কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ১১:১৭ পিএম

দক্ষ চালক তৈরিতে জোর, নিরাপদ সড়কের পথে বিআরটিসির বড় কর্মসূচি

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ১১:১৭ পিএম

দক্ষ চালক তৈরিতে জোর, নিরাপদ সড়কের পথে বিআরটিসির বড় কর্মসূচি

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, পেশাদার চালকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের সম্ভাবনা বাড়ানোর লক্ষ্যে বড় পরিসরে চালক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে পরিচালিত দুটি কর্মসূচির আওতায় মোট ৬৮ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নতুন চালক তৈরি করার পাশাপাশি পেশায় নিয়োজিত চালকদের দক্ষতা হালনাগাদ করার উদ্যোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগ শুধু চালক তৈরির একটি কর্মসূচি নয়; বরং সড়ক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

  • দুই প্রকল্পে ৬৮ হাজার চালককে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা
  • কর্মরত চালকদের জন্য থাকছে রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ
  • আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ চালকের চাহিদা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা
  • দুই প্রকল্পে প্রশিক্ষণ পাবেন ৬৮ হাজার চালক

বিআরটিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্টের (বিআরএসপি) আওতায় ৬০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ৪০ হাজার তরুণকে নতুন করে পেশাদার চালক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। অন্যদিকে, পেশায় আগে থেকেই যুক্ত ২০ হাজার চালককে রিফ্রেশার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া হবে।

২০২৬ সালের মে মাসে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম চলবে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। বিআরটিসির চারটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং ২৩টি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বিআরটিসির প্রাক্কলন ও কাজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ (আইসিডব্লিউএস) বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ফাতেমা বেগমের মতে, এই উদ্যোগ দক্ষ চালক তৈরির পাশাপাশি দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।

অন্যদিকে, এডিবির অর্থায়নে স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রামের (এসআইসিআইপি) আওতায় আরও আট হাজার নতুন চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। ফলে দুটি কর্মসূচি মিলিয়ে মোট প্রশিক্ষণ লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়াচ্ছে ৬৮ হাজারে।

দক্ষতার পাশাপাশি নিরাপদ চালনার ওপর জোর
চালক প্রশিক্ষণের প্রচলিত ধারণা সাধারণত গাড়ি চালানো শেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বিআরটিসির এই কর্মসূচিগুলোতে চালনার কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি নিরাপদ ড্রাইভিং, যানবাহনের প্রাথমিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্ত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে কর্মরত পেশাদার চালকদের জন্য রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি চালালেই একজন চালকের সব দক্ষতা হালনাগাদ থাকে, এমন নয়। ট্রাফিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তাবিধি, যানবাহনের প্রযুক্তি এবং সড়কে ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

বিআরএসপি প্রকল্পে নতুন চালক তৈরির পাশাপাশি অভিজ্ঞ চালকদের প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্তি তাই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন চালকদের দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি বর্তমানে সড়কে চলাচলকারী চালকদের আচরণ ও সক্ষমতার উন্নয়নও জরুরি।

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে সুযোগ তৈরির লক্ষ্য
এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত এসআইসিআইপি কর্মসূচিতে বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চালক হিসেবে কাজের সুযোগ বাড়াতে প্রশিক্ষণার্থীদের ইংরেজি ও আরবি ভাষায় যোগাযোগের দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণের মেয়াদ ৩৬০ ঘণ্টা। এতে আত্মরক্ষামূলক ড্রাইভিং, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং পেশাদার চালক হিসেবে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা শেখানো হয়।

বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, এসআইসিআইপি কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ জুলাই। প্রথম পর্যায়ের প্রশিক্ষণ শুরু হয় ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি। ইতোমধ্যে চারটি ধাপে ২ হাজার ৮৫০ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। পঞ্চম ধাপে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন আরও ৬৫০ জন।

প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করা ব্যক্তিদের সরকার স্বীকৃত সনদ এবং বিনা মূল্যে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত উপস্থিতির ভিত্তিতে প্রশিক্ষণার্থীরা যাতায়াত ও টিফিন ভাতাও পাচ্ছেন।

ভাষাগত দক্ষতা যুক্ত করার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে চালকের কাজ পেতে শুধু গাড়ি চালাতে জানাই যথেষ্ট নয়; নিয়োগকর্তার নির্দেশনা বোঝা, ট্রাফিক আইন অনুসরণ, যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও প্রয়োজন।

নারী চালক তৈরিতে নতুন সম্ভাবনা
বিআরটিসির চালক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি নারী যাত্রীদের হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির জন্য রাখা হয়েছে জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান।

নারীদের ড্রাইভিং পেশায় উৎসাহিত করা এবং ‘পিঙ্ক বাস’ সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যেও দক্ষ নারী চালক তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে নারী প্রশিক্ষণার্থীদের আগ্রহ তুলনামূলক কম থাকলেও বর্তমানে এই পেশায় আসার প্রবণতা বাড়ছে।

গণপরিবহনে নারী চালকের অংশগ্রহণ বাড়লে নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নারী যাত্রীদের জন্য পরিবহনসেবায় অংশগ্রহণ ও স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে প্রশিক্ষণের সুযোগের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, বৈষম্যহীন পরিবেশ, উপযুক্ত কর্মঘণ্টা এবং নিয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আগের অভিজ্ঞতা এবার কতটা কাজে লাগবে?
চালক প্রশিক্ষণে বিআরটিসির পূর্ব অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সংস্থাটি এর আগে স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (এসইআইপি) আওতায় অন্তত ৪৭ হাজার ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান বিআরএসপি প্রকল্পে প্রথম দফায় প্রায় ৬ হাজার ৪০০ জন নতুন চালকের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় প্রায় ৬ হাজার ৬০০ জনের প্রশিক্ষণ চলছে। কর্মরত পেশাদার চালকদের রিফ্রেশার প্রশিক্ষণও শিগগিরই শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রশিক্ষণের পর ফল নিশ্চিত চ্যালেঞ্জ
৬৮ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ দেশের পরিবহন খাত ও শ্রমবাজারের জন্য সম্ভাবনাময়। কিন্তু বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষণার্থীকে স্বল্প সময়ে প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে মানের ক্ষেত্রে আপস করা হলে প্রত্যাশিত সুফল ব্যাহত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া দরকার।

প্রথমত, প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো, প্রশিক্ষক, যানবাহন এবং ব্যবহারিক অনুশীলনের মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, লাইসেন্স দেওয়ার আগে চালকের বাস্তব দক্ষতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণ শেষে দেশীয় পরিবহন প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতার অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা দরকার। পাশাপাশি নারী প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং পেশাগত বাধা দূর করার উদ্যোগ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। বিআরটিসির কর্মকর্তারা আগ্রহী চালকদের নিকটস্থ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যোগাযোগ করে নিবন্ধনের তথ্য জানার পরামর্শ দিয়েছেন।

কালের আলো/ওয়াইএ/এমকে

Link copied!