প্রবাসী আয় ও রফতানি—দুই খাতেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি রয়েছে। এরপরও দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে বাড়ছে চাপ। এর প্রধান কারণ জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রফতানি আয় কম বাড়ায় বড় হচ্ছে বাণিজ্য ঘাটতি। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৪৭ কোটি ডলারে। একই সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি হয়েছে ১৩৩ কোটি ডলার। সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যেও ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৬ কোটি ডলারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৯৩৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ। বিপরীতে পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছে ৮৩৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ৭ শতাংশ বেশি। আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
জ্বালানি আমদানিতে দ্বিগুণের বেশি ব্যয়
বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও লুব্রিকেন্ট আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪২২ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২০৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির ব্যয় বেড়েছে ১০৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে এসব পণ্য আমদানিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি ডলার খরচ করতে হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা ও জ্বালানি সরবরাহের সংকট রফতানি খাতের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে একদিকে আমদানির জন্য ডলারের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে রফতানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে তুলনামূলক ধীরগতিতে।
রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিতেও কাটছে না চাপ
বৈদেশিক লেনদেনের চাপের আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে চলতি হিসাবের পরিসংখ্যানে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে চলতি হিসাবে ৫৯ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। তবে সেপ্টেম্বর শেষে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়ে ১৩৩ কোটি ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এ সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সে ১৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি থাকলেও চলতি হিসাবের ঘাটতি এড়ানো যায়নি। সাধারণত রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে দেশে আসা বৈদেশিক মুদ্রা আমদানি ব্যয়সহ বিভিন্ন বৈদেশিক লেনদেনে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রবৃদ্ধি সেই চাপ সামাল দিতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়াই চলতি হিসাবের ঘাটতির অন্যতম কারণ। রফতানি ও রেমিট্যান্স—উভয় খাতেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও আমদানির বিপরীতে ডলারের ব্যয় বেশি হওয়ায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যেও ঘাটতি
দীর্ঘদিন ধরেই বাণিজ্য ঘাটতি দেশের বৈদেশিক খাতের অন্যতম উদ্বেগের বিষয়। তবে এতদিন সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে বিদেশি অর্থায়নের প্রবাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও চাপের মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশের সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি ছিল। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৬ কোটি ডলারে। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি আরও বেড়েছে।
রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্য ঘাটতি এবং বিদেশি অর্থায়নের তুলনামূলক কম প্রবাহের কারণে এই ঘাটতি পূরণ করা যাচ্ছে না। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও লেনদেন ব্যবস্থাপনায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয়ের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। এতে সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
চাপ কমাতে উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানোর তাগিদ
সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈদেশিক খাতের চাপ কমাতে আমদানি ব্যয়ের ওপর নজরদারির পাশাপাশি রফতানি আয় বাড়ানো জরুরি। এ জন্য শিল্প উৎপাদন স্বাভাবিক করা, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রফতানি খাতের প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মধ্যকার ব্যবধান আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ
