সালাদ বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শসা, টমেটো, পেঁয়াজ কিংবা লেটুস পাতার মিশ্রণ। খাবারের সঙ্গে ছোট্ট এক বাটি সালাদ যেন চিরচেনা দৃশ্য। কিন্তু সেই সালাদের ওজন যদি হয় প্রায় দুই হাজার কেজি, তাহলে নিশ্চয়ই বিস্মিত হতে হয়! অবিশ্বাস্য হলেও এমনই এক বিশাল সালাদ তৈরি করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে মধ্য আমেরিকার দেশ গুয়াতেমালা। ৫২ ধরনের উপকরণে তৈরি এই সালাদের ওজন ১ হাজার ৯৬২ দশমিক ২ কেজি। তবে এটি কেবল একটি খাবারের রেকর্ড নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মৃত স্বজনদের স্মরণ, পারিবারিক বন্ধন এবং বহু বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর গুয়াতেমালা সিটির সেন্ট্রো কমের্শিয়াল কায়ালা এলাকায় তৈরি করা হয় ব্যতিক্রমী এই সালাদ। দেশটির খাদ্য সংস্থা টোলেডো আলিমেন্তোসের উদ্যোগে এতে অংশ নেন একদল শেফ ও স্বেচ্ছাসেবক। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হয় প্রায় দুই টন ওজনের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘ফিয়ামব্রে’। পরে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি পায় এই আয়োজন।
সালাদের নাম ফিয়ামব্রে, আছে ৫২ উপকরণের চমক
নাম সালাদ হলেও গুয়াতেমালার ফিয়ামব্রে আমাদের পরিচিত সবজির সালাদের মতো নয়। বরং এটি নানা স্বাদ ও উপকরণের এক বিশাল সমাহার। মাংস, বিভিন্ন ধরনের সসেজ, সিদ্ধ ডিম, ভুট্টা, ক্যাপসিকাম, লেটুস পাতাসহ মোট ৫২ ধরনের উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয় খাবারটি। সবশেষে যোগ করা হয় বিশেষ ধরনের ড্রেসিং, যা খাবারটির স্বাদে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
এত বিপুলসংখ্যক উপকরণের সমন্বয়ে ফিয়ামব্রে তৈরি করা শুধু রান্নার দক্ষতার বিষয় নয়, এর জন্য প্রয়োজন হয় পরিকল্পনা, সময় এবং অনেক মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। প্রতিটি উপকরণ আলাদাভাবে প্রস্তুত করে নির্দিষ্ট অনুপাতে মেশানো হয়। ফলে খাবারটি যেমন স্বাদে বৈচিত্র্যময়, তেমনি এর প্রস্তুতপ্রণালিও বেশ ব্যতিক্রমী।
মৃত স্বজনদের স্মরণে খাবার তৈরির ঐতিহ্য
গুয়াতেমালার মানুষের কাছে ফিয়ামব্রে কেবল একটি খাবার নয়; এটি ভালোবাসা, স্মৃতি ও পারিবারিক ঐক্যের প্রতীক। প্রতিবছর ১ নভেম্বর অল সেন্টস ডে এবং ২ নভেম্বর অল সোলস ডে উপলক্ষে দেশটির বিভিন্ন পরিবারে এই খাবার তৈরির রীতি রয়েছে।
এই বিশেষ দিনগুলোতে পরিবারের সদস্যরা একত্র হন। প্রত্যেকে নিজের পছন্দ ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে আসেন। এরপর সবাই মিলে তৈরি করেন ফিয়ামব্রে। অনেক পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এই আয়োজন। খাবারটির প্রতিটি উপকরণ যেন পরিবারের সদস্যদের স্মৃতি ও সম্পর্কের সঙ্গে মিশে থাকে।
ফিয়ামব্রের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে একটি আবেগঘন প্রচলিত কাহিনি। কথিত আছে, একসময় পরিবারের সদস্যরা প্রয়াত স্বজনদের সমাধিস্থলে খাবার নিয়ে যেতেন। বিভিন্ন পরিবারের আনা খাবার একসঙ্গে মিশে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এই বিশেষ খাবার তৈরির ধারণার জন্ম হয়। যদিও এটি প্রচলিত একটি লোককাহিনি, নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য নয়। তবে কাহিনিটি খাবারটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি ও আবেগের বিষয়টি তুলে ধরে।
দুই টনের খাবার তৈরিতে ছিল বিশাল আয়োজন
প্রায় দুই হাজার কেজি খাবার তৈরি করা মোটেও সহজ কাজ নয়। এজন্য প্রয়োজন হয়েছে বিপুল পরিমাণ উপকরণ, বড় আকারের প্রস্তুত সরঞ্জাম এবং দক্ষ জনবলের। শেফদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকেরাও অংশ নেন এই আয়োজনে। প্রথমে উপকরণগুলো আলাদাভাবে প্রস্তুত করা হয়। পরে সেগুলো একত্র করে তৈরি করা হয় বিশাল আকৃতির ফিয়ামব্রে।
রেকর্ডের স্বীকৃতি পেতে খাবারটির ওজনও যাচাই করা হয় নির্ধারিত নিয়মে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের বিচারক সুসানা রেয়েসের উপস্থিতিতে ওজন মাপার পর দেখা যায়, সালাদটির ওজন ১ হাজার ৯৬২ দশমিক ২ কেজি। এই রেকর্ডের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম ওজন ছিল ৫০০ কেজি। অর্থাৎ গুয়াতেমালার দল নির্ধারিত সীমার প্রায় চার গুণ ওজনের খাবার তৈরি করে নতুন রেকর্ড গড়েছে।
রেকর্ডের আড়ালে দেশের সংস্কৃতি তুলে ধরার আয়োজন
বিশ্বরেকর্ড গড়ার পাশাপাশি পুরো আয়োজনকে ঘিরে ছিল গুয়াতেমালার সংস্কৃতি তুলে ধরার নানা উদ্যোগ। ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও বয়নশিল্পের প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশটির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়। ফলে আয়োজনটি শুধু রান্না কিংবা খাবারের রেকর্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের ঐতিহ্য তুলে ধরার একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
সাধারণত এক বাটি সালাদ কয়েকজনের খাবারের সঙ্গী হয়। অথচ গুয়াতেমালার এই আয়োজন সেই পরিচিত ধারণাকেই ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় দুই টন ওজনের সালাদ তৈরি করে তারা দেখিয়েছে, একটি খাবার কীভাবে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পারিবারিক আবেগের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।
সব মিলিয়ে ফিয়ামব্রের এই বিশ্বরেকর্ডের বিশেষত্ব শুধু এর বিশাল আকৃতিতে নয়। ৫২ ধরনের উপকরণ, অসংখ্য মানুষের শ্রম আর প্রয়াত স্বজনদের স্মরণে বেঁচে থাকা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য—সবকিছু মিলিয়েই এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য আয়োজন। গুয়াতেমালার মানুষের কাছে তাই ফিয়ামব্রে শুধু খাবার নয়, প্রিয়জনদের স্মৃতি আগলে রাখার এক সুস্বাদু সাংস্কৃতিক বন্ধন।
কালের আলো/এসএ/জেএন
