কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতিতে বদলে যাচ্ছে অনুবাদের জগৎ। চ্যাটজিপিটি ও ক্লডের মতো বড় ভাষার মডেল এখন শুধু শব্দের অর্থ অনুবাদ করছে না, বরং বাক্যের প্রেক্ষাপট, লেখার ধরন এবং সাংস্কৃতিক অর্থ বুঝে আরও সাবলীল অনুবাদ দিতে পারছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় অনুবাদ সেবা গুগল ট্রান্সলেট কি ধীরে ধীরে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে গুরুত্ব হারাচ্ছে?
তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যার হিসাবে এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে গুগল ট্রান্সলেট। ২০০৬ সালের ২৮ এপ্রিল চালু হওয়া এই সেবা বর্তমানে প্রতি মাসে ১০০ কোটির বেশি মানুষ ব্যবহার করেন। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, ট্রান্সলেট, সার্চ, লেন্স ও সার্কল টু সার্চ মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি শব্দ অনুবাদ করা হয়।
অনুবাদে নতুন সুবিধা দিচ্ছে এআই
প্রচলিত মেশিন অনুবাদে সাধারণত বাক্যের শব্দগুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে অর্থ নির্ধারণ করা হতো। ফলে অনেক সময় অনুবাদ হতো আক্ষরিক, যা মূল বক্তব্যের স্বাভাবিকতা বা আবেগ ধরে রাখতে পারত না। অন্যদিকে, বড় ভাষার মডেল পুরো অনুচ্ছেদ একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে। এতে লেখাটি আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক নাকি কথোপকথনের ধরনে লেখা, তা বিবেচনায় নিয়ে অনুবাদ করা সম্ভব হচ্ছে।
এআইভিত্তিক অনুবাদের আরেকটি বড় সুবিধা হলো ব্যবহারকারীর নির্দেশনা অনুযায়ী অনুবাদ পরিবর্তনের সুযোগ। কোনো অনুবাদ পছন্দ না হলে সেটিকে আরও আনুষ্ঠানিক, সহজ কিংবা সাবলীল করে লেখার নির্দেশ দেওয়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী একই লেখার একাধিক সংস্করণও তৈরি করা সম্ভব। প্রচলিত অনুবাদ অ্যাপগুলোতে আগে এভাবে কথোপকথনের মাধ্যমে অনুবাদ সংশোধনের সুযোগ ছিল না।
২০২৫ সালে চীনা ভাষার পর্যটনবিষয়ক লেখা নিয়ে করা একটি তুলনামূলক গবেষণায় দেখা যায়, মূল লেখার প্রতি বিশ্বস্ততা, সাবলীলতা এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটি গুগল ট্রান্সলেট ও ডিপএলকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে অনুবাদের নির্দেশনায় সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা হলে চ্যাটজিপিটির ফল আরও ভালো ছিল।
তবে ইউরোপীয় ভাষার অনুবাদে এখনো ডিপএলের সুনাম রয়েছে। জার্মান প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব পরীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, একই মানের অনুবাদ পেতে গুগলের অনুবাদে দ্বিগুণ এবং চ্যাটজিপিটি-৪-এর অনুবাদে তিন গুণ সম্পাদনার প্রয়োজন হয়। যদিও এটি ডিপএলের নিজস্ব দাবি, স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো ফল নয়। ইউরোপের বাইরের ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে ডিপএলের এই সুবিধা অনেকটাই কমে যায়।
ভাষার বৈচিত্র্যে এগিয়ে গুগল
অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাষার সংখ্যা গুগল ট্রান্সলেটের অন্যতম বড় শক্তি। বর্তমানে প্রায় ২৫০টি ভাষা সমর্থন করে এই সেবা। অন্যদিকে, ডিপএলের তালিকায় রয়েছে প্রায় ৩৩টি ভাষা।
২০২৪ সালে একসঙ্গে ১১০টি নতুন ভাষা যুক্ত করেছিল গুগল। এসব ভাষার মধ্যে ছিল ক্যান্টনিজ, ম্যাঙ্কস ও টক পিসিনের মতো ভাষা। নতুন যুক্ত হওয়া ভাষাগুলো মিলিয়ে প্রায় ৬১ কোটি মানুষের ভাষাগত চাহিদা পূরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে ভাষার সংখ্যা বেশি হলেও সব ভাষায় অনুবাদের মান সমান নয়। বিশেষ করে কম প্রচলিত ভাষার ক্ষেত্রে অনুবাদে ভুল বা অসংগতি দেখা দিতে পারে। গুগল ট্রান্সলেটও এ সীমাবদ্ধতার বাইরে নয়।
ভ্রমণে এখনো কার্যকর গুগল ট্রান্সলেট
দৈনন্দিন ব্যবহার এবং ভ্রমণের ক্ষেত্রে গুগল ট্রান্সলেটের সুবিধা এখনো অনেক বেশি। বিদেশে গিয়ে কোনো রেস্তোরাঁর মেনু, রাস্তার সাইনবোর্ড কিংবা অপরিচিত ভাষার লেখা বুঝতে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে তাৎক্ষণিক অনুবাদ করা যায়। আবার প্রয়োজনীয় ভাষা আগে থেকে ডাউনলোড করে রাখলে ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াও অনুবাদ করা সম্ভব।
অন্য কেউ কথা বললে তাৎক্ষণিকভাবে শুনে অনুবাদ বোঝার সুবিধাও রয়েছে। পাশাপাশি ক্রোম ব্রাউজারে পুরো ওয়েবপেজ এক ক্লিকেই অনুবাদ করা যায়। গুগল সার্চ ও অ্যান্ড্রয়েডের সঙ্গে ট্রান্সলেটের সংযুক্তি থাকায় অনেক ক্ষেত্রে আলাদা অ্যাপ খোলারও প্রয়োজন হয় না। এসব সুবিধার কারণে দ্রুত কোনো শব্দের অর্থ জানা কিংবা ভ্রমণের সময় তাৎক্ষণিক অনুবাদের জন্য গুগল ট্রান্সলেট এখনো ব্যবহারকারীদের কাছে সহজ সমাধান।
জেমিনি যুক্ত করে প্রতিযোগিতায় গুগল
এআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় গুগলও নিজেদের অনুবাদ সেবায় পরিবর্তন আনছে। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটি জানায়, গুগল ট্রান্সলেটের টেক্সট অনুবাদে এখন তাদের নিজস্ব জেমিনি মডেল ব্যবহার করা হচ্ছে।
এর উদাহরণ হিসেবে ইংরেজি বাগধারা ‘stealing my thunder’-এর কথা উল্লেখ করেছে গুগল। প্রচলিত অনুবাদে শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থ নেওয়ায় এর প্রকৃত বক্তব্য বোঝা কঠিন হতো। কিন্তু জেমিনি মডেল বাক্যের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বাগধারাটির আসল অর্থ ধরার চেষ্টা করে।
একই ঘোষণায় হেডফোনের মাধ্যমে বাস্তব সময়ে এক ভাষার কথাকে অন্য ভাষায় শোনার পরীক্ষামূলক সুবিধার কথাও জানানো হয়। এ সুবিধায় বক্তার কণ্ঠের সুর এবং কথা বলার স্বাভাবিক ছন্দ ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে জেমিনির এই নতুন সুবিধা এখনো সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে এটি চালু করা হয়েছে। ইংরেজি থেকে এবং ইংরেজিতে স্প্যানিশ, হিন্দি, চীনা, জাপানি ও জার্মানসহ প্রায় ২০টি ভাষায় অনুবাদের সুযোগ রয়েছে।
কোন কাজে কোন অনুবাদ টুল
অনুবাদের জন্য কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, তা মূলত কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে। দ্রুত কোনো শব্দের অর্থ জানা, ভ্রমণের সময় মেনু বা সাইনবোর্ড বোঝা কিংবা কম প্রচলিত ভাষার লেখা অনুবাদের ক্ষেত্রে গুগল ট্রান্সলেট এখনো কার্যকর ও সহজলভ্য।
অন্যদিকে, ইমেইল, আবেদনপত্র কিংবা দীর্ঘ প্রবন্ধের মতো লেখায় ভাষার সুর, বক্তব্যের ধরন ও ভাব বজায় রাখা জরুরি হলে চ্যাটজিপিটি, ক্লড বা ডিপএল ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এসব টুলে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা দিয়ে অনুবাদ আরও পরিমার্জন করার সুযোগ রয়েছে।
তবে আইনি নথি, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিপত্র অনুবাদের ক্ষেত্রে কোনো এআই বা স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ ব্যবস্থার ওপর এককভাবে নির্ভর করা নিরাপদ নয়। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথি ব্যবহার বা প্রকাশের আগে দুই ভাষায় দক্ষ একজন মানুষের মাধ্যমে অনুবাদ যাচাই করে নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, এআইয়ের অগ্রগতিতে অনুবাদের ধরন বদলালেও গুগল ট্রান্সলেটের প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বরং কাজের ধরন অনুযায়ী প্রচলিত অনুবাদ অ্যাপ ও এআইভিত্তিক টুলের ব্যবহার আলাদা হয়ে উঠছে।
কালের আলো/এসএ/এসএআর
