সাতক্ষীরা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

৩০০ ফুট বাঁধ ধসে প্লাবনের শঙ্কায় উপকূলবাসী

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

৩০০ ফুট বাঁধ ধসে প্লাবনের শঙ্কায় উপকূলবাসী

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বন্যতলা এলাকায় খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। আকস্মিক ঝোড়ো হাওয়া ও নদীর উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে বাঁধের প্রায় ৩০০ ফুট অংশ ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে বন্যতলা গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী প্রতাপনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আতঙ্কিত গ্রামবাসী নিজেদের বসতভিটা ও জনপদ রক্ষায় রাতেই স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করেছেন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভাগ-২-এর আওতাধীন ৭/১ পোল্ডারের বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে এ ভাঙন দেখা দেয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে।

৩০০ ফুট বাঁধ ধসে, কোথাও অবশিষ্ট মাত্র দেড় ফুট
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া শুরু হলে খোলপেটুয়া নদীতে ঢেউয়ের তীব্রতা বেড়ে যায়। নদীর প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে বন্যতলা এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের প্রায় ৩০০ ফুট অংশে ফাটল ধরে। পরে বাঁধের ওই অংশ ধসে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। পদ্মপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদুল ইসলাম জানান, ভাঙনকবলিত অংশের কোথাও কোথাও বাঁধের মাত্র এক থেকে দেড় ফুট অবশিষ্ট রয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাওয়ায় গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হয় এবং বাঁধ রক্ষার কাজে অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়।

রাতেই জিও ব্যাগ নিয়ে বাঁধ রক্ষায় গ্রামবাসী
মসজিদের মাইকে ঘোষণা শোনার পর বন্যতলা গ্রাম ও আশপাশের এলাকা থেকে লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রতাপনগর ইউনিয়নের বাসিন্দারাও বাঁধ রক্ষার কাজে অংশ নেন। নিজেদের ঘরবাড়ি ও এলাকার জনপদ রক্ষায় তাঁরা স্বেচ্ছাশ্রমে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ভাঙন পয়েন্টে ফেলা শুরু করেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় রাতেও এ কার্যক্রম চলে। ভাঙন পয়েন্টের কিছু অংশে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে পুরো ঝুঁকিপূর্ণ অংশের ভাঙন ঠেকাতে আরও কাজ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী আবু দাউদ ঢালি বলেন, ভাঙন পয়েন্টটি পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বন্যতলা এলাকায় হলেও এটি প্রতাপনগর ইউনিয়নের লাগোয়া। ওই স্থান দিয়ে নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকলে প্রতাপনগর ইউনিয়ন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খবর পাওয়ার পর তিনি স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। পাউবো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে বাঁধ রক্ষার কাজ অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

সময়মতো জিও ব্যাগ না ফেলায় ক্ষোভ
বেড়িবাঁধের ভাঙন নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বন্যতলা এলাকায় বাঁধ সংস্কারের জন্য অনেক আগেই ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছিল। খুলনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বাবুল এন্টারপ্রাইজ কাজটি পেয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবহারের জন্য বালুভর্তি হাজার হাজার জিও ব্যাগও প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো সময়মতো ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ফেলা হয়নি। স্থানীয় ঘেরমালিক রবিউল ইসলাম বলেন, বাঁধ সংস্কারের কাজে ব্যবহারের জন্য বিপুলসংখ্যক জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হলেও সেগুলো যথাসময়ে ভাঙন পয়েন্টে ব্যবহার করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, আগে থেকেই কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা নাজুক হতো না।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে বন্যতলা গ্রামসহ পদ্মপুকুর ও প্রতাপনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীর পানিতে প্লাবিত হতে পারে। এতে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও স্থানীয় জনজীবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।

পাউবো ও প্রশাসনকে অবহিত, চলছে জরুরি কাজ
ভাঙনের খবর পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামানন্দ কুন্ডু। তিনি বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ও শ্যামনগরের ইউএনওকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছাশ্রমে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন। সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহমান তাযকিয়া জানান, ভাঙনের খবর পাওয়ার পর রাতেই সেখানে লোক পাঠানো হয়। আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখা বালুভর্তি জিও ব্যাগ স্থানীয়দের সহায়তায় ভাঙন পয়েন্টে ফেলা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলের মধ্যে ভাঙন পয়েন্টে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ করা গেলে ভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

প্রক্রিয়াগত কারণে জিও ব্যাগ ফেলতে দেরি: পাউবো
নির্বাহী প্রকৌশলী আরও জানান, বন্যতলার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামতের জন্য আগেই ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছিল। ঠিকাদার জিও ব্যাগে বালু ভরে সেগুলো প্রস্তুতও রেখেছিলেন। তবে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ব্যাগ গণনা ও মার্কিং করার পর সেগুলো ভাঙন পয়েন্টে ফেলার কথা ছিল। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়ে জিও ব্যাগ ফেলার কাজে কিছুটা দেরি হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে বাঁধের ভাঙন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। দ্রুত ও কার্যকরভাবে ভাঙন প্রতিরোধ করা না গেলে উপকূলীয় জনপদের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা। তাই জরুরি মেরামতকাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

Link copied!