একটি শিশুর বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হলে বদলে যায় পুরো পরিবারের জীবন। সন্তানের পরিচর্যায় অনেক বাবা-মাকে ছেড়ে দিতে হয় চাকরি, থেমে যায় নিজের স্বপ্ন কিংবা জীবিকার পথ। আবার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের উপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাবে অনেক প্রতিভাই থেকে যায় বিকাশের অপেক্ষায়। এই বাস্তবতায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনে নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার।
- বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা, পরিচর্যাকারীদের আর্থিক সহায়তা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের টেকসই পুনর্বাসনে সরকারের নতুন পরিকল্পনা
- বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষ শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ
দেশের ৬৪টি জেলায় পর্যায়ক্রমে ৬৪টি প্রতিবন্ধী স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, তাঁদের পরিচর্যায় নিয়োজিত অভিভাবকদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করা এবং বিশেষায়িত শিক্ষক তৈরির প্রশিক্ষণ বিভাগীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর ইস্কাটনে কেয়ারারস অ্যালায়েন্স বাংলাদেশ আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক কেয়ারারস দিবস ২০২৬’ উদ্যাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব পরিকল্পনার কথা জানান নারী ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, এমপি। মন্ত্রী বলেন, 'দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা ও তাদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সরকার পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪টি জেলায় ৬৪টি প্রতিবন্ধী স্কুল প্রতিষ্ঠা করবে।'
বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের পরিচর্যায় নিয়োজিত অভিভাবকদের বাস্তবতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, অনেক বাবা-মা সন্তানকে সার্বক্ষণিক সময় দিতে গিয়ে কোনো পেশায় যুক্ত হতে পারেন না। তাঁদের এই ত্যাগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা এবং কাজের প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে তাঁদের স্বাবলম্বী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে চায় না সরকার; বরং তাঁদের টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করাই লক্ষ্য।
চাকরির বয়সসীমা বাড়ানোর উদ্যোগ
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও উদ্যোক্তাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও বিগত যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বহুমুখী সমস্যা সমাধানে সরকার আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনকে সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনি অঙ্গীকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছেলে, মেয়ে, এনডিডি (নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটিজ) কিংবা নন-এনডিডি নির্বিশেষে সমাজের পিছিয়ে পড়া প্রতিটি মানুষের পাশে সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে দাঁড়াতে বদ্ধপরিকর।
বিশেষ শিক্ষক তৈরিতে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ
প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার প্রসারে শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বিশেষায়িত শিক্ষক। এ বাস্তবতা তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য মাত্র একটি সরকারি কলেজ রয়েছে। সরকার দ্রুত এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বিভাগীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ তৈরির সরকারি প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্যারা অলিম্পিকে সাফল্যের স্বপ্ন
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্রীড়াক্ষেত্রেও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। আন্তর্জাতিক প্যারা অলিম্পিকে বাংলাদেশের প্রতিযোগী ও ক্রীড়াবিদরা যাতে সাফল্য অর্জন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সাভারে আন্তর্জাতিক মানের অলিম্পিক ভিলেজ নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে বলে জানান তিনি।
জাতীয় কেয়ারার কাঠামোর দাবি
অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রায় তিন শতাধিক কেয়ারার বা পরিচর্যাকারী তাঁদের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পরিচর্যায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের অধিকার, স্বীকৃতি এবং সহায়তা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় কেয়ারার কাঠামো’ গড়ে তোলার দাবি জানান তাঁরা।
কেয়ারারস অ্যালায়েন্স বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল মুনিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব মো. কামরুজ্জামান দুলাল। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও), সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/জেএন/এমকে
