Kaler Alo
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬
২০ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

ফিচার ডেস্ক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম

যে পাখির ডাক বাঁচিয়ে দিয়েছিল ইকুয়েডরের ৫০ হাজার হেক্টর বন

ফিচার ডেস্ক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম

যে পাখির ডাক বাঁচিয়ে দিয়েছিল ইকুয়েডরের ৫০ হাজার হেক্টর বন

একটি অচেনা পাখির ডাক। সেই ডাকের রহস্য খুঁজতে গিয়েই আবিষ্কৃত হয় বিরল এক প্রজাতি। তবে ঘটনাটি কেবল নতুন একটি পাখি আবিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং সেই পাখিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানোর উদ্যোগ বদলে দিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরের বন সংরক্ষণের চিত্র। গড়ে উঠেছে বিশাল সংরক্ষিত বনাঞ্চল, ফিরে এসেছে বহু বিরল পাখি ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। একটি পাখির অস্তিত্ব রক্ষার প্রচেষ্টা কীভাবে প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠল, সেই গল্পই এখন আলোচনায়।

রহস্যময় ডাকের সূত্র ধরে নতুন পাখির সন্ধান
ঘটনাটি ১৯৯৭ সালের নভেম্বরের। দক্ষিণ ইকুয়েডরের আন্দিজ পর্বতমালার ঘন জঙ্গলে পাখির সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছিলেন আমেরিকান পাখিবিশারদ রবার্ট রিজলি ও তাঁর দল। এক সকালে পাহাড়ি বনের নীরবতা ভেঙে ভেসে আসে অদ্ভুত এক ডাক। শব্দটি অনেকটা পেঁচার মতো হলেও এর উৎস সম্পর্কে কোনো ধারণা করতে পারছিলেন না অভিযাত্রীরা।

রিজলি ডাকটি রেকর্ড করে আবার বাজিয়ে শোনান। কিছুক্ষণ পর ঘন বাঁশঝাড় ভেদ করে বেরিয়ে আসে অচেনা এক পাখি। সাদা মুখ, বাদামি পিঠ, ধূসর বুক ও কালো মাথার পাখিটি দেখে বিস্মিত হন গবেষকেরা। স্থানীয় কৃষকেরা অবশ্য আগে থেকেই পাখিটিকে চিনতেন। এর উচ্চস্বরে ডাকার কারণে তাঁরা নাম দিয়েছিলেন ‘জোকোটোকো’।

১৯৯৯ সালে পাখিটির আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক পরিচয় প্রকাশিত হয়। এর নাম রাখা হয় জোকোটোকো অ্যান্টপিটা। বৈজ্ঞানিক নাম ‘গ্রালারিয়া রিজলি’ রাখা হয় আবিষ্কারক রবার্ট রিজলির সম্মানে। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবিষ্কৃত বড় আকারের পাখিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। সীমিত বিচরণক্ষেত্র এবং নির্দিষ্ট সময়ে ডাক দেওয়ার অভ্যাসের কারণে এত দিন পাখিটি বিজ্ঞানীদের নজরের বাইরে ছিল বলে ধারণা করা হয়।

একটি পাখি বাঁচাতে প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশন
পাখিটির সন্ধান পাওয়ার পর রিজলি বুঝতে পারেন, শুধু এর অস্তিত্বের কথা জানলেই হবে না; বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে হলে এর প্রাকৃতিক আবাসস্থলও রক্ষা করতে হবে। কারণ বনভূমি ধ্বংস হলে পাখিটির টিকে থাকার সুযোগও কমে যাবে।

এ লক্ষ্যেই কয়েকজন সমমনা বন্ধুকে নিয়ে তিনি উদ্যোগ নেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দাতাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বনভূমি কেনা ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জোকোটোকো ফাউন্ডেশন’। একই বছর সংস্থাটি গড়ে তোলে তাদের প্রথম সংরক্ষিত এলাকা ‘তাপিচালাকা রিজার্ভ’।

একটি বিরল পাখিকে রক্ষার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ধীরে ধীরে বড় পরিসরের প্রকৃতি সংরক্ষণ আন্দোলনে রূপ নেয়। পাখির আবাসস্থল রক্ষার পাশাপাশি বনভূমির জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার কাজও শুরু করে সংস্থাটি।

১৯টি সংরক্ষিত এলাকায় হাজারো প্রজাতির আশ্রয়
বর্তমানে ইকুয়েডরজুড়ে ১৯টি সংরক্ষিত এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর ভূমি রক্ষা করছে জোকোটোকো ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত ও যৌথ মালিকানাধীন আরও প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সংস্থাটি।

এসব সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আশ্রয় পেয়েছে ১ হাজার ৩৫০টির বেশি প্রজাতির পাখি। যা ইকুয়েডরের মোট পাখি প্রজাতির প্রায় ৮০ শতাংশ। বিশ্বে পরিচিত মোট পাখি প্রজাতির প্রায় আট ভাগের এক ভাগের আবাসস্থল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এসব এলাকা।

সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতে স্থানীয় মানুষকে বনরক্ষী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের অংশগ্রহণে চলছে বন পর্যবেক্ষণ, বৃক্ষরোপণ ও আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের কাজ। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বন্য প্রাণীর গতিবিধি ও পরিবেশের পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

ফিরছে বন, বাড়ছে জীববৈচিত্র্য
বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেলেও যথাযথ পরিচর্যা ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের মাধ্যমে প্রকৃতিকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব—জোকোটোকো ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম তারই উদাহরণ। সংস্থাটির উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় বৃক্ষরোপণ ও বন পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে পাখি ও অন্যান্য বন্য প্রাণীর জন্য নতুন করে উপযোগী পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

তাপিচালাকা রিজার্ভের পাহাড়ি পথে এখনো ভোরবেলা দেখা যায় স্থানীয় বনরক্ষীদের ব্যস্ততা। প্রায় আড়াই হাজার মিটার উচ্চতার এই এলাকায় তাঁরা জোকোটোকো অ্যান্টপিটাকে আকৃষ্ট করতে কেঁচো নিয়ে অপেক্ষা করেন। পাখিটির পরিচিত ডাকের অনুকরণে বারবার ডাক দেওয়ার পর ঝোপঝাড় থেকে বেরিয়ে আসে সেই বিরল পাখি। সামনে রাখা কেঁচো খেতে খেতে আবার ফিরে যায় বনের গভীরে।

এ ছাড়া বুয়েনাভেনচুরার অরণ্যে দেখা মেলে বিরল এল ওরো প্যারাকিট ও হলুদ-গলা টুকানের মতো পাখির। অন্যদিকে চাকানা রিজার্ভে বরফাবৃত কোটোপ্যাক্সি আগ্নেয়গিরিকে পটভূমিতে রেখে উড়তে দেখা যায় বিশাল আন্দিয়ান কন্ডোর ও ছোট্ট হিলস্টার হামিংবার্ডকে। এসব দৃশ্য সংরক্ষিত বনাঞ্চলে জীববৈচিত্র্য ফিরে আসার চিত্র তুলে ধরে।

সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় মানুষের জীবন
জোকোটোকো ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম শুধু বন ও পাখি সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। ইকোট্যুরিজম, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, পরিবেশবিষয়ক শিক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাকেও একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে সংস্থাটি।

সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য ইকোট্যুরিজম তৈরি করছে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং টেকসই জীবনযাত্রার প্রসারেও কাজ চলছে। এতে বন রক্ষার দায়িত্ব কেবল কোনো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; যুক্ত হচ্ছেন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানুষও।

একটি পাখির গল্প, বিশ্বকে যে শিক্ষা দেয়
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশ সংরক্ষণের অর্থায়ন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও ইকুয়েডরের এই উদ্যোগ দেখিয়েছে, পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টায় প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বিজ্ঞানীদের গবেষণা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষার সমন্বয়ই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

১৯৯৭ সালের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে শোনা অচেনা পাখির ডাক হয়তো তখন কারও কাছে ছিল নিছক এক রহস্য। কিন্তু সেই রহস্যের সূত্র ধরেই শুরু হয়েছিল একটি বিরল প্রজাতিকে বাঁচানোর লড়াই। সময়ের ব্যবধানে সেই উদ্যোগ রক্ষা করেছে হাজারো প্রজাতির পাখির আবাসস্থল, ফিরিয়ে দিয়েছে বনভূমির প্রাণ।

একটি পাখির ডাক যে পুরো একটি দেশের প্রকৃতি সংরক্ষণের গল্প বদলে দিতে পারে, ইকুয়েডরের জোকোটোকো ফাউন্ডেশনের যাত্রা তারই অনন্য উদাহরণ।

কালের আলো/এসএ/জেএন

Link copied!