বৃহৎ পরিমণ্ডলে প্রশিক্ষণে রণপ্রস্তুতি সেনাবাহিনীর, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে মনোযোগ সেনাপ্রধানের

প্রকাশিতঃ 11:06 pm | January 03, 2023

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫১ বছরের গৌরবোজ্জ্বল
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রশিক্ষণে সূচিত হয়েছিল এক নতুন ধারা। গত বছর লজিস্টিক এফটিএক্স অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদের সমর সক্ষমতার জানান দিয়েছিল অসীম সাহসী সেনারা। এবার প্রায় ১০ বছর পর নব উদ্যমে আরও বৃহৎ পরিমণ্ডলে তিন সপ্তাহের শীতকালীন বহিরঙ্গন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুরোমাত্রায় রণপ্রস্তুতির কার্যকর বহি:প্রকাশ ঘটিয়েছে দেশ মাতৃকাকে নিরাপদে রাখতে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত অকুতোভয় সৈনিকরা। ‘যুদ্ধ পারঙ্গমাতা, যুদ্ধোপযোগিতা ও রণপ্রস্তুতি প্রদর্শন’ এমন প্রতিপাদ্যে আক্ষরিক অর্থেই নিজেদের প্রশিক্ষণ নৈপুণ্য ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে বিশ্বমান নিশ্চিতে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে দেশপ্রেমী এই বাহিনী।

সূত্র জানায়, অতি গুরুত্বপূর্ণ এ প্রশিক্ষণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে সেনাবাহিনীতে নতুন সংযোজিত অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদির কৌশলগত ব্যবহারের। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে পুরোদমে মনোযোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ। বিদায়ী বছরের ১৯ ডিসেম্বর থেকে শীতকালীন প্রশিক্ষণে সারাদেশে নিজ নিজ দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন থাকা সেনাসদরসহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সকল ফরমেশনসমূহ তিনি ঘুরে ঘুরে দেখছেন। উন্নয়ন-অগ্রগতির পানসিতে চড়ে প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক ও স্মার্ট সেনাবাহিনী গড়ার এই কারিগর প্রতিনিয়ত দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।

বহি:শত্রুর আগ্রাসন রুখে দিতে ঐকান্তিক মিলনের শপথেই এক সুতোয় গেঁথেছেন নিজ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে। জীবনের খেরোখাতার পাতা উল্টিয়ে সম্মুখসমরে লড়াইয়ে ‘কঠিন প্রশিক্ষণ সহজ যুদ্ধ’ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নকে মোটা দাগে উপজীব্য করেছেন। সেনাবাহিনীর শীতকালীন প্রশিক্ষণ এলাকা সাভার মিলিটারি ফার্মে ফিল্ড হেডকোয়ার্টার মঙ্গলবার (০৩ জানুয়ারি) পরিদর্শন করে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ দেশকে বহি: শত্রুর আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে তুলতে বাস্তবধর্মী বিভিন্ন সামরিক বিষয়াদি অনুশীলনের মাধ্যমে পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতার উন্নয়ন সাধন করাই এই অনুশীলনের মূল লক্ষ্য বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের রূপকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে লাখো মানুষের সর্বোচ্চ আত্নত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ‘জনযুদ্ধের’ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আমাদের রয়েছে যুদ্ধ জয়ের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, যার মূলমন্ত্রকে বুকে ধারণ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ জাতির গর্ব ও আস্থার প্রতীক। প্রতিবছরের ন্যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গত ১৯ ডিসেম্বর থেকে শীতকালীন প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন হয়েছে এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আজ প্রশিক্ষণের প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি আমাদের এই শীতকালীন প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হয়েছে। আমরা এখন বিগত বছরের চেয়ে অধিক প্রশিক্ষিত, অধিক প্রত্যয়ী এবং বহি:শত্রুর যে কোন আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’

আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সেনাবাহিনী প্রধানের বলিষ্ঠ দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন ধরণের উন্নত যুদ্ধাস্ত্র এবং সরঞ্জামাদি সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তন, নতুন কৌশলের উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আধা সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য এই অনুশীলনের পরিকল্পনা করা হয়। চলতি বছর শীতকালীন বহিরঙ্গণ অনুশীলনটিতে অধিকতর বাস্তবধর্মী ও অভিনব জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। শীতকালীন প্রশিক্ষণ শেষে আগামী ৬ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেনানিবাসে ফিরে যাবেন।

অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান, কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. সাইফুল আলম, আর্মি ট্রেনিং এন্ড ডকট্রিন কমান্ডের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহম্মদ তাবরেজ শামস চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ মেজর জেনারেল মুহাম্মদ যুবায়ের সালেহীন, সামরিক সচিব মেজর জেনারেল খান ফিরোজ আহমেদ, চিফ কনসালটেন্ট জেনারেল, এডহক কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালটেন্ট মেজর জেনারেল এ কে এম রেজাউল মজিদসহ সেনাসদরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আইএসপিআর আরও জানায়, এবারের অনুশীলনে সেনাবাহিনী প্রধান, সেনাসদরের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসাররা, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, আর্মি ট্রেনিং এ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের জিওসি ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন ফরমেশনে অনুশীলন কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন এবং তাৎক্ষণিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্যের পেশাগত উৎকর্ষতা সাধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সার্বিকভাবে একটি বিশ্বমানের বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান।

বঙ্গবন্ধুর দর্শন বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর বহুমাত্রিক কর্মপ্রয়াস
ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শন ‘জনগণের সেনাবাহিনী’ বাস্তবায়নে সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ’র প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় এই বছরও শীতকালীন প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অঞ্চলসমূহ নিজস্ব দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় বহুমাত্রিক কর্মপ্রয়াস নিয়েছে সেনাবাহিনী। অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি শীতার্ত মানুষদের শীতবস্ত্র, বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান ও ওষুধ বিতরণসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।এছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় গবাদিপশুর বিনামূল্যে চিকিৎসা, পরামর্শ প্রদান ও ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে।

সেনাবাহিনী প্রধান সাভারে ফিল্ড হেডকোয়ার্টার পরিদর্শনের আগে ৬ স্বতন্ত্র এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি ব্রিগেড এবং ৮৬ স্বতন্ত্র সিগন্যাল ব্রিগেডের শীতকালীন প্রশিক্ষণ এলাকা আশুলিয়ার দত্তপাড়া পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালীন সময় তিনি ৯০০ অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন। এছাড়া বিনামূল্যে স্থানীয় ৪৬৩ জনকে মেডিকেল চিকিৎসা ও ওষুধ দেয়া হয়।

কালের আলো/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email