ক্রেতা খুঁজতে হচ্ছে না, বাজারও তৈরি আছে। দোকানে দোকানে চাহিদা, ক্রেতাদের আগ্রহও কম নয়। তবু বোতলজাত পানি ‘মুক্তা’ মিলছে না বাজারে। যে পণ্যের দৈনিক চাহিদা প্রায় ২ লাখ লিটার, সেটি উৎপাদনের সক্ষমতা মাত্র ৫০ হাজার লিটার। ফলে চাহিদার চার ভাগের এক ভাগও পূরণ করতে পারছে না সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত মৈত্রী শিল্প। দুই বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে ৫২ শতাংশ। বাজার ধরার মতো সম্ভাবনা থাকলেও পুরোনো যন্ত্রপাতি, দুর্বল বিপণনব্যবস্থা, জনবল সংকট ও প্রশাসনিক অস্থিরতায় ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে ‘মুক্তা’র সরবরাহ।
গাজীপুরের টঙ্গীতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন শারীরিক প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠান মৈত্রী শিল্পে উৎপাদিত হয় এই বোতলজাত পানি। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫০ লাখ ৩ হাজার ৭৪৩ লিটার পানি উৎপাদন হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ২৪ লাখ ৯ হাজার ৫০০ লিটারে। দুই বছরে উৎপাদন কমেছে ২৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৪৩ লিটার। শতাংশের হিসাবে এই পতন প্রায় ৫২।
- প্রতিদিন ২ লাখ লিটার চাহিদা, উৎপাদন মাত্র ৫০ হাজার
- পুরোনো যন্ত্রপাতি ও বিপণন দুর্বলতায় বাড়ছে সরবরাহ ঘাটতি
- প্রভাব পড়ছে ৮০ শতাংশ প্রতিবন্ধী কর্মীর কর্মসংস্থানে
অথচ কয়েক বছর আগেও উৎপাদন বাড়ছিল ধারাবাহিকভাবে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪২ লাখ ১০ হাজার লিটার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৫ লাখ ৮ হাজার লিটার পানি উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ছাড়িয়ে যায় ৫০ লাখ লিটার। কিন্তু এরপরই শুরু হয় পতন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ২৫ লাখ ১ হাজার ৮৬৩ লিটারে। পরের বছর তা আরও কমে যায়।
চাহিদা আছে, সরবরাহ নেই
মৈত্রী শিল্পের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ লিটার ‘মুক্তা’ পানির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু কারখানার বর্তমান দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৫০ হাজার লিটার। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ঘাটতি ১ লাখ ৫০ হাজার লিটার। এই সীমাবদ্ধতায় দেশের সব অঞ্চলে নিয়মিত পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
গাজীপুর শহর ও আশপাশের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক দোকানেই পাওয়া যাচ্ছে না ‘মুক্তা’ পানি। কোনো কোনো দোকানি ব্র্যান্ডটির নাম জানেন, কিন্তু নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় বিক্রি করতে পারছেন না। আবার যেসব দোকানে পানি পাওয়া যাচ্ছে, সেখানকার ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, ক্রেতারা আগ্রহ নিয়ে এই পানি খোঁজ করেন। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় বিক্রির সুযোগ সীমিত।
গাজীপুর শহরের ব্যবসায়ী ইমরান হোসেন বলেন, ‘মুক্তা’ পানি রাখার আগ্রহ তাঁর রয়েছে। ক্রেতারাও এই পানি চান। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও নিয়মিত সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পারেননি। তাঁর মতে, সব দোকানে সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বাজারে এই পানির বিক্রি বাড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
পুরোনো কারখানায় আটকে উৎপাদন
উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতির অন্যতম কারণ পুরোনো যন্ত্রপাতি। ২০০৪ সালে মৈত্রী শিল্পের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় ‘মুক্তা ড্রিংকিং ওয়াটার’ কারখানাটি স্থাপন করা হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে বর্তমান উৎপাদনব্যবস্থা দিয়ে বাজারের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উৎপাদন বাড়াতে নতুন অটোমেশন প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মৈত্রী শিল্পের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. চাঁদ মিয়া বলেন, দৈনিক প্রায় ২ লাখ লিটার চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ হাজার লিটার। উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে অটোমেশন প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্তেও কমেছে বিক্রি
উৎপাদন কমার পেছনে পুরোনো যন্ত্রপাতির পাশাপাশি সরকারি ক্রয় কমে যাওয়ার প্রভাবও রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি দপ্তরগুলোতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতলজাত পানি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল ‘মুক্তা’ পানির বড় ক্রেতা। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে বোতলজাত পানির ব্যবহার কমে যাওয়ায় বিক্রিও বাধাগ্রস্ত হয়।
কালিয়াকৈর ইউএনও অফিসের কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম জানান, আগে তাঁদের কার্যালয়ে নিয়মিত ‘মুক্তা’ পানি সরবরাহ করা হতো। কিন্তু গত এক থেকে দেড় বছর ধরে সরবরাহ ঠিকমতো না পাওয়ায় এখন অন্য ব্র্যান্ডের পানি কিনতে হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির মতে, সরকারি পর্যায়ে বিক্রি কমে যাওয়াই একমাত্র কারণ নয়। বাজারজাতকরণে দুর্বলতা, পর্যাপ্ত জনবলের অভাব এবং প্রশাসনিক অস্থিরতাও উৎপাদন ও বিক্রির ওপর প্রভাব ফেলেছে।
আয় কমছে, কমেছে বাজারও
উৎপাদনের সঙ্গে কমেছে ‘মুক্তা’ পানি বিক্রির আয়। মৈত্রী শিল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে এই পানি বিক্রি করে আয় হয়েছিল ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১১ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় পৌঁছায় বিক্রির আয়। এরপর তা কমতে শুরু করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় হয় ৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকায়।
প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক আয়-ব্যয়ের হিসাবেও ওঠানামা রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, ব্যয় ২৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় ও ব্যয় ছিল যথাক্রমে ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ও ২৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় বেড়ে ২৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা হলেও ব্যয় দাঁড়ায় ২৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, ব্যয় ২৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় কমে হয়েছে ২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
বিপণনে দুজন, প্রয়োজন ৬০০
‘মুক্তা’ পানির বাজার সম্প্রসারণের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি দুর্বল বিক্রয়ব্যবস্থা। সারা দেশে পণ্য বাজারজাত করার জন্য মৈত্রী শিল্পের সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ রয়েছেন মাত্র দুজন। অথচ কার্যকরভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পৌঁছে দিতে ৬০০ জনের বেশি বিক্রয় প্রতিনিধি প্রয়োজন বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
মৈত্রী শিল্পের নির্বাহী পরিচালক (উপসচিব) মো. বরকাতুর রহমান বলেন, প্রচার ও বিক্রয়ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বাজার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এত কম জনবল দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য পৌঁছে দেওয়া কঠিন। গত দুই বছরে পরপর দুবার নির্বাহী পরিচালক পরিবর্তন হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে প্রশাসনিক অস্থিরতার মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে। এর প্রভাব উৎপাদনে পড়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে নতুন করে জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক পর্যায়ে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন পণ্য উৎপাদন ও শোরুম বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে ৮০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর কর্মসংস্থান
মৈত্রী শিল্পের গুরুত্ব শুধু ‘মুক্তা’ পানি উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটিতে বাটি, বালতি, জগ, মগসহ ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের প্লাস্টিক পণ্য তৈরি হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের প্রায় ৮০ শতাংশই শারীরিক প্রতিবন্ধী। ফলে উৎপাদন ও বিক্রি কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রতিবন্ধী মানুষের কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্বাবলম্বিতার বিষয়টিও।
কারখানায় ১১ ধাপে রিভার্স অসমোসিস প্রযুক্তিতে পানি পরিশোধন করা হয়। উৎপাদনকর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিশোধনের পর পরীক্ষাগারে পানির গুণগত মান যাচাই করা হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন বাড়াতে না পারা, সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থতা এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব—সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় একটি সরকারি উদ্যোগ এখন সক্ষমতার সংকটে। নতুন অটোমেশন প্ল্যান্ট, পর্যাপ্ত জনবল ও দেশব্যাপী বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হলে ‘মুক্তা’র বাজারের চাহিদা অপূর্ণই থেকে যাবে। একই সঙ্গে বাধাগ্রস্ত হবে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত প্রতিবন্ধী মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও।
কালের আলো/ডিএইচ/এমকে
