পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, সরকারি নির্দেশ অমান্য ও অসদাচরণের অভিযোগে তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্য একজনকে দেওয়া হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসর।
শাস্তির আওতায় আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ কমিশনার ও সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা। শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর স্বাক্ষরিত পৃথক প্রজ্ঞাপনে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ ও শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া, সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া ছয় কর্মকর্তা হলেন ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জি, সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার ফারহানা তাসকিন, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার এবং সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান। আর সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
বিদেশে গিয়ে আর ফেরেননি দুই কর্মকর্তা
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ফারহানা তাসকিন ও মো. মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশে অবস্থান করে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
ফারহানা তাসকিন ডিএমপির প্রশাসন-ট্রাফিক উত্তর বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ৪২ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে কানাডায় যান তিনি। পরে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আরও ৩৬ দিনের ছুটি বাড়ানোর আবেদন করেন। এরপর কানাডার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন বছর মেয়াদি সিপিএ কোর্সে পড়াশোনার জন্য শিক্ষাছুটির আবেদন করেন ফারহানা। তবে মন্ত্রণালয় তাঁর আবেদন নাকচ করে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তিনি আর দেশে ফেরেননি।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ ছুটি শেষ হওয়ার পরও কর্মস্থলে যোগ দেননি তিনি। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি। পরে সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। অন্যদিকে, ডিএমপির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে প্রেষণে যান। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় তাঁর বিনা বেতনে ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হয়।
সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আরও দুই বছরের ছুটির আবেদন করেন তিনি। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই আবেদন নাকচ করে তাঁকে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। নির্দেশনা পাওয়ার পরও দেশে ফেরেননি তিনি। এ ঘটনায় ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব না দেওয়া এবং সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শের পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ সর্বশেষ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন তিনি। তাঁর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং ই-মেইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কর্মস্থলে ফিরে আসেননি।
এ ঘটনায় ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশেরও কোনো জবাব দেননি তিনি। পরে সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জি সর্বশেষ ট্যুরিস্ট পুলিশে কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি তাঁকে রাজশাহীতে রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ২২ জানুয়ারি সেখানে যোগদানের পর একই দিন তিন সপ্তাহের বিশ্রামের কথা উল্লেখ করে প্রস্থান প্রতিবেদন জমা দেন তিনি। তবে নির্ধারিত সময় শেষে আর কর্মস্থলে যোগ দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে ওই বছরের ৩ জুলাই বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট নৌ পুলিশে সংযুক্ত হয়ে যোগদান করেন। অসুস্থতার কথা জানিয়ে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তাতে ছুটির ধরন, মেয়াদ ও অবস্থানের স্থান উল্লেখ করেননি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দেননি তিনি। একাধিকবার নোটিশ পাঠানোর পরও কর্মস্থলে যোগ দেননি। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে উভয় অভিযোগ প্রমাণিত হয়। সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
ছুটি শেষে ফেরেননি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান নৌ পুলিশের টাঙ্গাইল অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন। ১৫ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর কর্মস্থল ত্যাগ করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে আরও ৬০ দিনের ছুটি বাড়ানোর আবেদন করলেও তা নাকচ হয়। এরপরও কর্মস্থলে যোগ দেননি জাহাঙ্গীর হাছান। তাঁর বিরুদ্ধে পলায়নের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
অসদাচরণের অভিযোগে সহকারী পুলিশ সুপারের অবসর
অন্যদিকে, সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত না করে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দিনাজপুর জেলায় কর্মরত ছিলেন। এর আগে ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক জোনে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিভাগীয় মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় কাজী মিজানুর রহমানের। পরে ওই নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার আদালতের পর্যবেক্ষণেও তাঁদের স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে বিভাগীয় নথির সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভাগীয় তদন্তে বলা হয়, একজন পুলিশ কর্মকর্তার এমন কর্মকাণ্ডে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ এবং ২৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষর করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক আদেশ অবিলম্বে কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
