করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও নাগরিকদের দায়িত্বশীলতা

প্রকাশিতঃ 10:37 am | April 07, 2021

ড. প্রণব কুমার পান্ডে :

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো কোভিড-১৯ মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ বাংলাদেশে বেশ শক্তভাবে আঘাত হানতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে করোনার এটি দ্বিতীয় ঢেউ হলেও ইউরোপের দেশগুলো এই মহামারির তৃতীয় ঢেউ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। শীতকালে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও সংক্রমণের হার বেশ নিয়ন্ত্রণে ছিল বিধায় পরিস্থিতির সংকটময় হয়ে ওঠেনি। ফলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণের তীব্রতা বাংলাদেশে কয়েক মাস কম ছিল। আর সংক্রমণের তীব্রতা কম হওয়ার কারণে মানুষ করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকার নির্দেশনাগুলো মেনে চলার পরিবর্তে নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো চলাচল শুরু করে। আমরা প্রায়শই দেখেছি জনগণ কোনও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা না নিয়ে অবাধে ঘরের বাইরে ঘোরাফেরা করেছে। হাজার হাজার মানুষ কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেছে। তাদের এই ভ্রমণবিলাস দেখে মনে হয়েছে যে গত এক বছরে তারা বাসায় থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে উঠেছে। ফলে, সংক্রমণের হার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকায় তারা নিজেদের জীবন উপভোগ করাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

নিম্ন হারের সংক্রমণের তীব্রতার পাশাপাশি দেশে টিকাদান প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ফলে জনগণের মধ্যে এক ধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে সুরক্ষা সতর্কতা বিধি অনুসরণ করার ক্ষেত্রে। দেশের একশ্রেণির শিক্ষিত জনগণ, যারা করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা পাওয়ার প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করেছিলেন, তারাও টিকা নেওয়ার পরে সতর্কতা অনুসরণ করার ক্ষেত্রে অনীহা প্রদর্শন করছেন। আমাদের জনগণের একটি বিশাল অংশ এই বিষয়টি সম্পর্কে সম্যকভাবে অবগত নয় যে করোনা ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেওয়ার পরে সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার হার বেশি নয়। ফলে প্রথম ডোজ নেওয়ার পরেও অনেকেই সংক্রমিত হয়েছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন। এরপরেও গত দুই সপ্তাহ ধরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাত্রা এমন উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে যেটি সত্যিই আমাদের জন্য ভয়ের বিষয়। মানুষের সুরক্ষাবিধি মানার ক্ষেত্রে অনীহার সঙ্গে সঙ্গে করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইন আমাদের দেশে সংক্রমণের হারকে অবিশ্বাস্য তীব্রতায় বৃদ্ধি করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে যুক্তরাজ্য এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় আবিষ্কৃত করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইনগুলো ৭০ শতাংশ বেশি হারে সংক্রমিত করার ক্ষমতা রাখলেও এতে মৃত্যুর ঝুঁকি কম। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উৎস থেকে আমরা যে তথ্য জানতে পারছি তাতে দেখা গেছে, এই নতুন স্ট্রেইনগুলো শুধু সংক্রমণের হার দ্রুততার সাথে বৃদ্ধিই করছে না, বরং আক্রান্ত হওয়ার পর অতি অল্প সময়ের মধ্যে রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। এমতাবস্থায় দেশের জনগণ যদি তাদের আচরণ পরিবর্তন না করে তবে আমরা খুব খারাপ সময় দিকে ধাবিত হচ্ছি।

আমরা ইতোমধ্যে লক্ষ করেছি বাংলাদেশ সরকার করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ভাইরাসের ক্ষতিকারক সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন জনগণকে। নতুন রোগী ও মৃত্যুর হার বাড়ার সাথে সাথে সকলের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা দানা বেঁধেছে। গত কয়েক দিনে নতুন রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা অধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, এই মরণঘাতী ভাইরাসের দ্বিতীয় তরঙ্গ বাংলাদেশ কীভাবে মোকাবিলা করবে তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশ সরকার করোনাভাইরাসের প্রথম ঢেউ সফলতার সাথে পার করেছে। তবে এটা ঠিক যে মহামারির প্রাথমিক দিনগুলোতে স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খাতে দুর্নীতির অভিযোগের কারণে সরকার কিছুটা সমালোচিত হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে খুব দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। সরকার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছে সংক্রমিত ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা, প্রাদুর্ভাব হার নিয়ন্ত্রণ করা এবং এই ভাইরাসের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার। তবে এটিও ঠিক যে মহামারির প্রাথমিক দিনগুলোতে আমরা প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরীক্ষা করাতে সক্ষম হয়নি। কারণ, এই পরীক্ষার সুবিধাগুলো ছিল মূলত ঢাকা কেন্দ্রিক। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার কোভিড পরীক্ষার সুবিধা গোটা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছিল।

মহামারির প্রথম কয়েক মাস সরকার বিনামূল্যে এই পরীক্ষা সেবা প্রদান করেছে জনগণকে। তবে পরবর্তীতে পরীক্ষার একটি ফি নির্ধারণ করা হয়েছে যেটিও জনগণের নাগালের মধ্যে। তবে এ কথাও ঠিক, কোভিড পরীক্ষার সংখ্যা কম হওয়ার দায় শুধু সরকারের একার নয়। কারণ, মানুষের মধ্যেও পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে এক ধরনের অনাগ্রহ ছিল। সত্যি কথা বলতে জনগণের মধ্যে এক ধরনের কুসংস্কার দানা বেঁধেছে যে কেউ যদি করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হন তবে পরিবার এবং সমাজ থেকে তাকে আলাদা থাকতে হবে। ফলে, তারা এই পরীক্ষা করতে তেমন উৎসাহ প্রদর্শন করছে না।

বাস্তবতা হলো করোনাভাইরাসের প্রথম ঢেউয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিপর্যয় কম হওয়ার কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, জনাকীর্ণ স্থান এড়িয়ে চলা, ঘন ঘন হাত ধোয়াসহ অন্যান্য বিধি মানার ক্ষেত্রে জনগণ অনীহা প্রকাশ করা শুরু করেছে। এই জাতীয় মানসিক অবস্থা থেকেই তারা কোনোরকম সুরক্ষা ব্যবস্থা না নিয়ে ঘোরাফেরা শুরু করেছে। রাস্তায় জনগণের চলাচল পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হয়েছে যে খুব অল্প কিছু মানুষের মধ্যে এই মহামারির ভয়াবহতা সম্পর্কে উদ্বিগ্নতা রয়েছে। নাগরিকদের এ ধরনের আচরণ কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এর ফলে তারা শুধু নিজেদের পরিবারকেই বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে না, বরং এই ঘাতক ভাইরাসের সংক্রমণ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দিচ্ছে।

এমতাবস্থায়, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ থেকে দেশ ও জনগণকে রক্ষা করতে হলে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে বাড়ির বাইরে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করেছে। সরকারি অফিসে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এমনকি ১৮টি নির্দেশনা সংবলিত একটি গাইডলাইন প্রকাশ করা হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো এই সিদ্ধান্তগুলো নিলেই কি করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে? সম্ভবত এর উত্তর হচ্ছে না। কারণ, সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ওপরে নির্ভর করে সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য কতটা অর্জিত হবে। এরইমধ্যে ৫ এপ্রিল থেকে সারাদেশে লকডাউন চলছে।

আমরা ইতোমধ্যেই লক্ষ করেছি যে জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করার জন্য বিভিন্ন স্থানে মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এমনকি অনেককেই শাস্তি প্রদান করা হয়েছে এই আইন ভঙ্গ করার জন্য। তবে বাস্তবতা হলো এই কার্যক্রমগুলো মূলত শহরকেন্দ্রিক। গ্রামে এই ধরনের কার্যক্রমের তীব্রতা এখন পর্যন্ত সেরকমভাবে দেখা যাচ্ছে না। ফলে, গ্রামের জনগণের মধ্যে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কিত কোনও উদ্বেগ নেই।

ফলে এখন সময় এসেছে সকলে মিলে একসঙ্গে কাজ করার। আমাদের চিন্তা করতে হবে কীভাবে আমরা এই মহামারি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি। আমরা ভ্যাকসিন গ্রহণ করা শুরু করলেও বাস্তবতা হলো এই ভ্যাকসিন আমাদের শতভাগ সুরক্ষা প্রদান করবে না করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে। ফলে ভ্যাকসিন গ্রহণ করলেও আমাদের সংক্রমিত হওয়া থেকে রক্ষার পাবার জন্য সরকার নির্ধারিত সুরক্ষাবিধি পুরোপুরি মেনে চলতে হবে। এছাড়াও, দেশের সব জনগণের জন্য ভ্যাকসিনের নিশ্চয়তা প্রদান করা সময় সাপেক্ষ।

আমাদের সমাজে একদল মানুষ আছে, যারা সব সময় সরকারের দোষ খুঁজতে ব্যস্ত থাকে। এখনও তারা বলছেন যে এই মারাত্মক ভাইরাস মোকাবিলায় সব দায় সরকারের। এই গোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলতে চাই, সরকারের পাশাপাশি জনগণের দায়িত্ব রয়েছে যেকোনও ধরনের দুর্যোগের সময় সরকারকে সাহায্য করার। মহামারি চলাকালীন সময়ে সরকার দরিদ্র জনগণকে সাহায্য করতে পারে। এমনকি যাদের চাকরি নেই তাদেরও সাহায্য করতে পারে। সরকার মহামারির সময় অর্থনীতিকে চাঙা রাখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন শিল্পকে ভর্তুকি দিতে পারে, যেটি আমাদের সরকার করোনাভাইরাসের প্রথম ঢেউয়ের সময় অত্যন্ত সফলভাবে সাহায্য করেছে। এমনকি সরকার দেশের মানুষকে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারে, যেটিও বর্তমান সরকার শুরু করেছে। তবে সরকার সাহায্য প্রদান করলেই করোনা মহামারিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে জনগণকে সব সুরক্ষা ব্যবস্থা মেনে চলার মানসিকতা প্রদর্শন এবং তাদের চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। অন্যথায়, নাগরিকদের রক্ষা করার সরকারের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। বর্তমানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে এটি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারকে অবশ্যই বল প্রয়োগ করতে হবে।

আইন লঙ্ঘন করা আমাদের দেশের জনসংখ্যার এক বিশাল অংশের কাছে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। ফলে এখন পর্যন্ত এই মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বল প্রয়োগের মাধ্যমে হলেও সেগুলো বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। আর যদি না করা হয় তবে শতাব্দীর এই ভয়াবহতম সময়ে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করা খুব কঠিন হবে। আমরা যদি এই নির্দেশনাগুলো না মেনে চলি তাহলে আমাদের জন্য আরও খারাপ সময় অপেক্ষা করছে। সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পাশাপাশি সরকার এবং বিভিন্ন এনজিও ভাইরাসের ধ্বংসাত্মক প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। তবে, নাগরিকদেরও নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। সবাই একসঙ্গে কাজ করলেই শুধু আমরা এ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবো। আর এটি করতে ব্যর্থ হলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমরাও এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের আক্রমণের শিকার হয়ে খুব খারাপ সময় পার করবো।

লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email