নির্বাচনি ‘শিক্ষা বিনিময়’ চুক্তি!

প্রকাশিতঃ 10:43 am | November 21, 2020

প্রভাষ আমিন:

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাকে ধন্যবাদ। তিনি আমাদের গর্বিত করেছেন। অর্থে-বিত্তে, প্রভাবে-ক্ষমতায় বিশ্বসেরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি বাংলাদেশ থেকে ‘শিক্ষা-দীক্ষা’ নিতে বলেছেন। এই অফারেই যে গর্ব লুকিয়ে আছে, তা বিশ্ব দরবারে আমাদের মাথা উঁচু করবে নিঃসন্দেহে। গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নজিরবিহীনভাবে এবার ফলাফল পেতে চারদিন সময় লেগেছে।

যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিশ্বের সব দেশেরই কমবেশি স্বার্থ জড়িত; তাই গোটা বিশ্ব রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্টের নাম জানার জন্য। গোটা বিশ্বকে চারদিন টেনশনে রাখায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘ক্ষেপেছেন’ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ৯ দিন পর বাংলাদেশের দুটি উপনির্বাচন হয়েছে, একটি ঢাকায়, অপরটি সিরাজগঞ্জে। ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে ভোট দিতে গিয়েই সিইসি তার মনের ক্ষোভ ঝেরেছেন। বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ৪/৫ দিনেও ভোট গণনা শেষ করতে পারে না। আর আমরা ইভিএমে ৪/৫ মিনিট থেকে ১০ মিনিটে ফল ঘোষণা করে দিতে পারি। এই জিনিস যুক্তরাষ্ট্রে নেই। তাদের প্রায় ২৫০ বছরের গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতায় সেটা এখনও পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের আমাদের থেকে শিক্ষা-দীক্ষা নেওয়া উচিত।’

নুরুল হুদাকে ‘বেহুদাই’ আমরা ‘বেহুদা’ বলে টিজ করি। তার মতো বুকের পাটা আর দেশপ্রেম কয়জনের আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যদি তার মতো একজন দক্ষ ও ত্বরিৎকর্মা সিইসি থাকতেন তাহলে গোটা বিশ্বকে এমন দম বন্ধ করে বসে থাকতে হতো না। হাস্যকর হলো ২৫০ বছরের গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত একটা কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনই গড়তে পারেনি, তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার পাবে কোথায়? এখন যে দেশে নির্বাচন কমিশন নেই, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নেই; সে দেশের নির্বাচনের ফল ঝুলে থাকবে না তো বাংলাদেশেরটা থাকবে! বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সুপারসনিক গতি। আমাদের সব ‘ধর তক্তা, মার পেরেক’ স্টাইল। ৪/৫ মিনিটের মধ্যে তো ফলাফল দিতে পারেই তারা, কখনও কখনও আমরা আগেই বলে দিতে পারি, কোন মার্কা জয়যুক্ত হবে।

আমেরিকা এখনও ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ লেবেলে আছে। বাংলাদেশ অনেক আগেই নির্বাচনি ব্যবস্থার ‘ইউনিভার্সিটি’ পর্যায় অতিক্রম করে ফেলেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা এখন উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশে এখন আর নির্বাচন উৎসব নয়, টেনশন নয়। কোনও মারামারি নেই, হোন্ডা-গুন্ডা-ডান্ডা নেই। এখন পরিস্থিতি শান্ত, সব পূর্ব নির্ধারিত, এমনকি ভোটারদেরও কষ্ট করে কেন্দ্রে যেতে হয় না। এমন নির্বাচনি ব্যবস্থা ‘কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি, সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি’।

এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের নানারকম চুক্তি হয়, সমঝোতা স্মারক সই হয়। আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যদি হোয়াইট হাউসকে ট্রাম্পমুক্ত করে দায়িত্ব বুঝে নিতে পারেন, আমার দাবি থাকবে, প্রথমেই যেন তিনি নুরুল হুদার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রাথমিকভাবে যেন অন্তত একটা নির্বাচনি ‘শিক্ষা বিনিময়’ সমঝোতা স্মারক সই করেন। পরে সেটাকে আস্তে আস্তে চুক্তিতে বদলে দিতে পারেন। এখন থেকে ‘শিক্ষা-দীক্ষা’ নেওয়া শুরু করলে চার বছর পরের নির্বাচন নিয়ে এত ঝামেলা পোহাতে হবে না। গোটা বিশ্বকে চার রাত জেগে থাকতে হবে না। তাই এই সমঝোতা স্মারকটি তাই শুধু দ্বিপাক্ষিক স্বার্থে নয়, আন্তর্জাতিক স্বার্থেই দ্রুত করা দরকার।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নির্বাচনি শিক্ষা বিনিময় বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা সমঝোতা নেই। তবে আমার ধারণা বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও বাংলাদেশের কারও কাছ থেকে নির্বাচনি শিক্ষা-দীক্ষা বা পরামর্শ নিয়েছেন। এবার আমেরিকার নির্বাচনই হয়েছে বাংলাদেশ স্টাইলে। নির্বাচনের আগে থেকেই সহিংসতার আশঙ্কা ছিল আমেরিকার জন্য নজিরবিহীন। তবে ট্রাম্প বোধহয় পুরনো কারও কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছেন।

কারণ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা এখন অর্ধযুগের অতীত স্মৃতি। তবে আগে থেকেই কারচুপির আশঙ্কা করা, নির্বাচিত না হলে ফলাফল মেনে নেওয়ার ঘোষণা, ভোট গণনা বন্ধ রাখার দাবি, ফলাফল বাতিলের দাবিতে আদালতে যাওয়া—একদম বাংলাদেশি ‘ফরমুলা’। এমনকি নির্বাচনের কয়েকদিন আগে একজন বিচারপতি নিয়োগ করে আদালতকেও পকেটে রাখার চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। কিন্তু বিপদের সময় কাউকেই পাশে পাননি বেচারা। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরেকটু চেষ্টা করলে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রেখে ফলাফল নিজের পক্ষে আনার চেষ্টা করতে পারতেন। কিন্তু চার বছর ধরে মিডিয়ার সঙ্গে লড়াই করে আসা ট্রাম্প সময়মতো ধরা খেয়েছেন। মিডিয়াও সুযোগ বুঝে ‘ল্যাং’ মেরে দিয়েছে। এমনকি ফলাফল ঘোষণার আগেই মিডিয়া মিথ্যা বলার অজুহাতে ট্রাম্পের বক্তব্যের সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিল। এই ঔদ্ধত্য মানা যায়! খালি মিডিয়াকে শায়েস্তা করার জন্য হলেও ট্রাম্পের আরেকবার নির্বাচিত হওয়া উচিত ছিল।

বাংলাদেশের কারও পরামর্শ নিলেও ট্রাম্প তা পুরোপুরি অনুসরণ করেননি। তাই ধরা খেয়েছেন। আসলে ৭ কোটি ভোট পেয়েও প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না, এটা বোধহয় ট্রাম্প দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি।

নিশ্চিত জেনেও ট্রাম্প এখনও পরাজয় মানতে রাজি নন। তিনি হোয়াইট হাউসের দখল ধরে রাখতে নানান কৌশল খুঁজছেন। তবে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে আমি ‘মুফতে’ হোয়াইট হাউস দখলমুক্ত করার একটা ‘বিফলে মূল্যফেরত’ পরামর্শ দিতে পারি। আপনি হোয়াইট হাউসের গেটে দুটি বালিভর্তি ট্রাক রেখে দিন, যার ড্রাইভার নিখোঁজ থাকবে। তারপর আস্তে আস্তে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিন। তাতেও কাজ না হলে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিন। টুইট করতে না পারলে ট্রাম্প পাগলের মতো দেয়াল টপকে হলেও হোয়াইট হাউস ছেড়ে পালাবেন।

তারপর চার বছরের জন্য হোয়াইট হাউস বাইডেনের। আর যদি কে এম নুরুল হুদার কাছ থেকে শিক্ষা-দীক্ষা নেন এবং ঈশ্বর যদি হায়াত দারাজ করেন, তাহলে জো বাইডেনের আরও চার বছর এক্সটেনশন পাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Print Friendly, PDF & Email