একটি কার্ড, যার মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পৌঁছাবে পরিবারের নারীর হাতে। আবার সেই কার্ডের তথ্যেই তৈরি হবে প্রতিটি পরিবারের সুনির্দিষ্ট পারিবারিক চিত্র। ভবিষ্যতে এই তথ্য কাজে লাগিয়ে আরও সমৃদ্ধ করা হবে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা। নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিবারভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণে সরকারের এমন সব উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন নারী ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এমপি।
তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে এবং বর্তমানে সরকার তা বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করছে। সময়ের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে জাতীয় পরিকল্পনাকে প্রতিনিয়ত আরও সমৃদ্ধ ও কার্যকর করা হচ্ছে।
- পাঁচ সদস্যের পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠ নারীকে প্রধান করে দেওয়া হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড
- সামাজিক নিরাপত্তায় প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ
- শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বিশ্বব্যাংকের ‘দক্ষিণ এশিয়ায় জনমিতিক পরিবর্তন: উন্নয়নের সম্ভাবনা থেকে চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

কার্ডের কেন্দ্রে নারী, তথ্যের কেন্দ্রে পরিবার
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে পাঁচ সদস্যের পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠ নারীকে প্রধান করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করা হচ্ছে। এই সহায়তার অর্থ নারীদের পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ ও সন্তানদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে, যা জাতীয় জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
মন্ত্রী জানান, আমাদের দেশের পরিবারগুলোর অতীতে কোনো ‘ফ্যামিলি ট্রি’ সংরক্ষণ করা হয়নি। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক ফ্যামিলি ট্রি তৈরি করা হবে এবং সেখান থেকে তথ্য নিয়ে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা আরও সমৃদ্ধ করা হবে।
সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন খাতে প্রায় এক লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বর্তমান সরকার বলে জানান মন্ত্রী। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অপুষ্টির ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে মাতৃত্বকালীন সময়ে নারীদের এক হাজার দিন পর্যন্ত ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ শেষে প্রাথমিক পুঁজি ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হচ্ছে।
তরুণদের দক্ষতা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের পরিচর্যায় নতুন উদ্যোগ
জনমিতিক সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ নিশ্চিত করেছে বলে জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কল্যাণের পাশাপাশি তাঁদের পরিচর্যা ও সার্বিক সহায়তার জন্য পিতা-মাতাদেরও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।
জন্ম থেকে বার্ধক্য—সুরক্ষার আওতায় পুরো জীবনচক্র
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এমপি বলেন, বর্তমান সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে ‘জীবনচক্রভিত্তিক সুরক্ষা কৌশল’ গ্রহণ করেছে। যেখানে একদিনের নবজাতকের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্মানের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে এই সুরক্ষার আওতায় আনতে সরকার কেবল নতুন নতুন মানুষকে কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করে এর পরিধি অনুভূমিকভাবে (হরিজন্টালি) বৃদ্ধি করছে না, বরং ভাতার পরিমাণ, সহায়তার মান এবং সুযোগ-সুবিধার গভীরতা বাড়িয়ে একে উল্লম্বভাবেও (ভার্টিক্যালি) শক্তিশালী করছে। যা সামগ্রিকভাবে বৈষম্য দূর করে একটি টেকসই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা নিশ্চিত করছে।
২০৩৪-এর পর বদলাবে জনসংখ্যার চিত্র, সামনে বার্ধক্যের চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ২০৩৪ সালের পর দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমতে শুরু করবে। ধনী দেশগুলোর মতো অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার আগেই ২০৪৯ সালের মধ্যে অঞ্চলটি দ্রুত বয়োবৃদ্ধ সমাজে পরিণত হবে। ধনী হওয়ার আগেই বয়োবৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার এই বড় সংকট এড়াতে এখনই ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং প্রবীণদের সুচিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তার মজবুত ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ এবং বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক জনসম্পদবিষয়ক পরিচালক সেম মেতে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও অংশ নেন বিশ্বব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে
