পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে একটি পিসি গার্ডার সেতু। তবে সেতুর আশপাশে দৃশ্যমান কোনো খাল নেই, নেই দুই পাশের সংযোগ সড়কও। ফলে নির্মাণকাজ শেষ হলে সেতুটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা, বিপুল অর্থ ব্যয়ে সেতু নির্মাণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা মানুষের কোনো কাজে নাও আসতে পারে। অন্যদিকে ঠিকাদারের দাবি, সেতুটি খালের ওপরই নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে খালটি বর্তমানে ভরাট হয়ে গেছে।
খাল ও সংযোগ সড়ক ছাড়াই নির্মাণকাজ
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালীর কুয়াকাটার ধূলাসার ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গঙ্গামতি তেত্রিশকানি এলাকায় বেড়িবাঁধের বাইরে সেতুটির নির্মাণকাজ চলছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। ২০২৫ সালের জুনে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। চলতি বছরের শেষদিকে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সেতুর আশপাশে কয়েকটি বসতঘর রয়েছে। তবে সেখানে দৃশ্যমান কোনো খাল কিংবা সেতুর সঙ্গে যুক্ত চলাচলের রাস্তা নেই। দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুটি নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রকল্প গ্রহণ ও ঠিকাদার পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গিয়াস উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি সেতুটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কাজটির দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জসিম উদ্দিন খান। তবে ঠিকাদার পরিবর্তন এবং কাজ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প গ্রহণের আগে জায়গাটির বাস্তব অবস্থা, খালের অস্তিত্ব এবং মানুষের চলাচলের প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাদের দাবি, কয়েক দিন আগে খালের অস্তিত্ব না থাকায় ভেকু দিয়ে খালের নকশা তৈরির মতো কাজ করতেও দেখা গেছে।
সেতুর চেয়ে সাইক্লোন শেল্টার বেশি জরুরি
কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, এলাকায় উন্নয়ন হোক, সেটি তারা চান। তবে যেখানে খাল নেই, রাস্তা নেই, সেখানে এত টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কী, তা বোধগম্য নয়। সেতু নির্মাণের আগে মানুষের চলাচলের ব্যবস্থা ও জায়গার বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করা উচিত ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা মতিউর রহমান বলেন, সেতু নির্মাণ করা হলে মানুষের উপকার হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে সেতুর দুই পাশে যাওয়ার মতো রাস্তা নেই, খালেরও অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না। তাহলে মানুষ কীভাবে এই সেতু ব্যবহার করবে? প্রকল্পের টাকা খরচ করলেই উন্নয়ন হয় না, সেই কাজ মানুষের উপকারে আসতে হবে। তাদের এলাকায় সেতুর চেয়ে একটি সাইক্লোন শেল্টার বেশি জরুরি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বাসিন্দা বলেন, সেতুর নির্মাণকাজের কারণে আশপাশের কয়েকটি পরিবারের ভোগান্তি হচ্ছে। কেউ কেউ ঘরবাড়ি নিয়েও সমস্যায় পড়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করে প্রকল্পের বাস্তবতা যাচাই করা উচিত। জনগণের অর্থে এমন কোনো কাজ হওয়া উচিত নয়, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের কোনো উপকারে আসবে না।
প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্নের জবাব মেলেনি
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সেতুটি স্থানীয়দের হাঁটাচলার সুবিধা দেবে। তবে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, নকশা, সম্ভাব্য উপকারভোগীর সংখ্যা, খালের অস্তিত্ব এবং পানি নিষ্কাশনের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
অন্যদিকে নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী জসিম উদ্দিন খান বলেন, পিসি গার্ডার সেতুটি খালের ওপরই নির্মাণ করা হচ্ছে। হয়তো খালটি এখন ভরাট হয়ে গেছে। প্রকল্পের ব্যয় প্রায় তিন কোটি টাকা। এটি বিগত সরকারের আমলের প্রকল্প। কার্যাদেশ পাওয়ার পর ২০২৫ সালের জুনের দিকে তারা কাজ শুরু করেছেন। সেতুটি নির্মাণ শেষ হলে এর দুই পাশের সংযোগ সড়ক কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং খালের অস্তিত্ব ও পানি চলাচলের বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা হবে, তা নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি
