আমরা গণতন্ত্রের সুরক্ষায় কঠোর আইন করেছি : প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিতঃ 5:43 pm | September 28, 2022

ডেস্ক রিপোর্ট, কালের আলো:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সেনাবাহিনীর ‘নিয়ম ও প্রবিধান লঙ্ঘন’ করে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের পদে থেকে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে সব নিয়মকানুন বদলে দেন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য। জিয়া নিহত হওয়ার পর এরশাদও একইভাবে ক্ষমতায় আসে। সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতায় আসার এখন আর কোনো সুযোগ নেই। আমরা গণতন্ত্রের সুরক্ষায় কঠোর আইন করেছি।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের ৭৭তম অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালে এই একান্ত সাক্ষাৎকার দেন প্রধানমন্ত্রী। ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান শতরূপা বড়ুয়া প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।

ভয়েস অব আমেরিকার ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়েছে। এ সময় বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, মিডিয়ার স্বাধীনতা, আগামী নির্বাচন ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন শতরূপা বড়ুয়া। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এই সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব প্রশ্নের জবাব দেন ও নানা বিষয়ে কথা বলেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলের নানা অর্জনও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৭ সালে বিএনপি সরকারের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, লুটপাট, সন্ত্রাসের কারণে দেশে একটা চরম অরাজকতার সৃষ্টি হয়। তখন ইমারজেন্সি ডিক্লেয়ার হয়। দুইটা বছর যারা ক্ষমতায় ছিল তারা আমাকে গ্রেপ্তার করে। বন্দিখানাই কেউ নাই। আমি একদম একা একটা বাড়িতে আটকা। আমি সময় নষ্ট করিনি। আমার কেন যেন মনে হলো—ঠিক আছে এই অবস্থা থেকে পরিবর্তন তো একদিন আসবেই। আমরা যদি ক্ষমতায় যাই তাহলে কী করব?’

‘আমি ওখানে বসে বসে নোট করা শুরু করি। যে এত সালের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়াবো, এত সালের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা দিব, এত সালের মধ্যে স্যনিটেশনের ব্যবস্থা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করব। রাস্তাঘাট কী কী করব, কোন জায়গায় কোন ব্রিজ করতে হবে। এগুলো সমস্ত কিছুর একটা নোট করে রেখে দিলাম।’

এরপর ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হলো জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের ইলেকশন মেনিফেস্টোতে রূপকল্প-২১ অর্থাৎ ২০২১-কে লক্ষ্য করে আমাদের পরিকল্পনাটা নিলাম। সেটির ওপর ভিত্তি করেই কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করলাম। আমাদের উন্নয়নটা কিন্তু নিজেদের পরিকল্পনা নিয়েই কাজ শুরু করি। এর ফলে আমরা আস্তে আস্তে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলাম।’

‘২০০৯ সালে আমরা সরকার গঠন করার পরে আবার ২০১৪ সালে নির্বাচন হলো। জনগণ আমাদের কাজে খুশি হয়ে আমাদের আবার ভোট দিল। আমরা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসলাম। আবার একটা সুবিধা হলো ধারাবাহিকতা থাকলে কাজগুলো এগিয়ে নেওয়া যায়। এরপর তৃতীয়বারও যখন নির্বাচন হলো তখন আমাদের ব্যাপকভাবে তারা ভোট দিলো এবং আমাদের কাজগুলি আমরা করতে পারলাম।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের যা লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য বিমোচন করা প্রায় ৪১ শতাংশ থেকে আমরা ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নামালাম। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য আরও বেশি ছিল। আমি তো বলেছিলাম আমরা আরও কমিয়ে অন্তত ১৬-১৭ শতাংশ নামিয়ে নিয়ে আসবো দারিদ্র্যের হার। এর মাঝে যেটা হলো করোনাভাইরাস এসে অগ্রযাত্রাটা একটু ব্যাহত করে দিলো। সেখান থেকে আমরা যখন আবার একটু উত্তরণ ঘটাতে শুরু করলাম ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ সেটাও আজকে একটা বাধা সৃষ্টি করল।’

প্রধানমন্ত্রী জানান, তার সরকারের সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০২০ সালের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন আর ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন ঘিরে তৈরি ছিল।

তিনি বলেন, ‘এই উন্নয়ন পরিকল্পনায় আমরা যেটা সবচেয়ে বেশি করেছি সেটা হলো যত বেশি অর্থ সরবরাহ গ্রামে করা যায় অর্থাৎ গ্রামের মানুষকে তুলে নিয়ে আসা। যেমন যারা গৃহহীন মানুষ, এটা স্বাধীনতার পর আমার বাবা শুরু করেছিলেন যে ভূমিহীন মানুষকে তিনি জমি দেবেন ঘর করে দেবেন। আমরা সেই কাজটা আবার শুরু করলাম।’

সাক্ষাৎকারে শতরূপা বড়ুয়ার অপর এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি যখন ৯৬ সালে প্রথম আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর দিতে শুরু করলাম, তখন মানুষের এমন দূরবস্থা ছিল যে আমি যখন আলাদা ঘর দিতাম সেগুলো তারা রাখতে পারতো না। একটু অর্থশালী বিত্তশালীরা কিছু টাকা পয়সা দিলেই জমি ও ঘরটা বিক্রি করে দিত। অনেক সময় কাজ করার সুযোগ পেত না বলে ঘরবাড়ি বিক্রি করে দিত।’

‘…এটা মাথায় রেখে আমি চিন্তা করলাম যে এমনভাবে তৈরি করে দেব যে কেউ যাতে বিক্রি করতে না পারে। তখন আমরা যে প্রকল্পটা শুরু করেছিলাম ব্যারাকহাউজ। মানে এক একটা ব্যারাকের মধ্যে বড় কামরা করে দিলাম। এটা করা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে আমাদের দেশে প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় হয়। তখন দেখলাম অনেক লোক গৃহহীন হয়ে যায়।’

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে শতরূপা বড়ুয়ার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গণমাধ্যমে বেসরকারি খাতের অন্তর্ভুক্তি উন্মুক্ত করে দেয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন দেশে ৪৪টি টেলিভিশনের অনুমোদন আছে এবং ৩২টি চালু আছে। এসব চ্যানেলে টক শোতে বক্তারা সরকারের বিভিন্ন সমালোচনা করছেন। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে নানা কথা বলছেন তারা। সব কথা বলার পরও কেউ যদি বলে যে আমাকে কথা বলতে দিলো না, তার কি জবাব আছে?’

একসময় দেশে প্রতি রাতে কারফিউ জারি করা হতো আর মানুষ রাস্তায় বের হতে পারতো না—এ বিষয়টি তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৯ বার ক্যু হয়েছে। আরও কয়েকবার ক্যুর চেষ্টা করা হয়েছে। সেসময় মানুষ কথা বলতে পারতো না। মত প্রকাশের অধিকার ছিল না। এখন মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে।’

কালের আলো/ডিএস/এমএম

Print Friendly, PDF & Email