দেশের অন্যতম বৃহৎ বস্ত্র উৎপাদনকারী অঞ্চল নরসিংদীতে সুতার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সংকটে পড়েছে টেক্সটাইল শিল্প। উৎপাদন খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না কাপড়ের বিক্রয়মূল্য। ফলে ব্যাংকঋণের সুদ, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন কারখানার মালিকরা। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।
উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাড়ছে না কাপড়ের দাম
একসময় তাঁতশিল্পের জন্য পরিচিত নরসিংদীতে বর্তমানে আধুনিক বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম ও টেক্সটাইল কারখানার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। চৌয়ালা, মাধবদী, বিলাসদী, খাটেহারা, হাজীপুর, হাসনাবাদ ও কারারচরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য বস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠান। এসব কারখানায় স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করছেন।
শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সুতার দাম বাড়লেও কাপড়ের বাজারমূল্য সেই তুলনায় বাড়ছে না। এতে উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। লোকসান সামাল দিতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক চাপে পড়েছে।
এজেন্টদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের অভিযোগ
পাওয়ারলুম মালিকদের দাবি, সুতা ব্যবসায়ীদের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। সুতার প্যাকেট বা বস্তায় নির্ধারিত মূল্য উল্লেখ না থাকায় ক্রেতাদের প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।
কারখানা মালিকদের অভিযোগ, সুতা কোম্পানির স্থানীয় এজেন্টরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছেন। একজন ক্ষুব্ধ কারখানা মালিক বলেন, সুতার বাজার এখন পুরোপুরি এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণে। তারা প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন দামে সুতা বিক্রি করছেন। অথচ কাপড়ের দাম বাড়ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
দায় নিচ্ছেন না সুতা ব্যবসায়ীরা
তবে কারখানা মালিকদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় সুতা এজেন্টরা। তাদের দাবি, সুতার মূল্যবৃদ্ধির জন্য তারা দায়ী নন; বরং স্পিনিং মিল পর্যায় থেকেই দাম বাড়ানো হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এজেন্ট বলেন, তারা নিজেরা সুতা উৎপাদন করেন না। স্পিনিং মিল থেকে সুতা কিনে এনে বাজারে বিক্রি করেন। মিল মালিকরা বেশি দামে সুতা সরবরাহ করলে তাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। তাই সুতার বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে প্রথমে স্পিনিং মিলগুলোর মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
চাহিদার তুলনায় কমছে সুতার উৎপাদন
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বাজার বিশ্লেষণে জানা গেছে, দেশে সুতা উৎপাদনকারী স্পিনিং মিলের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। অন্যদিকে কাপড় উৎপাদনকারী টেক্সটাইল কারখানার সংখ্যা বাড়ছে। ফলে সুতার উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, সুতার সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে স্পিনিং মিল মালিক ও স্থানীয় এজেন্টদের মধ্যে দায় চাপানোর প্রবণতায় বিপাকে পড়েছেন নরসিংদীর কাপড়কল মালিকরা।
সরকারি নজরদারির দাবি
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুতার বাজারে মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে কার্যকর সরকারি নজরদারি বাড়ানো জরুরি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নরসিংদীর বস্ত্রশিল্পের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পাঞ্চল আরও গভীর সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
