নারকীয় পরিকল্পনার অপারেশন সার্চলাইট

প্রকাশিতঃ 10:59 am | March 25, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:

বাঙালির কমপক্ষে এক প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার নারকীয় পরিকল্পনার নাম অপারেশন সার্চলাইট। ২৫ মার্চের কালরাতের নিষ্ঠুরতার প্রস্তাব করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন পশ্চিম পাকিস্তানে পাকি সশস্ত্র বাহিনীর এক বৈঠকে এই অপারেশনের প্রস্তাব করা হয়। আর ১৭ মার্চ জেনারেল হামিদ টেলিফোন করে আরেক জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে এই ভয়াবহ অপারেশনের পরিকল্পনা করার দায়িত্ব দেয়।

১৮ মার্চ সকালে ঢাকা সেনানিবাসের জিওসি কার্যালয়ে বসে জেনারেল রাজা ও কুখ্যাত মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী অপারেশনের মূল পরিকল্পনা তৈরি করেন। পরিকল্পনাটি জেনারেল ফরমান নিজ হাতে হালকা নীল রঙের একটি অফিস প্যাডের ৫ পাতা জুড়ে লিড পেন্সিল দিয়ে লেখেন বলে বিভিন্ন গবেষণা দলিলে উঠে এসেছে।

মূলত রাজনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদানকারী বাঙালীদের একটি প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয় অপারেশন সার্চলাইটে। ওই পরিকল্পনার ছয়টি লক্ষ্য ছিল। প্রথম লক্ষ্য ছিল সারা পূর্ব পাকিস্তানে একযোগে অপারেশন শুরু করতে হবে। দ্বিতীয়, সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষকদের গ্রেফতার করতে হবে। তৃতীয়, ঢাকায় অপারেশন ১০০ ভাগ সফল হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল এবং তল্লাশি করতে হবে। চতুর্থ, সেনানিবাসকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনে যতো অস্ত্র দরকার ব্যবহার করা হবে। পঞ্চম টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও ও টেলিগ্রাফসহ সকল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে এবং ষষ্ঠ অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেড়ে নিয়ে সকল পূর্ব পাকিস্তানী (বাঙালী) সৈন্যদলকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে হবে।

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে এদেশের মানুষ তাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তার দল আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। তাদের স্বপ্ন ছিল অত্যাচারী পাকিস্তানী সেনাশাসনের বদলে এদেশে আওয়ামী লীগ ৬ দফা অনুসারে সরকার গঠন করবে। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী মনে করে, বাঙালীদের হাতে ক্ষমতা দেয়া মানে পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে যাওয়া। তাই যে কোন মূল্যে পূর্ব পাকিস্তানকে দখলে রাখার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তারা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেয়ার বদলে তাদের হত্যা করার নীল নক্সাই চূড়ান্ত করে।

বাঙালীদের হত্যার এই নীল নকশার প্রমাণ পাওয়া যায় পরাজিত পাকিস্তানী বাহিনীর অধিনায়ক নিয়াজির ‘বিট্রায়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ গ্রন্থে। নিয়াজি তার পূর্বসূরী জেনারেল টিক্কা খান প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তার বাইতে উল্লেখ করেছেন টিক্কা তার অধীন পাকিস্তানী সেনাদের বলেছিলেন, ‘আমি মাটি চাই, মানুষ চাই না।’

পাকিস্তানী শাসকচক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোও। তবে এই ষড়যন্ত্রের আঁচ পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। তিনি বুঝতে পারছিলেন, পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী কোনভাবেই বাঙালীদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তাইতো বিষয়টি তিনি বাঙালী জাতির কাছে স্পষ্ট করার জন্য ২৪ মার্চ সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। জনাকীর্ণ ওই সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘জনসাধারণের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রক্রিয়া বানচালের চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জাগ্রত জনতা, কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র ও জানগণকে আমাদের বিজয় বানচালের ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত হতে হবে।’ তিনি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, ‘জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বানচালের উদ্দেশ্যে ইচ্ছেকৃতভাবে কৃত্তিম সঙ্কট সৃষ্টি করা হচ্ছে।’

২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটে নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল ফরমান আলী খান। তার নেতৃত্বে ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনী এ দেশের ঘুমন্ত মানুষদের হত্যা করার জন্য সেনা ছাউনী ছেড়ে বেরিয়ে যায় লোকালয়ে। অভিযানের প্রস্তুতি হিসাবে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলির নির্দেশে ২৫ মার্চ সকালে পিলখানার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে নেয় পাকিস্তানি সেনারা। তখন বাঙালী ইপিআর অফিসারদের পাকিস্তানী অফিসাররা পিলখানায় নানাভাবে ব্যস্ত রাখে এবং সৈন্যদের প্রায় সবাইকেই কাজ বন্ধ রেখে বিশ্রামে পাঠানো হয়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার পর ২৫ মার্চ বিকেলে ইচ্ছে করেই ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ করে দিয়ে আলোচনা ব্যর্থ করে দেন। কারণ আলোচনার টেবিলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করতে হলে নির্বাচনে দলের নেতা বঙ্গবন্ধুর কাছে পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। যেহেতু আওয়ামী লীগ তথা পূর্ব পাকিস্তানের কোন রাজনৈতিক দলের কাছে সামরিক জান্তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তাই তারা পরিকল্পনা মোতাবেক আলোচনা ব্যর্থ করে দেন।

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইয়াহিয়া খান আর ঢাকায় অবস্থান করেননি। তিনি সন্ধ্যা পৌনে ছয়টায় প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে সরাসরি এয়ারপোর্টে চলে যান। রাত পৌনে আটটায় তিনি গোপনে বিমান যোগে ঢাকা ত্যাগ করেন। ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে পূর্ব বাংলায় নিরপরাধ বাঙালীদের ওপর কাপুরুষোচিত সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি শুধু বাংলার মাটি চাই, মানুষ নয়।’

সন্ধ্যার পরপরই সারা শহরে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় ‘ইয়াহিয়া খান ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে’। তখন আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় রাস্তায় হালকা ব্যারিকেড বসানো শুরু করে। কিন্তু এই সব প্রতিবন্ধকতা পাকিস্তানী সৈন্যদের ভারি ভারি অস্ত্রশস্ত্র ও সাঁজোয়া যানের কাছে পাত্তাই পায় না। যেসব স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করছিল উল্টো তারাই প্রথম সৈন্যদের আক্রমণের শিকার হয় এবং পাকিস্তানী জান্তারা তাদের হত্যা করে।

যদিও অপারেশন রাত ১১টায় শুরু হবার কথা, পাকিস্তানী সৈন্যরা সাড়ে ১১টায় ঢাকা সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসে। কারণ পাকিস্তানী ফিল্ড কমান্ডার চাইছিলেন যে বাঙালী সৈন্যরা যাতে কোন বাধা দিতে না পারে। সেনাবাহিনীকে পুরো অপারেশনের জন্য ৬ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল। পাকিস্তানী সৈনরা আক্রমণ শুরু করার আগে আগেই দ্রুততার সঙ্গে ঢাকা শহরের সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে সেনানিবাসে পাকিস্তানীরা সহজেই নিরস্ত্র করে দেয় এবং তাদের হত্যা করে। ৩১তম ফিল্ড রেজিমেন্টকে ঢাকার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং শহরের উত্তরাংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেয়া হয়। মেজর বেলাল এবং লে. কর্নেল জেড এ খানের সঙ্গে নিযুক্ত কমান্ডো বাহিনী অপারেশনের শুরুতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। বঙ্গবন্ধুকে রাত দেড়টায় তার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সৈন্যরা। কিন্তু আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ বড় নেতাই পাকবাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

বালুচ রেজিমেন্টটি ইপিআর সদর দফতরে অবস্থিত নিরস্ত্র আর অসংগঠিত ইপিআর সৈন্যদের আক্রমণ করে। সেখানে বাঙালী অসীম সাহসী যোদ্ধারা সারা রাত যুদ্ধ করে সুসজ্জিত পাকবাহিনীকে আটকে রাখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকালের দিকে তারা হেরে যায়। তাদের বেশিরভাগই সেখানে মারা যান এবং বাকিরা পালিয়ে যান। পাকিস্তানী বাহিনী এক রকম কোনো বাধা ছাড়াই মিরপুরে অবস্থানরত ইপিআর বাহিনীকে গ্রেফতার এবং রাষ্ট্রপতি ভবন ও গভর্নর হাউস দখল করে নেয়। এখানেও অনেক বাঙালী পালাতে পারলেও বেশিরভাগই মারা যান।

পাঞ্জাব রেজিমেন্টের দুটি অনিয়মিত বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা আক্রমণ করে। ছাত্ররা আর আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেও তারা পাকবাহিনীর হাতে মারা যান। প্রত্যেকটি হলে ঢুকে নিরস্ত্র ছাত্রদের খুঁজে বের করে হত্যা করে সেনা সদস্যরা। একই সঙ্গে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু অগ্রগণ্য শিক্ষককেও।

রাজারবাগে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবী ও স্থানীয় মানুষের সহায়তায় পাক জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু পাকিস্তানীদের ভারি অস্ত্রশস্ত্রের কাছে তারাও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। যারা বেঁচে যায় তাদের বেশিরভাগই ধরা পড়েন অথবা এদিক সেদিক পালিয়ে যান। ২৬ মার্চ সকালে সেনা সদস্যরা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা এবং পুরান ঢাকা আক্রমণ করে।

ভোরের মধ্যে ঢাকা শহর আক্রমণকারীদের দখলে চলে যায়। এরপর খুনীরা শহরজুড়ে কারফিউ জারি করে। বেঁচে যাওয়া পুলিশ এবং ইপিআর সেনারা শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়, কেউ কেউ বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে জিঞ্জিরায় গিয়ে সংগঠিত হতে থাকেন।

শুধু হত্যা আর গ্রেফতারই নয়, হায়েনারা শহীদ মিনার, দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যালয়, ডেইলি পিপলসের কার্যালয় আর রমনার কালী মন্দিরও ধ্বংস করে দেয়। ধরা পড়া বাঙালী সৈন্য এবং ইপিআর ও পুলিশ কর্মকর্তাদের হয় মেরে ফেলা হয় নয়তো কোন বিচার ছাড়াই জেলখানায় বন্দী করা হয়। এই অপারেশন চলতে থাকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত। অপারেশন সার্চলাইটে ঠিক কত লোক মারা পড়েন তার সঠিক কোন হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণায় ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞের কালরাতে কয়েক লাখ বাঙালীকে বর্বর কায়দায় হত্যা করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

কালের আলো/এসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email