কালের আলো

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ১১:৪৮ এএম

মশা বদলেছে, বদলায়নি প্রস্তুতি!

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ১১:৪৮ এএম

মশা বদলেছে, বদলায়নি প্রস্তুতি!

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ক্যালেন্ডার আর বর্ষার পাতায় আটকে নেই। জুন-জুলাইয়ের পরিচিত সংক্রমণ এখন গড়িয়ে যাচ্ছে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত। শীতেও মিলছে আক্রান্তের খবর। একসময় যে রোগকে মৌসুমি আতঙ্ক হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তা এখন বছরের প্রায় প্রতিটি সময়েই মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। আর এই ভয়াবহতার কেন্দ্রে রয়েছে এডিস মশা—যে মশা গত তিন দশকে শুধু বিস্তারই ঘটায়নি, বদলে ফেলেছে নিজের জীবনচক্র ও টিকে থাকার কৌশল।

পরিসংখ্যান বলছে, ডেঙ্গুর ভয়াবহতম অধ্যায় রচিত হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত দেড় দশকে এ রোগে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ৮১০ জন। এর মধ্যে গত পাঁচ বছরেই মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ২২৩ জনের। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৫ শতাংশই ঘটেছে সর্বশেষ পাঁচ বছরে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সরকারি হিসাবের বাইরেও রয়েছে আরও মৃত্যু, যা প্রকৃত সংকটের গভীরতাকে আড়াল করছে।

  • ১১-১৩ দিনেই নতুন প্রজন্ম, সারা বছর ডেঙ্গুর বিস্তার 

  • পাঁচ বছরেই ৩ হাজার ২২৩ মৃত্যু 

  • নিয়ন্ত্রণে মৌসুমি উদ্যোগই ভরসা

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানুষ যখন পুরোনো অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করছে, তখন এডিস মশা বদলে নিচ্ছে তার টিকে থাকার কৌশল। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আগে ১৪ থেকে ১৭ দিনে জীবনচক্র সম্পন্ন করা মশাটি এখন অনুকূল পরিবেশে মাত্র ১১ থেকে ১৩ দিনেই নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে পারছে। অর্থাৎ মশা নিধনের উদ্যোগ নেওয়ার আগেই দ্রুত বাড়ছে তার নতুন প্রজন্ম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় এই বিস্তারের জন্য তৈরি হচ্ছে আরও অনুকূল পরিবেশ।

বদলে গেছে ডেঙ্গুর বাংলাদেশ
দেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস খুব পুরোনো নয়। ১৯৬৪ সালে অজানা জ্বর হিসেবে রোগটির উপস্থিতির কথা জানা গেলেও এডিস মশা নিয়ে প্রাথমিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে সময় দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ছিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে এডিস মশা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে কি না, তা অনুসন্ধানেও গবেষণা চালানো হয়।

এর তিন বছর পর, ২০০০ সালে দেশে বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ওই বছর ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক বছর পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গত পাঁচ বছরের মৃত্যুর পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, ডেঙ্গু এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ভয়ংকর। কীটতত্ত্ববিদ ড. ইন্দ্রানী ধরের পর্যবেক্ষণ, টিকে থাকার জন্য এডিস মশা নতুন নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। ফলে আগে যেসব পরিবেশকে মশার বিস্তারের জন্য প্রতিকূল মনে করা হতো, সেখানেও এখন তাদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

মশার জন্য দীর্ঘ হচ্ছে প্রজননকাল
ডেঙ্গুর বিস্তারে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাতের অনিয়মিত ধরন এডিস মশার বংশবিস্তারে প্রভাব ফেলছে। উষ্ণ পরিবেশে মশার জীবনচক্র দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি ভাইরাসের বিকাশ ও সংক্রমণ ছড়ানোর গতিও প্রভাবিত হতে পারে।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশারের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। আগে শীতকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে গেলেও এখন শীতেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন বিপদ। আগে শীতকালকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতির সময় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এখন সেই সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। মশার প্রজনন ও সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিরতি নেওয়ার সুযোগ থাকছে না।

বাড়ছে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি
শুধু মশার পরিবর্তন নয়, ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরনও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ—ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে আক্রান্তদের মধ্যে ডেন-২ ধরনের প্রাধান্য বেশি। এর আগের দুই বছরে ডেন-৩ ও ডেন-৪ ধরনের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার ফলে কিছু রোগীর গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে মারাত্মক জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হয়। কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরীও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেন-৩ ও ডেন-৪ ধরনের বিস্তারের পর ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। ফলে একই ব্যক্তি একাধিকবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি, ভাইরাসের ধরন পরিবর্তন এবং চিকিৎসা পেতে বিলম্ব—সব মিলিয়ে ডেঙ্গু এখন আরও জটিল জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

আর ঠেকানো যাচ্ছে না ডেঙ্গু
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত ব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতা হলো, সংক্রমণ বাড়লেই তৎপরতা বাড়ে। অথচ মশার প্রজনন চলে তার আগেই। জুন-জুলাইয়ের বদলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায় চলে আসা প্রমাণ করছে, পুরোনো মৌসুমি পরিকল্পনা দিয়ে নতুন বাস্তবতা মোকাবিলা সম্ভব নয়। ২০০০ সালের প্রাদুর্ভাবের পর ২০০৩ সাল থেকে কয়েক বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার পেছনে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এখন আরও বিস্তৃত ও বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রথমত, নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে মশার ঘনত্ব ও প্রজননস্থল শনাক্ত করে নিয়মিত নজরদারি চালাতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব ও পানি জমে থাকা অন্যান্য স্থানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, সেরোটাইপভিত্তিক নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং হাসপাতালের চিকিৎসাসক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু ও আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

সামনে আরও বড় বিপদ?
ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেশের ৫৭ জেলায় ছড়িয়ে পড়ার তথ্যই বলে দেয়, এটি আর কোনো নির্দিষ্ট শহর বা এলাকার সমস্যা নয়। বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতিকে আঞ্চলিক মহামারি বা এন্ডেমিক অবস্থার আলোকে দেখছেন। অর্থাৎ রোগটি দীর্ঘমেয়াদে একটি অঞ্চলে নিয়মিত সংক্রমণের ভিত্তি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পরও কেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না? কেন মশার প্রজননস্থল শনাক্তের কাজ সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পর শুরু হয়? কেন শীতকালেও ডেঙ্গু মোকাবিলায় একই মাত্রার প্রস্তুতি থাকে না?

বাস্তবতা হলো, এডিস মশা এখন আর পুরোনো নিয়মে চলছে না। তার জীবনচক্র বদলেছে, বিস্তারের সময় বেড়েছে, ভাইরাসের ধরনও পাল্টাচ্ছে। অথচ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রেই রয়ে গেছে মৌসুমি অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তিন দশক আগে যে মশার উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল, আজ সেই মশাই হাজারো পরিবারের জন্য মৃত্যুর আতঙ্ক। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে শুধু মশা মারার অভিযান নয়, বদলাতে হবে ডেঙ্গু মোকাবিলার পুরো কৌশল। কারণ এডিস যখন সারা বছর সক্রিয়, তখন প্রতিরোধব্যবস্থা মৌসুমি রেখে আর জীবন বাঁচানো সম্ভব নয়।

কালের আলো/ওয়াইএ/এমকে

Link copied!