Kaler Alo
বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬
১৯ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

বীমা খাতের জালিয়াতি ধরতে যৌথ নিরীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

বীমা খাতের জালিয়াতি ধরতে যৌথ নিরীক্ষা

বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক অনিয়ম, অর্থের অপব্যবহার ও জালিয়াতি শনাক্ত করতে যৌথভাবে বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে দেশের চার নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এর আওতায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) একযোগে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখবে।

প্রস্তাবিত এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বীমা কোম্পানিগুলোর গত পাঁচ অর্থবছরের আর্থিক তথ্য, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ, প্রিমিয়াম সংগ্রহ, দাবি পরিশোধ, কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত নথি এবং পুঁজিবাজারে লেনদেন পরীক্ষা করা হবে। এ জন্য ইতিমধ্যে চার সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ নিরীক্ষার কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্সের (টিওআর) খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক কর্মকাণ্ড বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতাধীন। ফলে আলাদাভাবে নিরীক্ষা করলে অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়। সমন্বিত নিরীক্ষা হলে একই আর্থিক তথ্য একাধিক সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হবে। এতে হিসাবের গরমিল, তথ্য গোপন, অর্থের অপব্যবহার এবং সম্ভাব্য জালিয়াতি শনাক্তের সুযোগ বাড়বে।

জানা গেছে, অন্তত এক ডজন বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, তথ্যের অসংগতি ও অর্থের অপব্যবহারের ঘটনা আড়াল করার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বীমা নিয়ন্ত্রণ সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যেসব কোম্পানি নিজেদের আর্থিক অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে আর্থিক তথ্যে অসংগতি থাকলেও তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

চার সংস্থার দায়িত্ব যেভাবে ভাগ হবে
খসড়া টিওআর অনুযায়ী, এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মাল্টি-রেগুলেটর কো-অর্ডিনেটেড স্পেশাল অডিট’। আইডিআরএর উদ্যোগে চার সংস্থার কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি যৌথ নিরীক্ষা সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে। আইডিআরএর পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন। অন্য সংস্থাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবে।

নিরীক্ষার কারিগরি কাজ পরিচালনার জন্য একটি স্বাধীন ও যোগ্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ কিংবা অনুমোদন করা হবে। প্রতিষ্ঠানটি কোম্পানিগুলোর হিসাবপত্র ও আর্থিক নথি যাচাই করে প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করবে।

আইডিআরএ বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয়, পলিসিধারীদের তথ্য, দাবি নিষ্পত্তি, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, বিনিয়োগ পোর্টফোলিও এবং লাইফ ফান্ডের অবস্থা পরীক্ষা করবে। পাশাপাশি বীমা বিনিয়োগ প্রবিধানমালা, ২০১৯ অনুযায়ী বিনিয়োগ করা হয়েছে কি না, আইডিআরএর অনুমতি ছাড়া স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) ওপর লিয়েন সৃষ্টি করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে।

এ ছাড়া সলভেন্সি মার্জিন প্রবিধানমালা, ২০২৪ এবং আইএফআরএস-১৭ অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সেটিও নিরীক্ষার আওতায় থাকবে। কোম্পানিগুলোর গাড়ি কেনা, জ্বালানি ব্যয়, পুনঃবীমা এবং পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণীও পরীক্ষা করবে সংস্থাটি।

ব্যাংক হিসাব ও মূলধন যাচাই করবে বাংলাদেশ ব্যাংক
ব্যাংক বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যাংক হিসাব, ঋণ, বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর, নগদ উত্তোলন এবং অস্বাভাবিক লেনদেন পরীক্ষা করবে। উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সঙ্গে কোম্পানির আর্থিক লেনদেনের উৎস ও গন্তব্যও অনুসন্ধান করা হবে।

বিশেষ করে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন প্রকৃতপক্ষে ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছিল কি না, নাকি সার্কুলার বা কৃত্রিম লেনদেনের মাধ্যমে মূলধন দেখানো হয়েছে, তা যাচাই করা হবে। বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন, রেমিট্যান্স এবং পুনঃবীমার অর্থ দেশে এসেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

পাশাপাশি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নির্দেশনা পরিপালনের বিষয়টি পরীক্ষা করা হবে। অর্থের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকের পরিচয় যাচাইও থাকবে এই নিরীক্ষার আওতায়।

কর ফাঁকি ও শেয়ার কারসাজিও খতিয়ে দেখবে
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণী, হিসাবের খাতা এবং আয়কর রিটার্নের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করবে। অঘোষিত আয়, গোপন লেনদেন, ভুয়া ব্যয়, উৎসে কর কর্তন এবং ভ্যাটসংক্রান্ত অনিয়মও খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে এনবিআর নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিতে পারবে।

অন্যদিকে বিএসইসি কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণীর সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখবে। অনুমোদিত, ইস্যুকৃত ও পরিশোধিত মূলধন, উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার ধারণ, শেয়ার বন্ধক, লক-ইন শর্ত এবং মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের বিষয়গুলো যাচাই করা হবে।

এ ছাড়া লভ্যাংশ, বোনাস শেয়ার, করপোরেট গভর্ন্যান্স, ইনসাইডার ট্রেডিং এবং শেয়ার কারসাজির লক্ষণ পরীক্ষা করবে বিএসইসি। আইপিও বা রাইট শেয়ারের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যয় হয়েছে কি না, সেটিও দেখা হবে।

পাঁচ অর্থবছরের তথ্য দিতে হবে কোম্পানিগুলোকে
প্রাথমিকভাবে বীমা কোম্পানিগুলোর গত পাঁচ অর্থবছরের তথ্য নিরীক্ষার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রয়োজনে এই সময়সীমা বাড়ানো বা কমানো যাবে। নিরীক্ষার প্রয়োজনে কোম্পানিগুলোকে হিসাবের খাতা, ভাউচার, ব্যাংক লেনদেনের নথি, করসংক্রান্ত কাগজপত্র, বীমা দাবি নিষ্পত্তির রেকর্ড এবং পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণী সরবরাহ করতে হবে। পাশাপাশি সরেজমিন তদন্তেও সহযোগিতা করতে হবে।

নিরীক্ষায় পাওয়া গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ও বাণিজ্যিক নথির গোপনীয়তা রক্ষার বিধানও রাখা হয়েছে। প্রতিটি সংস্থা নিজ নিজ এখতিয়ারে পাওয়া অনিয়ম, আর্থিক পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রযোজ্য আইনি ধারার তথ্য প্রতিবেদনে তুলে ধরবে। পরে সব তথ্য সমন্বয় করে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।

নিরীক্ষার কোনো বিষয়ে সংস্থাগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে প্রথমে যৌথ সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে তা নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। সেখানে ঐকমত্য না হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নিজস্ব মতামত ও যুক্তি তুলে ধরতে পারবে।

খসড়া টিওআরে বলা হয়েছে, প্রতিটি সংস্থা নিজ নিজ আইনি এখতিয়ারের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করবে। ফলে যৌথ নিরীক্ষার মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক কর্মকাণ্ডের সমন্বিত চিত্র পাওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

Link copied!