নব্বইয়ের দশকের শিশুদের কাছে টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠা কিছু চরিত্র ছিল একই সঙ্গে বিস্ময়, কৌতূহল ও আতঙ্কের নাম। রূপকথা, জাদু, রহস্য আর অলৌকিক ঘটনা নিয়ে তৈরি জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘আলিফ লায়লা’ ছিল সে সময়ের দর্শকদের কল্পনার এক বিশাল জগৎ। রাজা-বাদশাহ, রাজকন্যা, দৈত্য-দানব ও জাদুকরদের গল্পের ভিড়ে এমন এক চরিত্র ছিল, যার কথা মনে পড়লে আজও অনেকের শৈশবের ভয় জেগে ওঠে। চরিত্রটি হলো রহস্যময় ডাইনি সোফানিসবা।
অসম্ভব সুন্দরী এই চরিত্রের রহস্যময় উপস্থিতি, অদ্ভুত অভিব্যক্তি ও ভয়ংকর আচরণ নব্বইয়ের দশকের শিশুদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পর্দায় তাকে দেখলে যেমন চোখ ফেরানো কঠিন ছিল, তেমনি তার উপস্থিতি অনেকের মনে তৈরি করত অজানা আতঙ্ক।
রূপকথার জগতে রহস্যময় এক চরিত্র
‘আলিফ লায়লা’ ছিল আরব্য রজনীর বিভিন্ন গল্প অবলম্বনে নির্মিত জনপ্রিয় ফ্যান্টাসি ধারাবাহিক। প্রতিটি পর্বে থাকত নতুন রহস্য, জাদু, অভিশাপ, রাজ্য দখলের ষড়যন্ত্র কিংবা অদ্ভুত সব অলৌকিক ঘটনা। কখনো দর্শকেরা চলে যেতেন দূর কোনো রাজ্যে, কখনো পরিচিত হতেন অস্বাভাবিক ক্ষমতার অধিকারী জাদুকর কিংবা ভয়ংকর প্রাণীর সঙ্গে।
তখন বিনোদনের মাধ্যম ছিল সীমিত। ইন্টারনেট কিংবা স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা ছিল না। টেলিভিশনে পছন্দের অনুষ্ঠান দেখার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা করত শিশুরা। পরিবারের সবাই মিলে টিভির সামনে বসে ধারাবাহিক দেখার অভিজ্ঞতাও ছিল অন্য রকম। সেই সময় ‘আলিফ লায়লা’ কেবল একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল শিশু-কিশোরদের কল্পনা, বিস্ময় ও রোমাঞ্চের জগৎ।
সৌন্দর্যের আড়ালে ভয়ংকর এক সত্তা
ধারাবাহিকটির নানা চরিত্রের মধ্যে সোফানিসবা বা সারারা গুল ছিল একটু অন্য রকম। তার সৌন্দর্য যেমন সহজেই নজর কাড়ত, তেমনি পর্দায় তার উপস্থিতিতে থাকত অদ্ভুত এক ভয়ংকর আবহ। সুন্দর চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় সত্তা চরিত্রটিকে আরও আকর্ষণীয় ও ভীতিকর করে তুলেছিল।
সাধারণত রূপকথার গল্পে সুন্দরী রাজকন্যা কিংবা মায়াবী নারীদের ভালোবাসা, সৌন্দর্য ও কোমলতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু সোফানিসবা যেন সেই পরিচিত ধারণাকে উল্টে দিয়েছিল। তার রূপ দর্শকদের আকৃষ্ট করলেও রহস্যময় আচরণ ও ভয়ংকর উপস্থিতি তৈরি করত শিহরণ। ফলে তাকে দেখতে ভালো লাগলেও তার সামনে পড়ার কথা ভাবলে ভয় পেত অনেক শিশু।
টেলিভিশন বন্ধ হলেও কাটত না ভয়
অনেক শিশুর কাছে সোফানিসবা ছিল নিছক কাল্পনিক চরিত্র নয়, বরং রাতের অন্ধকারে মনে পড়ে যাওয়া এক আতঙ্কের নাম। ধারাবাহিকের পর্ব শেষ হয়ে গেলেও তার ভয়ংকর উপস্থিতির স্মৃতি সহজে মন থেকে মুছে যেত না। ঘরের অন্ধকার কোণ, জানালার পাশ কিংবা নির্জন করিডরে মনে হতো, এই বুঝি কোথাও থেকে হাজির হবে সেই ডাইনি।
রাতে একা বাথরুমে যেতে ভয় পাওয়া, ঘুমানোর সময় আলো জ্বালিয়ে রাখা কিংবা মায়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়া—এমন অভিজ্ঞতা অনেকের শৈশবের স্মৃতির অংশ। কেউ হয়তো পর্দায় দেখা দৃশ্য মনে করে কম্বলের ভেতর মুখ লুকিয়ে রাখত। আবার কেউ পরদিন স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করত সোফানিসবাকে নিয়ে। কে কতটা ভয় পেয়েছে, কার কাছে চরিত্রটি বেশি ভীতিকর মনে হয়েছে, তা নিয়েও চলত গল্প।
ভয় পেলেও চোখ সরানো যেত না
সোফানিসবাকে দেখে ভয় পেলেও শিশুরা চরিত্রটি এড়িয়ে চলতে পারত না। বরং পরের পর্বে কী ঘটবে, সে আবার কী করবে, তা জানার কৌতূহল তাদের টেলিভিশনের সামনে টেনে আনত। ভয় ও আকর্ষণের এই মিশ্র অনুভূতিই চরিত্রটিকে দর্শকদের মনে বিশেষ জায়গা করে দিয়েছিল।
তখন ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্ব ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। গল্পের পরিণতি জানার আগ্রহ, রহস্যের সমাধান দেখার অপেক্ষা এবং ভয়ংকর চরিত্রটির পরবর্তী উপস্থিতি নিয়ে কৌতূহল—সব মিলিয়ে তৈরি হতো অন্য রকম উত্তেজনা। সোফানিসবার মতো চরিত্র সেই উত্তেজনায় যোগ করেছিল বাড়তি মাত্রা।
হ্যালোইনের সাজে ফিরতে পারে শৈশবের সেই ডাইনি
আজকের শিশুদের বিনোদনের জগৎ অনেক বিস্তৃত। স্মার্টফোন, ইউটিউব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, অ্যানিমেশন ও অসংখ্য সিরিজের ভিড়ে টেলিভিশনের সামনে বসে নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠান দেখার অভ্যাস অনেকটাই বদলে গেছে। তবে নব্বইয়ের দশকের দর্শকদের কাছে ‘আলিফ লায়লা’ এখনো নস্টালজিয়ার বিশেষ একটি নাম। সোফানিসবার মতো চরিত্রগুলো সেই সময়ের শৈশবকে আরও রহস্যময়, রোমাঞ্চকর এবং কখনো কখনো ভীতিকর করে তুলেছিল।
হ্যালোইনের সময় ভূত, ডাইনি কিংবা রহস্যময় চরিত্রের সাজে সাজার প্রবণতা সোফানিসবাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিতে পারে। ঝমকালো পোশাক, গাঢ় চোখের মেকআপ, রহস্যময় সাজ ও অদ্ভুত চুলের স্টাইলে তৈরি করা যেতে পারে তার আদলে হ্যালোইন লুক। অসম্ভব সুন্দরী অথচ ভয়ংকর এক ডাইনির চরিত্র হিসেবে সোফানিসবা হতে পারে এমন সাজের অনুপ্রেরণা।
তবে সোফানিসবার স্মৃতি শুধু হ্যালোইনের সাজে সীমাবদ্ধ নয়। এটি নব্বইয়ের দশকের দর্শকদের শৈশবের ভয়, কৌতূহল আর টেলিভিশন ঘিরে কাটানো আনন্দময় সময়েরও অংশ। একসময় যে চরিত্রের ভয়ে রাতের ঘুম হারাম হতো, আজ তাকে মনে করেই হয়তো মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সময় বদলেছে, বিনোদনের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু সোফানিসবার মতো কিছু চরিত্র রয়ে গেছে স্মৃতির পাতায়। হ্যালোইনের আবহে সেই সুন্দরী ডাইনির কথা মনে পড়া মানে ফিরে দেখা শৈশবের এক রহস্যময় অধ্যায়।
কালের আলো/এসএ/জেএন
