Kaler Alo
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬
২৩ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৮, ২০২৬, ০২:১১ পিএম

৬০০ মডেল স্কুলের স্বপ্নে ৬৮ হাজার কোটি টাকার ধাক্কা

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৮, ২০২৬, ০২:১১ পিএম

৬০০ মডেল স্কুলের স্বপ্নে ৬৮ হাজার কোটি টাকার ধাক্কা

দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে ৬০০টি আধুনিক মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণের বিশাল পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রতিটি আসনে একটি বালক ও একটি বালিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে একসঙ্গে প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থীর জন্য তৈরি হবে আধুনিক শিক্ষার নতুন অবকাঠামো। শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে থাকবে আবাসিক হোস্টেল, সুইমিংপুল, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, এআই ও রোবটিকস ল্যাব, এমনকি জাপানি, কোরীয় ও ম্যান্ডারিন ভাষা শেখার সুযোগও।

  • ছয় লাখ শিক্ষার্থীর জন্য আধুনিক শিক্ষার অবকাঠামো গড়তে চায় সরকার
  • পাঁচ বছরে নির্মাণের লক্ষ্য, কিন্তু বিদেশি অর্থায়ন অনিশ্চিত
  • জমি ও ২৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগও বড় চ্যালেঞ্জ 

তবে উচ্চাভিলাষী এই পরিকল্পনার সামনে শুরুতেই দেখা দিয়েছে বড় কয়েকটি বাধা। প্রকল্প ব্যয়ের ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা বিদেশি সহায়তা থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো উন্নয়ন সহযোগী অর্থায়নের নিশ্চয়তা দেয়নি। ৬০০ প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় ১ হাজার ৮০০ একর জমি সংগ্রহ, ২৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় মেটানোর বিষয়টিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে আধুনিক শিক্ষার স্বপ্ন দেখানো এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত এলাকাসমূহে ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণ’ প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩১ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এখনো প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ব্যয় ১১৪ কোটি টাকা
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয় ৬৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ২০ হাজার ৫২০ কোটি টাকা এবং বিদেশি প্রকল্প সহায়তা থেকে আসার কথা ৪৭ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। সম্ভাব্য অর্থায়নকারী হিসেবে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), কোরিয়ার ইডিসিএফ ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ৬০০টি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ভাগ করলে প্রতিটির জন্য গড় ব্যয় দাঁড়ায় ১১৪ কোটি টাকা। যদিও এই অর্থ মূলত প্রস্তাবিত প্রকল্পের মূলধনী ব্যয়ের গড় হিসাব; প্রতিষ্ঠান চালু রাখার ভবিষ্যৎ ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

স্কুল নয়, যেন পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ক্যাম্পাস
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের ব্যবস্থা থাকবে। শিক্ষার্থী ধারণক্ষমতা হবে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ জন। সব মিলিয়ে ৬০০ প্রতিষ্ঠানে প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ পাবে।

প্রস্তাবনায় শুধু প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ ও বিজ্ঞানাগার নয়, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। থাকবে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের পরীক্ষাগার। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস ও প্রযুক্তি শিক্ষার জন্য বিশেষায়িত ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ই-লাইব্রেরি এবং ডিজিটাল লার্নিং সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি, কোরীয়, আরবি ও ম্যান্ডারিন ভাষা শেখানোর জন্য ভাষা ল্যাব স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে থাকবে মিলনায়তন, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সংগীত, নৃত্য, নাটক ও চিত্রকলার চর্চা। বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগও রাখা হবে।

হোস্টেল থেকে সুইমিংপুল, থাকবে সবই
প্রতিটি ক্যাম্পাসে ১০০ আসনের আবাসিক হোস্টেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার মাঠ, ইনডোর গেমস এবং বহুমুখী ক্রীড়া অবকাঠামো থাকবে। শিক্ষার্থীদের সাঁতার শেখানো ও জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা অর্জনের জন্য নির্মাণ করা হবে সুইমিংপুল।

শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় রান্নাঘর ও খাবার ঘর থাকবে। জাপানের স্কুলভিত্তিক খাবার সরবরাহ ব্যবস্থার আদলে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাকক্ষ, স্কুল নার্স, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। মেয়েদের জন্য পৃথক কমনরুম, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও মাসিককালীন স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা থাকবে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য র‌্যাম্প, লিফট ও বাধামুক্ত চলাচলের ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তায় সিসিটিভি, সীমানাপ্রাচীর ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গড়তে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

জমি লাগবে ১ হাজার ৮০০ একর, শিক্ষক ২৭ হাজার
৩০০ সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে দুটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য প্রতিটির বিপরীতে আনুমানিক তিন একর করে জমি প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে জমির প্রয়োজন প্রায় ১ হাজার ৮০০ একর। এত বিপুল জমি কোথা থেকে এবং কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় জমির প্রাপ্যতা ও স্থান নির্বাচন যাচাই করার কথা রয়েছে।

জনবল নিয়োগও কম বড় চ্যালেঞ্জ নয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আনুমানিক ৪৫ জন শিক্ষক প্রয়োজন হবে। সে হিসাবে ৬০০ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক লাগবে প্রায় ২৭ হাজার। এর বাইরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, গ্রন্থাগারিক, ল্যাব সহকারী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, নার্স, খাবার ব্যবস্থাপক, হোস্টেল তত্ত্বাবধায়ক ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দিতে হবে।

নির্মাণের পর ব্যয় মেটাবে কে?
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা অর্থায়ন। মোট ব্যয়ের প্রায় অর্ধলাখ কোটি টাকা বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করছে। অথচ কোনো উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত হয়নি। এ ছাড়া পাঁচ বছরে ৬০০টি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্য পূরণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, প্রতিষ্ঠানগুলো চালু হওয়ার পর প্রতিবছরের বিপুল পরিচালন ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে? শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, হোস্টেল পরিচালনা, খাবার সরবরাহ, সুইমিংপুল, প্রযুক্তি ল্যাব ও অন্যান্য অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে নিয়মিত বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। এসব ব্যয়ের জন্য পৃথক ও টেকসই অর্থায়ন কাঠামো এখনো স্পষ্ট নয়।

পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য চার কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। এ সমীক্ষায় প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, জমির প্রাপ্যতা, স্থান নির্বাচন, ব্যয়, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই করা হবে। এর ভিত্তিতে তৈরি করতে হবে বিস্তারিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি)।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অনুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় নেই। উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহ ও অর্থায়নের সম্ভাবনা পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

অর্থাৎ, ছয় লাখ শিক্ষার্থীর জন্য আধুনিক শিক্ষার নতুন দিগন্ত তৈরির এই পরিকল্পনা এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ৬৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকার অর্থায়ন, জমি ও জনবল নিশ্চিত করে পাঁচ বছরে এত বড় কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করা যাবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

কালের আলো/আরআই/এমকে

Link copied!