সুইটির ‘দেবদূতের প্রশ্ন– কেন সড়কে জন্ম নিলাম?

প্রকাশিতঃ 11:13 am | July 19, 2022

রেজানুর রহমান :

একটি সড়ক দুর্ঘটনা। দ্রুতগামী ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা গেলেন মা। একই সময়ে অন্তঃসত্ত্বা মায়ের পেট চিড়ে বেরিয়ে এলো নবজাতক, কন্যাশিশু। একই ঘটনায় শিশুটির বাবা, বোনও মারা গেছে। পাশাপাশি রাস্তার ওপর পড়ে আছে ৪ জন মানুষ। তিন জন মৃত। একজন সবেমাত্র পৃথিবীতে এসেছে। মৃতদের পাশেই কান্নার সুর তুলে পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ব জানিয়ে দেবার চেষ্টা করছে।

প্রিয় পাঠক, ভাবুন তো একবার জন্ম আর মৃত্যুর এমন করুণ ঘটনা পৃথিবীর আর কোথাও কি ঘটেছে? বিশেষ করে ওই মায়ের কথা একবার ভাবুন তো! জীবন দিয়ে জীবন দান করে গেলেন। সড়ক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে জীবন দিলেন স্বামী, স্ত্রী ও কন্যা। ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হলেন মা। পেট ফেটে নাড়িভুঁড়ির সঙ্গে বেরিয়ে এলো নবজাতক। ছিটকে পড়ে গেলো রাস্তার ওপর। এমন অবিশ্বাস্য পরিস্থিতিতে নবজাতকের কি বাঁচার কথা? কিন্তু কথায় আছে ‘রাখে আল্লাহ মারে কে?’ মহান সৃষ্টিকর্তাই দেবদূত শিশুটিকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটির ছবি ছাপা হয়েছে। কপালে কালো রঙের বড় টিপ। বাম হাতে ব্যান্ডেজ। কী যে মায়াময় চেহারা। অপলক তাকিয়ে আছে! সে কী তার মাকে খুঁজছে? যদিও মা কি জিনিস সে বোধ এখনও হয়নি তার। মাত্র তো একদিন বয়স। কিন্তু ছবিতে মনে হচ্ছে একদিনেই তার বয়স বেড়ে গেছে। বোধকরি অনেক কথা, অনেক প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছে?

তার ছবির দিকে তাকিয়ে আছি। কষ্টে বুকের ভেতরটা মোচড় দিচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো দেবদূত আমাকে প্রশ্ন করলো– কী দেখো?

বিব্রত, অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বললাম, তোমাকে দেখি!

আমাকে, কী দেখো?

তুমি অনেক সুন্দর।

দেবদূত আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলো– আমার মাকে দেখেছো?

না।

আমার মা আমার চেয়েও সুন্দর। তোমরা তাকে মেরে ফেললে?

মনে হলো আমার পিঠে কেউ চাবুক মারলো। দেবদূতের দিকে তাকাবার সাহস পাচ্ছি না।

দেবদূত বললো, আমার বাবা-মায়ের কী দোষ ছিল বলেন তো? আর আমার ছোট বোনটার? আমি যখন মায়ের পেটে, ছোট বোনটার সাথে প্রতিদিন কথা হতো। সে আমার আসার অপেক্ষায় ছিল। অথচ তাকেও তোমরা মেরে ফেললে? কথা বলছো না কেন? জবাব দাও…।

আমার পিঠে চাবুকের শব্দ বাড়ছে। সত্যি সত্যি দেবদূতের চোখের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছি না। ও হয়তো আরও কঠিন কঠিন প্রশ্ন করবে। কোনও প্রশ্নেরই জবাব আমার কাছে নেই। দেবদূত প্রশ্ন করলো– তুমি কি আমার কথা শুনে বিব্রতবোধ করছো?

না, মানে, হ্যাঁ…

তবু একটা ছোট্ট প্রশ্ন করি।

হ্যাঁ করো।

এই যে সড়ক দুর্ঘটনাটা হলো। আমার বাবা-মা-বোন মারা গেলো। মৃত মায়ের পেট চিড়ে আমি বেরিয়ে এলাম তোমাদের পৃথিবীতে। তুমি, তোমরা কি এভাবে পৃথিবীতে এসেছো?

না।

তোমরা জন্মেই নিশ্চয়ই মা-বাবার দেখা পেয়েছ?

হ্যাঁ।

তাহলে আমি কেন আমার বাবা-মায়ের দেখা পেলাম না? আমাকে কেন রাস্তার ওপর জন্ম নিতে হলো? এর দায় কার? জবাব কার কাছে খুঁজবো? বলো, জবাব দাও…!

দেবদূতের এই প্রশ্নেরও জবাব দিতে পারলাম না। অথচ সব প্রশ্নেরই জবাব আছে। দেবদূতের এই প্রশ্নের জবাব কী?

কয়েক মাস আগে সীতাকুণ্ডে বাবার শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়িতে ফেরার পথে গোটা একটি পরিবারের পুরুষ সদস্যের জীবন প্রদীপ নিভে যায় মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায়। কিন্তু এই ঘটনায় কার্যকর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা কেউ জানে না। প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ মারা যাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা একজনের মৃত্যু মানেই একটি পরিবারের কান্না, একটি পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। অথচ প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১০-১৫ জনের মৃত্যু হচ্ছে। অথচ সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

ময়মনসিংহের ত্রিশালের মর্মান্তিক ঘটনাটিকে কেন্দ্র করেও কি আমাদের দেশে সড়ক ব্যবস্থায় একটি কার্যকর আইন চালু হতে পারে না? ত্রিশালের মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মায়ের পেট চিড়ে বেরিয়ে আসা শিশুটির সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব কে নেবেন? সেটাও বড় প্রশ্ন। প্রচার মাধ্যমে যতটুকু জানলাম তাতে মনে হলো শিশুটির পরিবার বেশ গরিব। দাদা-দাদি বেঁচে আছেন। শিশুটির আরও দুটি ভাই-বোন আছে। ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক অলৌকিক শিশুটির দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন বলে বিভিন্ন পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম অনেকে শুধু শিশুটির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই ক্ষেত্রে আমি কিছুটা দ্বিমত পোষণ করছি। শিশুটিকে তার দাদা-দাদি ও ভাইবোনদের থেকে আলাদা করা ঠিক হবে না। শিশুটির জন্য বিত্তবানদের সহায়তায় একটি ফান্ড গঠন করা যেতে পারে। যাতে শিশুটিসহ তার দুই ভাই বোন এবং দাদা-দাদিও নির্বিঘ্নে জীবনযাপন করতে পারে। পাশাপাশি শিশুটির স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি সে-সহ অপর দুই ভাইবোনের লেখাপড়ার বিষয়টিও যাতে নির্বিঘ্নে হয় সে ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

আরও জরুরি মর্মান্তিক এই সড়ক দুর্ঘটনাসহ দেশে ইতোমধ্যে সংঘটিত সকল সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। সেটা না করা গেলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো।টার্গেট’ শাকিব

Print Friendly, PDF & Email