একটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, রাজনৈতিক ইতিহাসের বাঁকবদল, গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সর্বজনীনতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা—বাংলাদেশের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রসঙ্গ নিজের এক বক্তব্যেই তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রেক্ষাপট, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক অর্জন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সিভিল সার্ভিসের অতীত অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ দায়বদ্ধতার নানা দিক বিশ্লেষণ করেছেন।
- ৭ নভেম্বরের বিপ্লব, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান: ইতিহাসের উত্তরাধিকার নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য
- ‘৭ নভেম্বর কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়, জুলাইয়ের চেতনাও সমগ্র জাতির’
- প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার আহ্বান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের অন্যতম প্রধান দিক ছিল ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে আসার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। তিনি বলেন, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই ১৯৭৫ সালের ০৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে এদেশের অরক্ষিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছিলেন। মন্ত্রী আরও বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতার মোহে বা নিজ উদ্যোগে ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব ঘটাননি, বরং জাতির মহতী প্রয়োজনে মানুষই তাঁকে নেতা বানিয়েছিল।
শনিবার (০৭ নভেম্বর) রাতে অফিসার্স ক্লাব ঢাকার উদ্যোগে 'জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস ২০২৬' উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
জিয়াউর রহমানের ওপর দেশের নেতৃত্বের ভার
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর এদেশের জনগণের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি; একদলীয় শাসনের কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জাতির মধ্যে ধুমায়িত ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সংকটময় মুহূর্তে ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে সিপাহী-জনতা বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে এনে জিয়াউর রহমানের ওপর দেশের নেতৃত্বের ভার তুলে দিয়েছিল।
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার ভূমিকা ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, তিনি বাংলাদেশকে অরক্ষিত পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে বহু দলীয় গণতন্ত্র, সমসাময়িক অর্থনীতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক এক সংবিধানে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, যা এ দেশের প্রতিটি জনগণকে এক সুতোয় গেঁথে জাতীয়তাবাদের শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দেয়। ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক অর্জন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয় বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ৭ই নভেম্বর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়, এটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও সর্বস্তরের মুক্তিকামী মানুষের এক চিরন্তন ও সার্বজনীন অর্জন।
উপমহাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনার প্রসঙ্গ
উপমহাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশরা যেটিকে সিপাহী মিউটিনি বলে আখ্যা দিয়েছিল, সেটি ছিল মূলত উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ। সেই বিপ্লব ব্যর্থ হলেও ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব ব্যর্থ হয়নি। ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের সফলতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, যদি সেদিন এই বিপ্লব সফল না হতো, তবে বাংলাদেশকে হয়তো দীর্ঘ মেয়াদের জন্য অনাগতকালের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে হতো।
একদিনে গড়ে ওঠেনি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘ সময়ের আত্মত্যাগ, রক্তপাত ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরির বিষয়টি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ২৪-এর রাজনৈতিক চেতনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান একদিনে গড়ে ওঠেনি। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বহু মানুষের আত্মত্যাগ, রক্ত, গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিনিময়ে এই অর্জন অর্জিত হয়েছে। এই অর্জনের মালিকানা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির এককভাবে দাবি করা সমীচীন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই চেতনা সমগ্র জাতির।
রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে জনগণের সেবা করার আহ্বান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল সিভিল সার্ভিসের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা এবং অতীতের রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি। সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে জনগণের সেবা করার আহ্বান জানান তিনি। সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে প্রজাতন্ত্রের সেবা ও জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত নির্বাচিত সরকারের ইশতেহার বাস্তবায়নে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মচারীদের মৌলিক দায়িত্ব হলো বেআইনি আদেশ অমান্য করে নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা ও নির্বাচনকালীন দায়িত্ব সম্পাদন করা।
নিজের প্রশাসনিক পরিচয় ও অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ তুলে সালাহউদ্দিন বলেন, সিভিল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক অংশীদার ও প্রাক্তন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি এই পরিবারেরই একজন। অতীতে রাজনৈতিক চাপ, লোভ কিংবা ভীতির কারণে সিভিল সার্ভিসের একাংশের ভূমিকার সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, অতীতে রাজনৈতিক চাপ, লোভ কিংবা ভীতি থেকে সিভিল সার্ভিসের একাংশ ভোটারবিহীন ও নৈশকালীন নির্বাচন আয়োজনে সহায়তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানসমূহকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যার চরম মাসুল গুনতে হয়েছে সিভিল প্রশাসনকে।
ভবিষ্যতে প্রশাসনকে যেন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম বা ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার কাজে ব্যবহার করা না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে এ ধরনের কলঙ্কজনক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধে কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ডেপুটি কমিশনারগণ মাঠপর্যায়ে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের প্রতিনিধি
রাষ্ট্র পরিচালনায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও মর্যাদার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে। ডেপুটি কমিশনারদের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, ডেপুটি কমিশনারগণ মাঠপর্যায়ে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। ফলে তাঁদের দায়িত্ব অপরিসীম এবং নিজেদের সর্বদা পরিশীলিত রেখে কাজ করতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, পাঁচ বছর পর জনগণ যাদের ম্যান্ডেট দেবে, তাদের হাতেই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে, কারণ পরিবর্তনই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।
শহিদদের স্মরণে নীরবতা, প্রদর্শিত বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র
অফিসার্স ক্লাব ঢাকার সভাপতি ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও অফিসার্স ক্লাব ঢাকার সাধারণ সম্পাদক এ বি এম আব্দুস সাত্তার। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন অফিসার্স ক্লাব ঢাকার ট্রেজারার এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক।
এছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাবেক সচিব ও ডিটিসিএ'র সাবেক নির্বাহী পরিচালক মসিউর রহমান, সাবেক সচিব এস এম জহিরুল ইসলাম এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সচিব মাসুদ আলমগীর হোসেন (মাসুদ আলমগীর হোসেন নোবেল)। অফিসার্স ক্লাব ঢাকার সহসভাপতি এম এ রাজেক অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় এবং পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করা হয়। এরপর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহিদ, ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের শহিদ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে নির্মিত একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয় এবং প্রধান অতিথিকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।
কালের আলো/এমএএএমকে
