তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০২:০৯ পিএম

প্রকৌশল পড়েননি, তবু বানালেন উড়ন্ত গাড়ি; স্বপ্নপূরণে ১৩ বছরের সাধনা

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০২:০৯ পিএম

প্রকৌশল পড়েননি, তবু বানালেন উড়ন্ত গাড়ি; স্বপ্নপূরণে ১৩ বছরের সাধনা

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা সড়ক পেরিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে লাগে দীর্ঘ সময়। দুর্গম এলাকার মানুষের যাতায়াতের এই ভোগান্তিই একসময় নতুন স্বপ্ন দেখায় ভারতের এক তরুণকে। সেই স্বপ্ন থেকেই উড়ন্ত গাড়ি তৈরির উদ্যোগ। আনুষ্ঠানিক প্রকৌশল শিক্ষা ছাড়াই দীর্ঘ ১৩ বছরের শেখা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর অধ্যবসায়ে বৈদ্যুতিক উড়ন্ত গাড়ির একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন উত্তরাখণ্ডের আলমোড়া জেলার রবি তামতা।

মানবিক বিভাগে স্নাতক করা তামতার তৈরি এক আসনের এই উড়ন্ত যানের নাম ‘হাপিডা স্কাইনেক্স’। গত আগস্টে যানটির পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। অনলাইন থেকে তথ্য সংগ্রহ, নিজস্ব উদ্যোগে হাতে-কলমে কাজ এবং পরিবারের সহায়তায় তিনি ধাপে ধাপে এগিয়েছেন এই উদ্ভাবনের পথে।

তবে প্রোটোটাইপটির পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সফল হওয়া মানেই এটি যাত্রী পরিবহনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত, এমন নয়। বাস্তবে ব্যবহারের আগে এর নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের বিষয়গুলো যাচাই করতে হবে।

পাহাড়ি পথের ভোগান্তি থেকে উড়ন্ত গাড়ির ভাবনা
রবি তামতার বেড়ে ওঠা উত্তরাখণ্ডের জাগেশ্বর ধামের কাছে কাফলিখান এলাকায়। পাহাড়ি অঞ্চলের আঁকাবাঁকা ও দীর্ঘ সড়কপথে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা থেকেই ব্যক্তিগত আকাশযান তৈরির ভাবনা তাঁর মাথায় আসে।

২০১৫ সালে উড়ন্ত গাড়ি তৈরির স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেন তিনি। সেই ভাবনাকে সামনে রেখে নিজের উদ্যোগ ‘হাপিডা স্কাই প্রাইভেট লিমিটেড’-এর মাধ্যমে যানটির প্রোটোটাইপ তৈরি করেন।

তামতার লক্ষ্য, দুর্গম অঞ্চলে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াত সহজ করা। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসার মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত চলাচলের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা তাঁকে এই উদ্ভাবনে উৎসাহিত করেছে।

কীভাবে উড়বে হাপিডা স্কাইনেক্স?
হাপিডা স্কাইনেক্স একটি এক আসনের বৈদ্যুতিক আকাশযানের প্রোটোটাইপ। এর নকশায় একাধিক বৈদ্যুতিক মোটর ও প্রপেলার ব্যবহার করা হয়েছে। মাল্টিরোটর ড্রোনের প্রযুক্তির সঙ্গে মিল রেখে তৈরি এই যানটি রানওয়ে ছাড়াই খাড়াভাবে ওঠানামার জন্য নকশা করা হয়েছে।

যানটির কাঠামো হালকা রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে চালকের বসার জায়গা বা ককপিট এবং স্বচ্ছ ক্যানোপি রয়েছে। ব্যাটারিচালিত হওয়ায় এটি প্রচলিত বিমানের মতো তরল জ্বালানির ওপর নির্ভর করে না।

তবে বৈদ্যুতিক আকাশযান তৈরির ক্ষেত্রে শুধু উড়তে পারাই যথেষ্ট নয়। ব্যাটারির ধারণক্ষমতা, একবার চার্জে কত দূর যাওয়া যাবে, যানের ভারসাম্য, আবহাওয়ার প্রভাব এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে অবতরণের সক্ষমতা—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। হাপিডা স্কাইনেক্সের এসব সক্ষমতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো জানা যায়নি।

ইন্টারনেটই ছিল তাঁর শেখার বড় ভরসা
তামতা স্থানীয় একটি জুনিয়র হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে নৈনিতাল ক্যাম্পাস থেকে মানবিক বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন। প্রচলিত প্রকৌশল শিক্ষা বা বিশেষায়িত গবেষণাগারের সুযোগ না থাকলেও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তাঁকে থামাতে পারেনি।

অনলাইনে বিভিন্ন তথ্য ও প্রযুক্তিগত উপকরণ দেখে তিনি নিজের জ্ঞান বাড়িয়েছেন। এরপর হাতে-কলমে পরীক্ষা চালিয়ে উদ্ভাবনের কাজ এগিয়ে নিয়েছেন। তাঁর বাবা হরিশ রাম পেশায় একজন মেকানিক। পরিবারের সহায়তাও এই দীর্ঘ প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে উড়ন্ত যান নির্মাণ অত্যন্ত জটিল একটি কাজ। নকশা তৈরি থেকে শুরু করে মোটর, ব্যাটারি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও কাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পরীক্ষা প্রয়োজন। তাই প্রোটোটাইপ তৈরির পাশাপাশি এর কারিগরি সক্ষমতা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।

উড়ন্ত গাড়ির আগেও ছিল নানা উদ্ভাবন
হাপিডা স্কাইনেক্সই তামতার প্রথম উদ্ভাবন নয়। এর আগে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে একাধিক যন্ত্র তৈরি করেছেন বলে জানা গেছে।

তাঁর উদ্ভাবনের তালিকায় রয়েছে মোবাইল ফোন চার্জ করার সুবিধাযুক্ত জুতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের চলাচলে সহায়ক স্মার্ট লাঠি, বাঁশ চেরার যন্ত্র এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম। বন বিভাগের কাজে ব্যবহার উপযোগী অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র তৈরির উদ্যোগও নিয়েছেন তিনি।

এসব উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে প্রযুক্তিকে বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন তামতা। এবার উড়ন্ত গাড়ির প্রোটোটাইপ তৈরি করে সেই প্রচেষ্টাকে আরও উচ্চতায় নেওয়ার লক্ষ্য তাঁর।

দুর্গম এলাকায় যাতায়াতে কতটা কাজে আসবে?
পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে জরুরি চিকিৎসা, উদ্ধারকাজ এবং স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে উল্লম্বভাবে ওঠানামা করতে সক্ষম বৈদ্যুতিক আকাশযানের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাস্তবে এমন যান ব্যবহার করতে হলে এর উড্ডয়নসীমা, বহনক্ষমতা, ব্যাটারির কার্যকারিতা, আবহাওয়ায় চলার সক্ষমতা এবং পরিচালন ব্যয় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

হাপিডা স্কাইনেক্সের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় যাচাই করা বাকি। যাত্রী পরিবহন বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নিরাপত্তা যাচাই অপরিহার্য।

রবি তামতার উদ্যোগ তাই আপাতত একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিগত প্রচেষ্টা। প্রকৌশল বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও শেখার আগ্রহ, দীর্ঘদিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা তাঁকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এখন তাঁর তৈরি উড়ন্ত যানটি কতটা নিরাপদ, কার্যকর ও ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে, সেটিই দেখার বিষয়।

কালের আলো/এসএ/জেএন

Link copied!