Kaler Alo
শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬
২২ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

ট্রাম্পের ক্ষমতায় লাগাম, ইরান যুদ্ধে আসছে কি বিরতি?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

ট্রাম্পের ক্ষমতায় লাগাম, ইরান যুদ্ধে আসছে কি বিরতি?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় দেশটির অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ, বিতর্কিত শুল্কনীতি এবং অভিবাসন কার্যক্রম নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে কঠোর রাজনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে সামরিক ব্যয় অনুমোদন, প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তদন্ত এবং নতুন আইন প্রণয়নে ডেমোক্র্যাটদের হাতে বাড়তি ক্ষমতা আসছে।

আগামী ২০২৭সালে জানুয়ারির শুরুতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাবে। এত দিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় জায়গায় রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলো বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অপছন্দের আইন প্রস্তাবে বাধা দেওয়ার সুযোগ পাবেন তাঁরা।

তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে। ফলে ইরান যুদ্ধসহ গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে বাড়তে পারে চাপ
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের ভূমিকা রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন খোদ ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নির্বাচনে হারের পেছনে ইরান যুদ্ধ আংশিক দায়ী। তবে ইরানকে ঘিরে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপের গুরুত্বও মানুষ বোঝে বলে দাবি করেন তিনি।

মূলত মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারে ডেমোক্র্যাটরা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ ব্যয়ের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে এই অসন্তোষ কাজে লাগিয়েছেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এখনো নতুন করে হামলার নির্দেশ দিতে পারেন। তবে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর সামরিক অভিযানের অর্থায়ন নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে আগামী ১১ ডিসেম্বর বর্তমান সরকারি অর্থায়নসংক্রান্ত বিলের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন করে সামরিক বাজেট বরাদ্দের সময় ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা ইরান যুদ্ধে অর্থায়নের ওপর শর্ত বা সীমাবদ্ধতা আরোপের চেষ্টা করতে পারেন।

তবে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সেন্টার অন ইউএস পলিটিকসের গবেষণা ফেলো জেমস বয়েজ মনে করেন, কংগ্রেস চাইলেই রাতারাতি যুদ্ধের অর্থায়ন বন্ধ করতে পারবে না। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রে ইতিমধ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এ অবস্থায় অর্থায়ন পুরোপুরি বন্ধ করলে সেনাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন’ বা যুদ্ধ ক্ষমতা আইন ব্যবহার করেও ট্রাম্পকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। এই আইনে প্রেসিডেন্ট আকস্মিক হামলা মোকাবিলায় সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। তবে কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না করলে ৬০ দিনের মধ্যে সামরিক অভিযান বন্ধ বা গুটিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট চাইলে এ সিদ্ধান্তে ভেটো দিতে পারেন। সেই ভেটো বাতিল করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।

নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে কম থাকবে।

আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ইউসিডি ক্লিনটন ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক স্কট লুকাসের মতে, ডেমোক্র্যাটরা চাইলে এমন কৌশলগত আইন প্রস্তাব করতে পারেন, যা ট্রাম্পের যুদ্ধনীতিতে চাপ তৈরি করবে। পাশাপাশি নির্বাচনের পর কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও ট্রাম্পের অবস্থান থেকে দূরে সরে আসতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। স্কট লুকাসের দাবি, শুরু থেকেই ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করে আসছেন ভ্যান্স। গত সপ্তাহে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধানের কাছে একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন তিনি। এর উদ্দেশ্য ছিল আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং নতুন হামলা এড়ানো। ফলে যুদ্ধ বন্ধে তিনি আরও জোরালো ভূমিকা নেবেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

তবে জেমস বয়েজের আশঙ্কা, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়লে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা আরও বাড়াতে পারেন। তাঁর মতে, শেষ মেয়াদে থাকা ট্রাম্প বিশ্বরাজনীতিতে নিজের জন্য একটি রাষ্ট্রনায়কোচিত উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে পারেন।

শুল্কনীতিতেও বাড়তে পারে বাধা
ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতিও নতুন কংগ্রেসের চাপে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে গত বছর প্রায় ৯০টি দেশের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন তিনি। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টের ৬-৩ বিচারপতির রায়ে এ শুল্কনীতির একটি অংশ অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

এর কয়েক দিন পর বিকল্প আইনের ভিত্তিতে নতুন নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। এতে শুল্কের হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। তবে কংগ্রেসের অনুমোদন না পেলে এ শুল্কের মেয়াদ ১৫০ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

ডেমোক্র্যাটরা শুরু থেকেই ট্রাম্পের শুল্কনীতির সমালোচনা করে আসছেন। তাঁদের মতে, আমদানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়ে এবং এর চাপ পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। নতুন কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তাঁরা রপ্তানিকারকদের সাময়িক স্বস্তি দিতে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে শুল্ক ছাড়ের দাবি তুলতে পারেন।

তবে মার্কিন বাণিজ্যনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। এ ছাড়া শুল্কসংক্রান্ত বিষয়গুলো এখনো আদালতে বিচারাধীন। ইতিমধ্যে আদায় করা শুল্কের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও আইনি বিতর্ক রয়েছে।

অন্যদিকে, চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে দুই দলের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে ‘রিমোট অ্যাকসেস সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ এবং ‘চিপ সিকিউরিটি অ্যাক্ট’-এর মতো প্রস্তাব নিয়ে দুই দল একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য মার্কিন প্রযুক্তি ও উন্নত এআই চিপের ওপর চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করা।

ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে তদন্তের সুযোগ পাচ্ছেন ডেমোক্র্যাটরা
নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো বিভিন্ন কমিটির সভাপতিত্ব পাওয়ার সুযোগ। অধ্যাপক স্কট লুকাসের মতে, এর ফলে তাঁরা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দিতে তলব করার ক্ষমতা পাবেন।

ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক এবং ইরান যুদ্ধে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আসতে পারে। এমনকি ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আবারও অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর চেষ্টা হতে পারে।

অভিবাসননীতিতেও তদন্তের মুখে প্রশাসন
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণনীতিও ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের আওতায় আসতে পারে। বিশেষ করে অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কারের কার্যক্রমে ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস (আইআরএস) এবং ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির যৌথ ভূমিকা খতিয়ে দেখতে পারেন আইনপ্রণেতারা।

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ব্যাপক হারে অভিবাসী বহিষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর অংশ হিসেবে বিমানবন্দরে অভিবাসীদের আটক এবং অভিবাসন আদালতে তাৎক্ষণিক শুনানির ব্যবস্থা করা হয়।

গত মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে ফক্স নিউজের এক জরিপে দেখা যায়, ৫৩ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার মনে করেন, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের দমনমূলক পদক্ষেপ মাত্রা ছাড়িয়েছে।

অবশ্য হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ দাবি করেছে, তাদের হেফাজতে থাকা অভিবাসীদের প্রায় ৭০ শতাংশের বিরুদ্ধে অপরাধসংক্রান্ত মামলা রয়েছে। তবে সমালোচকেরা এ পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থায় আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয় না।

স্কট লুকাসের মতে, নির্বাচনের ফলাফল ডেমোক্র্যাট ও দায়িত্বশীল রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে অভিবাসনসংক্রান্ত সংকট মোকাবিলা এবং নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

সব মিলিয়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। তবে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইরান যুদ্ধ বন্ধে সরাসরি বাধ্য করতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে সামরিক অর্থায়ন, আইনগত ক্ষমতা এবং কংগ্রেসের ভেতরে দুই দলের সমঝোতার ওপর। সূত্র: আল-জাজিরা

কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন

Link copied!