজারমূল্য ধরে রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তির সম্ভাবনা থাকলেও সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারমূল্য বাস্তব আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। প্রত্যাশিত মুনাফা না এলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ার বিক্রি করে দিতে পারেন।
ডেটা সেন্টার নিয়ে বাড়ছে জনঅসন্তোষ
এআই প্রযুক্তির বিস্তারের জন্য ডেটা সেন্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য এসব স্থাপনায় প্রচুর বিদ্যুৎ ও পানি প্রয়োজন হয়। ফলে ডেটা সেন্টার নির্মাণকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশগত ও সামাজিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার, শব্দদূষণ, জমির ওপর চাপ এবং স্থানীয় পরিবেশের পরিবর্তন নিয়ে সাধারণ মানুষের আপত্তি বাড়ছে। গত মে মাসে প্রকাশিত এক গ্যালাপ জরিপে দেখা যায়, ৭১ শতাংশ আমেরিকান তাঁদের এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করবেন। তুলনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতার হার ছিল ৫৩ শতাংশ।
এই জনঅসন্তোষ রাজনৈতিক বিতর্কেও জায়গা করে নিয়েছে। ডেমোক্র্যাট নেতাদের অনেকে ডেটা সেন্টারের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ধরে রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান ও পরিবেশের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।
টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাট জেমস ট্যালারিকো বলেছেন, এআইয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব বজায় রাখা জরুরি। তবে কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে শিশুদের শিক্ষাজীবন—সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই নাগরিকদের সুরক্ষা এবং ব্যবসার জন্য স্পষ্ট ও ধারাবাহিক আইন প্রয়োজন।
নির্বাচনের ফলেও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পর এআই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ডেটা সেন্টার নির্মাণ, জ্বালানি ব্যবহার এবং এআই প্রযুক্তির প্রয়োগে নতুন বিধিনিষেধ আসতে পারে।
টেক্সাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নর জিনা হিনোজোসা ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছেন। নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই অবস্থান প্রযুক্তি খাতের বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে টেক্সাসে স্পেসএক্স ও টেসলার কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা ইলন মাস্কের মতো উদ্যোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রচারণায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছিলেন মাস্ক।
তবে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক দরপতনের পুরো দায় নির্বাচনের ফলের ওপর চাপানো যাচ্ছে না। কারণ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অতিমূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগ নির্বাচনের আগেই তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এআই কি বুদবুদ, নাকি সাময়িক সংশোধন?
এআই খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করছেন, অতিরিক্ত প্রত্যাশার কারণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারমূল্য বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছিল। এখন বাজার সেই মূল্যায়ন সংশোধন করছে। অন্যদের আশঙ্কা, এআই খাতে বিনিয়োগের জোয়ার কমে গেলে এর প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
‘ফিউচার মার্কেট ইনসাইটস’-এর নন্দিনী রায় চৌধুরীর মতে, ডেটা সেন্টার নির্মাণ, জ্বালানি ব্যবহার এবং এআই প্রযুক্তির প্রয়োগে নতুন বিধিনিষেধ আসে কি না, বিনিয়োগকারীরা এখন তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। তাঁর ধারণা, প্রযুক্তি শেয়ারে দ্রুত ও ব্যাপক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আপাতত কম। বিনিয়োগকারীরা এখন বেশি যাচাই-বাছাই করবেন এবং আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে ঝুঁকবেন।
অন্যদিকে, ‘আর্ম হোল্ডিংস’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা টিউডর ব্রাউন মনে করেন, এআই খাতের ওপর বর্তমান চাপের প্রভাব সীমিত হতে পারে। তাঁর মতে, সীমাহীন প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশায় শেয়ারমূল্য অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল। সেই অতিরিক্ত মূল্যায়নের পর বাজারে কিছুটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে সংশোধনের একটি সীমা রয়েছে। সেই পর্যায় অতিক্রম করলে বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কারণ অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এখনো উল্লেখযোগ্য আয় করছে।
সব মিলিয়ে, এআই খাতের সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগের মতো অন্ধ উচ্ছ্বাসের পরিবর্তে মুনাফা, আর্থিক সক্ষমতা, পরিবেশগত প্রভাব ও সরকারি নীতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি এসব বিষয়ও বড় ভূমিকা রাখবে।
কালের আলো/এসএ/জেএন
