চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, এমন ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া শুরু হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাব পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড। পরপর দুইবার বা তার বেশি শূন্য পাস করা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার।
একই সঙ্গে অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে আশপাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত বা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের চাকরি বহাল রাখার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
এবার শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৯১টি
শনিবার (৩১ অক্টোবর) এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এবার পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন।
ফলাফলের পাশাপাশি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। এবার ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২০২টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৯১টি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৬৫টি, ২০২৩ সালে ৪২টি, ২০২২ সালে ৫০টি এবং ২০২১ সালে পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। ছয় বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ২৯১টি।
শিক্ষার্থী নেই, কোথাও নেই নিয়মিত শিক্ষক
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোই কার্যত কাগুজে। কোথাও শিক্ষক ও অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষার্থী নেই। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষকও নেই। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে এবার পাঁচ থেকে ১০ জনের মতো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, অনেক এলাকায় প্রয়োজন না থাকলেও কিছু ব্যক্তি মিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য থাকে কয়েক বছর পর প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হলে চাকরির সুযোগ পাওয়া। উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় এ ধরনের প্রবণতা বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব না থাকায় শিক্ষার্থী ভর্তি হয় না, হলেও ভালো ফল করতে পারে না।
১০ শিক্ষার্থীর জন্য ১৭ শিক্ষক, পাস করেননি কেউ
নওগাঁর পত্নীতলা সরকারি টেকনিক্যাল কলেজ থেকে এবার কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন ১০ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের জন্য কলেজটিতে কর্মরত রয়েছেন ১৭ জন শিক্ষক। তবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০ জনের কেউই পাস করতে পারেননি।
২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হামিদুল ইসলাম বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনিয়মিত। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁরা কারখানা কিংবা দোকানে কাজ করেন। তাঁদের ধরে ধরে এনে ক্লাস করাতে হয়। এ কারণে ফলাফল খারাপ হয়েছে।
টানা দুই বছর শূন্য পাস নেত্রকোনার কলেজে
নেত্রকোনা জেলা সদরে অবস্থিত নন-এমপিওভুক্ত ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন কলেজ থেকেও টানা দুই বছর কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। চলতি বছর চারজন পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ উত্তীর্ণ হননি। আগের বছরও দুই পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করেননি।
কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইকবাল হাসান তপু জানান, এটি নন-এমপিও কলেজ। এখানে কোনো নিয়মিত শিক্ষক নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক ডেকে আনা হয়। সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধাও প্রতিষ্ঠানটি পায় না।
তিন বছর ধরে শূন্য পাস ফকিরহাট মহিলা কলেজে
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ফকিরহাট মহিলা কলেজ এবং সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ী মহিলা কলেজ থেকেও এবার কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। ফকিরহাট মহিলা কলেজ থেকে দুজন এবং জুমারবাড়ী মহিলা কলেজ থেকে একজন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ফকিরহাট মহিলা কলেজের কোনো পরীক্ষার্থী গত তিন বছর ধরে উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
কলেজটির অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান রশিদ জানান, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত শুধু পাঠদানের অনুমোদন পাওয়া গেছে। এমপিওভুক্ত না হওয়ায় অনেক শিক্ষকই প্রতিষ্ঠানে আসেন না। দীর্ঘদিন বিনা বেতনে কাজ করায় তাঁদের মধ্যেও আগ্রহ কমে গেছে। ফলে ভালো ফলাফল করা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠান একীভূত করার পরিকল্পনা সরকারের
শূন্য পাস করা এবং অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে বন্ধ না করে আশপাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনেক কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেগুলো রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে সীমিত পরিসরে কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিন্যাস করা যায়, তা নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে।
তিনি আরও বলেন, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাছাকাছি অবস্থিত অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের চাকরি বহাল থাকবে।
এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানান, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। বিগত পাঁচ বছরের শিক্ষার্থীসংখ্যা, পাসের হার এবং শিক্ষকদের তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাব পাওয়ার পর আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে একাধিকবার শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হবে।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরপর দুইবার বা তার বেশি শূন্য পাস করা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অন্যদিকে নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিও দেওয়ার বিষয়েও নতুন করে ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাছাকাছি অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার আলোচনা চলছে।
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি কিংবা পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম, সেগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কালের আলো/এসএ/এমএসআইপি
