সুন্দরবন মানেই বাঘ, হরিণ, ম্যানগ্রোভ বন আর নদী-খালের গোলকধাঁধা। কিন্তু এই গভীর অরণ্যের বুকেই লুকিয়ে আছে মানুষের বসতি, দুর্গ আর এক হারিয়ে যাওয়া জনপদের ইতিহাস। খুলনার সুন্দরবনের শেখেরটেক এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক শতাব্দী পুরোনো একটি মন্দির সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। মন্দিরটির বয়স আনুমানিক ৩০০ থেকে ৪০০ বছর। আশপাশে ছড়িয়ে থাকা ইটের স্থাপনা, উঁচু ঢিবি, পুরোনো দেয়াল ও বসতভিটার চিহ্ন ইঙ্গিত দেয়, একসময় এই বনাঞ্চলে গড়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি।
স্থানীয় জেলে ও বনজীবীদের কাছে মন্দিরটি পরিচিত ‘বাঘের বাড়ি’ নামে। বাঘের বিচরণক্ষেত্রের গভীরে এর অবস্থান ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা ও বিশ্বাস। তবে লোককথার বাইরেও মন্দিরটির স্থাপত্য এবং আশপাশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আজ যেখানে ঘন বন আর বন্য প্রাণীর রাজত্ব, সেখানে একসময় কারা বসবাস করতেন? কীভাবে গড়ে উঠেছিল সেই জনপদ? আর কী কারণেই বা একদিন হারিয়ে গেল মানুষের সেই বসতি?
বনের গভীরে মোগল আমলের স্থাপত্য
সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের কালাবগী ফরেস্ট স্টেশনের আওতাধীন ১৬ নম্বর কম্পার্টমেন্টের শেখেরটেক এলাকায় মন্দিরটির অবস্থান। শিবসা নদীর পূর্ব পাশে শেখের খাল ও কালীর খালের মধ্যবর্তী স্থানে এটি অবস্থিত। খুলনা শহর থেকে নদীপথে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরের এ স্থানে পৌঁছাতে হয় নৌপথে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে মন্দিরটি প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর আগে নির্মিত। স্থাপনাটিতে মোগল আমলের নির্মাণশৈলীর বৈশিষ্ট্য রয়েছে। হাতে তৈরি পাতলা ইট, শামুকের খোলস থেকে তৈরি চুন এবং নদীর বালু ব্যবহার করে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
এক গম্বুজবিশিষ্ট মন্দিরটির স্থাপত্যে চারচালা রীতির প্রভাব রয়েছে। দেয়ালে দেখা যায় জ্যামিতিক নকশা, ফুল, লতাপাতা ও পোড়ামাটির অলংকরণ। ভেতরে রয়েছে ছোট একটি কুঠরি। নির্মাণকৌশল ও নকশা বিশ্লেষণ করে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক সময়কাল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
মন্দিরের পাশেই দুর্গ ও বসতির চিহ্ন
শেখেরটেকের ইতিহাস শুধু একটি মন্দিরকে ঘিরে নয়। এর আশপাশে ছড়িয়ে থাকা ইটের দেয়াল, মাটির উঁচু ঢিবি এবং পুরোনো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ একসময়কার বড় জনবসতির ইঙ্গিত দেয়।
ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্রের ১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে শেখেরটেক এলাকার প্রাচীন স্থাপনা ও দুর্গের ধ্বংসাবশেষের উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বর্ণনায়, সেখানে একসময় প্রাচীরঘেরা দুর্গ, পুকুর, ইটের বাড়ি ও বসতভিটা ছিল। স্থানীয় বাওয়ালিদের কাছে স্থানটি ‘বড় বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল।
শুধু শেখেরটেক নয়, শিবসা নদীর তীরেও রয়েছে প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। সেখানে ইটের তৈরি স্থাপনার চিহ্ন, মাটির উঁচু ঢিবি ও ছড়িয়ে থাকা ইটের স্তূপ দেখা যায়। নদীভাঙন ও জোয়ারের পানির চাপে এসব নিদর্শন ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ গ্রন্থেও এ এলাকার প্রাচীন স্থাপনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে স্থানটি ‘শেখের বাড়ি’ নামে পরিচিত।
রাজা প্রতাপাদিত্যের দুর্গ, নাকি অন্য কোনো জনপদ?
শেখেরটেকের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে রাজা প্রতাপাদিত্যের শাসনামলের সম্পর্ক নিয়েও ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ষোড়শ শতকের শেষ দিকে রাজা প্রতাপাদিত্য দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। বনদস্যু ও জলদস্যুদের মোকাবিলায় শিবসা নদীর তীরে দুর্গ নির্মাণের কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শেখেরটেকের ধ্বংসাবশেষ প্রতাপাদিত্যের নির্মিত দুর্গের অংশ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রয়োজন আরও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও গবেষণা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজের ‘সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ইতিহাস’ গ্রন্থেও সুন্দরবনের প্রাচীন স্থাপনা ও প্রতাপাদিত্যের সময়কার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
কেন পরিত্যক্ত হলো জনপদ?
যে এলাকায় একসময় দুর্গ, পুকুর, ইটের বাড়ি ও বসতভিটার অস্তিত্ব ছিল, সেটি কীভাবে ঘন অরণ্যে পরিণত হলো—তার পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো মেলেনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, জোয়ারের পানির চাপ এবং পরিবেশগত পরিবর্তন জনবসতি বিলুপ্তির পেছনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। তবে এসব কারণের কোনটি কতটা প্রভাব ফেলেছিল, তা নির্ধারণে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর গুরুত্ব শুধু স্থাপনার বয়সে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো সুন্দরবনের অতীত জনবসতি, মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক কাঠামো ও দক্ষিণাঞ্চলের ইতিহাস জানার সুযোগ তৈরি করে। বর্তমানে দুর্গম বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় একসময় মানুষের বসতি কীভাবে গড়ে উঠেছিল, তাঁদের জীবিকা কী ছিল এবং কেন তাঁরা এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
সংস্কার হয়েছে মন্দির, গবেষণার অপেক্ষায় ইতিহাস
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, জোয়ারের পানির চাপ ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় মন্দিরটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছিল, খসে পড়ছিল ইট। একপর্যায়ে স্থাপনাটির অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
পরে বন বিভাগের অর্থায়নে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কারিগরি সহায়তায় মন্দিরটি সংস্কার করা হয়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়। পুরোনো স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করে সংরক্ষণকাজ চালানো হয়েছে। পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে সেখানে ফুট ট্রেইল ও ওয়াচ টাওয়ারসহ কিছু অবকাঠামোও তৈরি করা হয়েছে।
তবে মন্দির সংস্কার হলেও পুরো এলাকার প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস এখনো অজানা রয়ে গেছে। শেখেরটেকের মন্দির ও দুর্গের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে রাজা প্রতাপাদিত্যের সম্পর্ক কতটা গভীর, আশপাশের বসতি কত বড় ছিল কিংবা সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবনযাত্রা কেমন ছিল—এসব জানতে প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি এর প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রক্ষাও জরুরি। এসব স্থাপনা কেবল পুরোনো ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এগুলো দক্ষিণাঞ্চলের ইতিহাস, জনবসতি ও সভ্যতার বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য।
তাঁর মতে, যথাযথ গবেষণা ও সংরক্ষণ করা গেলে সুন্দরবনের অজানা অতীতের আরও অনেক অধ্যায় উন্মোচিত হতে পারে।
ঘন অরণ্যের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা শেখেরটেকের মন্দির তাই শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া এক জনপদের ইতিহাস খুঁজে পাওয়ার সূত্র। সেই ইতিহাসের অনেকটাই এখনো মাটির নিচে, নদীর তীরে কিংবা বনের নিস্তব্ধতার আড়ালে চাপা পড়ে আছে।
কালের আলো/এসএআর/জেএন
