তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম দফায় দফায় বাড়লেও বাজারে নির্ধারিত দামে মিলছে না ১২ কেজির সিলিন্ডার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতারা। অন্যদিকে বিক্রেতাদের দাবি, বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে তাঁদেরও। এর সঙ্গে রয়েছে সরবরাহ সংকট। সব মিলিয়ে বাড়তি দামে এলপিজি কিনতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ পরিবার থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
সোমবার (২ নভেম্বর) এলপিজির সংকটের মধ্যে আবারও ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়েছে বিইআরসি। নতুন করে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা। এর আগে গত ৪ অক্টোবর একই পরিমাণ সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। নতুন দাম সোমবার রাত ৮টা থেকে কার্যকর হয়েছে। শুধু ১২ কেজি নয়, ৫ থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত সব ধরনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে সরকারি নির্ধারিত দাম অনুযায়ী বাজারে গ্যাস না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ক্রেতারা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর মিরপুরের ২ ও ৬ নম্বর এলাকা এবং আগারগাঁও ঘুরে ক্রেতা, ব্যবহারকারী ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
পরিবারের বাজেটে বাড়তি চাপ
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আহমেদ সোহেল বাসার রান্নার কাজে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। তাঁর তিন সদস্যের পরিবারে প্রতি মাসে একটি সিলিন্ডার লাগে। তিনি বলেন, প্রতিনিয়ত দাম বাড়ায় সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকারি নির্ধারিত দামেও সিলিন্ডার পাওয়া যায় না; বরং চার থেকে পাঁচশ টাকা বেশি দিতে হয়।
আহমেদ সোহেলের ভাষ্য, যখন ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি দাম প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা ছিল, তখনও তাঁকে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। এখন দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করায় বিক্রেতারা আরও বেশি দাম চাইবেন বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। এভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে বলেও জানান তিনি।
গ্যাসের খরচে চাপে হোটেল ব্যবসা
মিরপুর-২ নম্বর এলাকায় হোটেল ব্যবসা করেন মো. শহিদুল ইসলাম। রান্নার কাজে তিনি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। তাঁর অভিযোগ, আগে সরকারি নির্ধারিত দাম প্রায় ১ হাজার ৮৫০ টাকা থাকলেও তাঁকে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ১৫০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন করে দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণের পর বিক্রেতারা আরও বেশি দাম চাইতে পারেন। কারণ, তাঁরা সরাসরি ডিলারের কাছ থেকে গ্যাস কেনেন না; খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন। ফলে সরকারি দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়েই তাঁদের কিনতে হয়।
শহিদুলের হোটেলে দুটি চুলার জন্য দুটি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়। একটি চুলায় রুটি এবং অন্যটিতে পরোটা তৈরি করা হয়। তাঁর ভাষ্য, প্রতি তিন দিন পরপর দুটি সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। গ্যাসের পাশাপাশি ময়দাসহ অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে। ফলে ১০ টাকা দরে পরোটা বিক্রি করে খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান খরচে ১০ টাকায় পরোটা বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। হয় দাম বাড়াতে হবে, নয়তো ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। গ্যাসের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে একসময় হোটেল বন্ধ করে দেওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। ছোট ব্যবসায়ীদের পক্ষে এত বেশি দামে গ্যাস কেনা কঠিন বলেও জানান তিনি।
চায়ের দাম না বাড়িয়ে বাড়তি খরচ সামলানোর চেষ্টা
আগারগাঁও এলাকায় চা বিক্রি করেন ফখরুদ্দীন। তাঁর ব্যবসার অন্যতম নির্ভরতা এলপিজি সিলিন্ডার। তিনি জানান, সম্প্রতি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন। ওই সিলিন্ডারে ১১ থেকে ১৩ দিন চলে। নতুন করে দাম বাড়ানোর পর এবার বিক্রেতারা সিলিন্ডারের দাম প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা চাইতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। ফখরুদ্দীন বলেন, গ্যাসের দাম বাড়লে ব্যবসার খরচও বাড়ে। কিন্তু চায়ের দাম বাড়ালে ক্রেতারা আগের মতো কিনতে চাইবেন না। তাই অন্য পণ্য বিক্রি করে গ্যাসের বাড়তি খরচ পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
বিক্রেতারাও বলছেন, বেশি দামে কিনতে হচ্ছে
মিরপুর-৬ নম্বর এলাকার সাফোয়ান এন্টারপ্রাইজের এলপিজি বিক্রেতা মো. মামুন জানান, তাঁর দোকানে বর্তমানে পেট্রোম্যাক্স, ইউনি গ্যাস ও আই গ্যাসের ১২ কেজির সিলিন্ডার রয়েছে। বসুন্ধরা, বেক্সিমকো ও তীরসহ বিভিন্ন কোম্পানির সিলিন্ডার থাকলেও সব ব্র্যান্ডের সরবরাহ নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না।
মামুনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পেট্রোম্যাক্সের ১২ কেজির নতুন সিলিন্ডার গ্যাসসহ ৪ হাজার টাকা এবং অন্য কয়েকটি কোম্পানির সিলিন্ডার গ্যাসসহ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। কোম্পানিভেদে গ্যাস ও বোতলের দামে পার্থক্য রয়েছে। তাঁর দোকানে ইউনি গ্যাসের ১২ কেজি সিলিন্ডার রিফিল করতে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং পেট্রোম্যাক্স ও আই গ্যাসের ক্ষেত্রে ২ হাজার ৩০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, একটি সিলিন্ডার কিনতেই বর্তমানে ২ হাজার ৩০০ টাকা খরচ হচ্ছে। এরপর ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লাভ রেখে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু ক্রেতারা বেশি দাম শুনে আপত্তি করেন এবং সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। এতে বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
সিলিন্ডার বিনিময়েও জটিলতা
দাম ও সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি খালি সিলিন্ডার বিনিময় নিয়েও সমস্যায় পড়ছেন বিক্রেতারা। মামুন জানান, এক কোম্পানির সিলিন্ডার দিয়ে অন্য কোম্পানির গ্যাস নেওয়া বা বোতল বিনিময়ের সুযোগ নেই। ফলে ক্রেতারা খালি সিলিন্ডার ফেরত দিলে সেটি নিয়ে নতুন করে ঝামেলা তৈরি হয়।
তাঁর মতে, বাজারে পণ্যের সরবরাহ কম, অন্যদিকে বেশি দামে কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে। ক্রেতাদের কাছে বাড়তি দাম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। আগে এ ধরনের বিরোধের কারণে একসময় ব্যবসা ছেড়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। পরে আবার ব্যবসা শুরু করলেও একই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে জানান এই বিক্রেতা। সব মিলিয়ে এলপিজির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে সাধারণ গ্রাহক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যয় বাড়ছে। সরকারি নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত না হলে ভোক্তাদের এই বাড়তি খরচ ও ভোগান্তি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
