চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখতেই চন্দ্রপাহাড় ঘিরে জেএসএস-ইউপিডিএফ’র গুজব-অপপ্রচার

প্রকাশিতঃ 10:03 am | March 28, 2021

মেহেদী হাসান আব্দুল্লাহ, সিনিয়র নিউজরুম এডিটর, কালের আলো :

নানা রকম অপপ্রচার চলছে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবানের চন্দ্রপাহাড়ে নির্মিতব্য পাঁচ তারকা হোটেলকে ঘিরে। আন্তর্জাতিকমানের এই রিসোর্টটি নির্মাণের জন্য মাত্র ২০ একর জমি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে এখানে ফাইভ স্টার হোটেলটির জন্য জমির প্রয়োজন হবে এক হাজার একর এবং ১০ হাজার জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ হবে। কিন্তু এসব তথ্য প্রকৃত অর্থেই ভূয়া।

আদতে নিজেদের অপকর্ম বলবৎ রাখতেই চন্দ্রপাহাড়াকে ঘিরে পুরোমাত্রায় ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে সেখানে তৎপর দুই উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। গোটা এলাকায় নিজেদের আধিপত্য ও দেদারসে চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখতেই জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ মূল এ গুজব মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছেন।

কিন্তু স্থানীয় এলাকার বাসিন্দারা এমন অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন। তারা চন্দ্র পাহাড়কে ঘিরে পর্যটন শিল্পের বিকাশ চান। আর অন্ধকার তিমিরের জীবনে ঘুরপাক না খেয়ে একটি আন্তর্জাতিকমানের রিসোর্টের দৌলতে নিজেরা যেমন ঘুরে দাঁড়াতে চান তেমনি উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকেও ত্বরান্বিত করতে চান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চন্দ্রপাহাড়ের আন্তর্জাতিকমানের হোটেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার পরেই মাথায় হাত পড়েছে ম্রো সম্প্রদায়ের রাংলাইয়ের মালিকানাধীন ‘সাইরু হিল রিসোর্ট’ কর্তৃপক্ষের। মূলত নিজেদের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী গড়ে উঠার আশঙ্কা থেকেই এই চক্রটি চন্দ্রপাহাড় পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের বিরোধীতায় নেমেছে।

‘সাইরু হিল রিসোর্ট’ নির্মাণের পরেও ম্রোদের সোশ্যাল প্রাইভেসি, পরিবেশ বিপর্যয়, স্বতন্ত্র ঐতিহ্যমণ্ডিত জীবিকা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও স্বকীয়তা নির্মূল না হলেও চন্দ্রপাহাড়ের উদ্যোগের খবরে তারা নানা রকম গুজব-অপপ্রচার শুরু করে। আর তাদের প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে উস্কানি দিচ্ছে চিহ্নিত উপজাতি দুই সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

আরও দেখা গেছে, চন্দ্রপাহাড় প্রকল্পের তিন কিলোমিটার এলাকার মাঝে নূন্যতম কোনো বসতি নেই। এখানকার চারটি পাড়ায় বসবাস করছেন মাত্র ১২৪টি পরিবার। এতে সাকুল্যে জনবল ৮১৭ জন এবং তাদের মধ্যে কারোর উচ্ছেদ হওয়ার কোনো আশঙ্কারও কারণ নেই।

রিসোর্টে নির্মাণের কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে এখন।

চন্দ্রপাহাড়ের নিকটবর্তী পাড়াগুলোর নাম যথাক্রমে কাপ্রুপাড়া, দোলাপাড়া, কলাইপাড়া ও এরাপাড়া। চন্দ্রপাড়া উত্তর-পশ্চিমে ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। ওই পাড়ায় সর্বমোট ৪৮ পরিবারের বসবাস ও মোট জনসংখ্যা ৩২০ জন। চন্দ্রপাহাড় হতে দোলাপাড়া দক্ষিণ-পূর্বে ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। এ পাড়ায় ২০টি পরিবারের মোট জনসংখ্যা ১২০ জন। চন্দ্রপাহাড় থেকে কলাইপাড়া পূর্বে ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। ওই পাড়ায় ৩৭টি পরিবারের বসবাস এবং জনসংখ্যা ২৫০ জন। চন্দ্রপাহাড় থেকে এরাপাড়া উত্তরে ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এবং পাড়ায় মোট ১৯টি পরিবার বসবাস করছেন। তাদের মোট জনসংখ্যা ১২৭ জন। ওই এলাকার ২০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনো বাঙালি জনবসতি নেই এবং বাঙালি একক মালিকানাধীন কোনো প্রকল্পও নেই।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর এক হাজার থেকে দেড় হাজার পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বান্দরবান উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে উন্নত যাতায়াতব্যবস্থা নিশ্চিত, পাহাড়ি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং পাহাড়ি জনগণের উৎপাদিত কৃষিপণ্য আগত পর্যটকদের কাছে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা যাবে। দোকান ও রেস্তোরাঁ ব্যবসার মাধ্যমে স্থানীয় উপজাতীয় জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম ওই এলাকায় বেগবান হবে বিধায় নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও উন্নয়ন হবে। পাঁচতারা হাটেলটি নির্মিত হলে পার্বত্যাঞ্চলের নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশ-বিদেশের পর্যটকের ভিড় বাড়বে। কিন্তু পাহাড়ের স্বার্থান্বেষী একটি মহল তা চায় না। তারা এই আধুনিক যুগেও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রাখতে চায়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ১০০০ থেকে ১৫০০ জন উপজাতি পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বান্দরবান উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সাফল্যের স্বাক্ষর রাখবে।

পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও পাহাড়ীদের জীবন মানের উন্নয়নের জন্য রিসোর্ট এর কাজ শুরু হলেও অপপ্রচারে এখন তা বন্ধ।

বান্দরবান হোটেল মোটেল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, চন্দ্রপাহাড় রিসোর্ট শুধু বান্দরবান নয়, বলা যায় গোটা পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটনের বিকাশে বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে। যথাযথ পরিকল্পনা করে এই এলাকার পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করতে পারলে দেশীয় পর্যটকদের পাশাপাশি প্রচুর সংখ্যক বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটবে। বিশেষত, চন্দ্রপাহাড় রিসোর্ট হলে এখানকার স্থানীয় ম্রো সম্প্রদায়ের জনগণও এর সুফল ভোগ করবে। তারা তাদের উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে আগত পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে লাভবান হবে। পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হবে।

স্থানীয় ম্রো সম্প্রদায়ের পিয়োং ম্রো বলেন, আমাদের পাহাড়ি কিছু লোকের মুখে শুনেছি ১ হাজার একর জমিতে হোটেল নির্মাণ করা হচ্ছে। পাহাড়িদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা এই চন্দ্রপাহাড়ে কখনই কাউকে বসবাস করতে দেখিনি। এটা এতটাই উচুঁ এবং দুর্গম ছিল যে, আমরা কেউই এদিকে আসার চিন্তাও করিনি। এখানে রিসোর্ট তৈরির কাজ শুরু হলে কৌতূহলেই একাধিকবার এসেছি। আর এসেই সব ধারণা পাল্টে গেছে। মাত্র ২০ একর জায়গার স্থলে এতদিন জেনে আসছিলাম হাজার একর।

‘কেউ কেউ বলেছে যে, পাহাড়ের জুম চাষ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় হবে। কিন্তু এত উঁচুতে কখনও জুম চাষ করা হয় না। জুম চাষ মূলত ছোট পাহাড়ের গায়ে চাষাবাদ হয়ে থাকে। এই চন্দ্রপাহাড় নিয়ে মূলত আমাদের কিছু মানুষকে কাজে লাগিয়ে কোনো মহল স্বার্থ হাসিলের জন্য মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। রিসোর্টের বিরুদ্ধে যা বলা হচ্ছে সবকিছুর নেপথ্যে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। এই রিসোর্ট হলে আমরা স্থানীয় পাহাড়ি বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবো। তাই এই দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

রিসোর্টের জন্য বরাদ্দকৃত যায়গা।

ওই এলাকার বাসিন্দা ও বান্দরবান সরকারি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মেহ্লা সিং বলেন, বন্ধুদের উৎসাহে কিছুদিন আগে চন্দ্রপাহাড় বিরোধী একটি মানববন্ধনে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে বিস্তারিত জেনে সেই ভুল থেকে বেরিয়ে আসি। কেননা আমরা লেখাপড়া শিখছি। এখানে আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট হলে নানা ক্ষেত্রেই আমাদের কর্মসংস্থান হবে। ওই রিসোর্ট ঘিরে আরও নানা খাতের উন্নয়ন হবে। আমাদের মধ্যে যারা অতি দরিদ্র আছে তারাও ভালো আয় করতে পারবে। তাই এই ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে হবে। চন্দ্রপাহাড় রিসোর্ট আমাদের জন্য ক্ষতিকর নয়, এটা বরং আশীর্বাদ।

স্থানীয়দের চাওয়া সকল অপ্রচার ও বাঁধা কাটিয়ে দ্রুতই পুনরায় শুরু হোক রিসোর্ট নির্মাণের কাজ।

কালের আলো/বিএস/এমএম

Print Friendly, PDF & Email