মাদক-জুয়ার টাকার জন্য অটোরিকশা ছিনতাই, চালককে গলা কেটে হত্যা

প্রকাশিতঃ 5:05 pm | July 03, 2024

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

বন্ধুরা মিলে মাদক ও অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে যায়। এই মাদক ও জুয়ার টাকা জোগাড় করতে প্রথমে ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে।

এরপর সহজ সরল ও একজনকে টার্গেট করে তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বন্ধুরা মিলে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে ডেকে নেয় তাদের পরিচিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক রবিউল ইসলামকে।

এরপর নরসিংদীর শিবপুর থানা এলাকার বিভিন্ন স্থান ঘুরিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে যায় অটোরিকশাচালক রবিউলকে। সেখানে নির্মমভাবে ধারলো অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করে মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়।

এরপর রবিউলের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা।

এ হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

পলাতক রয়েছে আরও একজন। গ্রেপ্তাররা হলেন- মো. নাহিদ শেখ (২২), মো. হুমায়ুন (৪০), মো. লিটন খান (৪৫), জুবায়ের হাসান অমি (১৯), শাজিদুল ইসলাম হাসিব (১৯), রাকিবুল (২০) ও জুয়েল (২০)। এদের মধ্যে নাহিদ, হুমায়ুন, লিটন, জুবায়ের ও হাসিব আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

বুধবার (৩ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডির পিবিআই হেডকোয়ার্টার্সে আয়োজিত ক্লুলেস হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন নরসিংদী জেলার পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।

ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরে মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, গত বছরের ২৯ অক্টোবর সকালে জানা যায় যে, নরসিংদী জেলার শিবপুর থানা এলাকার সাতপাইকা পাঁকা রাস্তার পাশে ধানক্ষেতে একটি অজ্ঞাতনামা কিশোরের গলা কাটা মরদেহ পড়ে আছে। খবর পেয়ে নরসিংদী জেলার পিবিআই ও ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সরেজমিনে ছায়া তদন্ত শুরু করে। এরপর তথ্যপ্রযুক্তি ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ভুক্তভোগীর পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। পরে ভুক্তভোগী রবিউল ইসলামের মা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। গুরুত্ব বিবেচনায় মামলাটি নরসিংদীর পিবিআই গ্রহণ করে।

তিনি বলেন, তদন্তকালে ঘটনার সম্ভাব্য কারণ, ঘটনার প্রকৃতি এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সম্ভাব্য আসামিদের শনাক্ত করার বিষয়ে নানান তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। পরে জানা যায়, ভুক্তভোগী একজন অটোরিকশা চালক। আসামিরা ভুক্তভোগী রবিউল ইসলামকে হত্যা করে তার ভাড়া করা অটোরিকশাটি নিয়ে যায়। ভুক্তভোগী কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করতো না। ঘটনাস্থল থেকে সম্ভাব্য যেসব দিকে ছিনতাইকৃত অটোরিকশাটি নিয়ে যেতে পারে, তা অনুমান করে সম্ভাব্য ও সন্দেহজনক কিছু অটো গ্যারেজের প্রতি নজরদারি বাড়ানো হয়। ঘটনার কোনো ক্লু না থাকায় শিবপুর অঞ্চলে যাদের চোরাই অটো বাইক/গাড়ি কেনাবেচার দুর্নাম রয়েছে তাদের যাচাই করার এক পর্যায়ে সন্দেহভাজন আসামি রাকিবুলকে গ্রেপ্তার করি। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে আসামি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অটোরিকশাটি নাহিদের মাধ্যমে বিক্রিতে সহায়তা করেছেন বলে জানান। কিন্তু হত্যার বিষয়ে কোনো কথা স্বীকার করেননি।

তার দেওয়া তথ্যমতে আসামি মো. নাহিদ শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। আসামি নাহিদ অটোরিকশাটি বিক্রির কথা স্বীকার করেন এবং যে গ্যারেজে বেচাকেনা হয়েছিল তা দূর থেকে শনাক্ত করেন। এছাড়া সোর্স শিবপুর কলেজ গেইট এলাকায় এ ধরনের একটি অটোগাড়ি দেখেছে বলে জানালে পিবিআই তাৎক্ষণিকভাবে ওইসব এলাকায় একাধিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে আসামি মো. হুমায়ুনকে গ্রেপ্তার করে। তার দেওয়া তথ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের পরে ছিনতাই করা অটোরিকশাটি গ্যারেজ মালিক আসামি মো. লিটন খাঁনের গ্যারেজ হতে উদ্ধার করা হয়।

এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, গ্যারেজ মালিক আসামি মো. লিটন খাঁন অটোরিকশাটি ৩০ হাজার টাকায় কেনার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, গাড়িটি যাতে কেউ চিনতে না পারে তাই গাড়ির রং ও কিছু পার্টস পরিবর্তন করেন তিনি। পরে আসামি নাহিদকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এসময় যারা নাহিদের কাছে ছিনতাই করা অটোরিকশাটি নিয়ে এছিলেন তাদের নাম জানা যায়। হত্যার সঙ্গে জড়িত আসামিরা ঘটনার পরে গা ঢাকা দেন। মামলার ঘটনার তদন্তে তদন্তকারী একাধিক চৌকস টিম নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ভৈরব, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযানে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এলাকা হতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

তিনি বলেন, হত্যাকারী দুজনসহ গাড়ি ক্রয়-বিক্রয়, রং ও মডেল পরিবর্তন ও সংরক্ষণের সংশ্লিষ্ট মোট পাঁচ আসামি নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তাদের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের শিকার রবিউল ও অটোরিকশা ছিনতাইয়ে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত আসামি অমি, নিহাল, হাসিব একইসঙ্গে চলাফেরা করতেন। তারা নিয়মিত মাদক সেবন ও অনলাইনে জুয়া খেলতেন। এক পর্যায়ে আসামিরা মাদক ও জুয়ার টাকা সংগ্রহের জন্য অটো ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে। তারা সহজ-সরল অটোরিকশাচালক রবিউল ইসলামকে চিনতেন। তাই তারা রবিউলকে হত্যা করে অটোরিকশাটি ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন।

ঘটনার দিন দুপুর অনুমানিক ২টার দিকে আসামি অমি, নিহাল, হাসিব শিবপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে ভুক্তভোগী রবিউল ইসলামকে পান। তারা তাকে অটোরিকশা নিয়ে বিকেল ৪টার দিকে আসামি হাসিবের বাড়ির সামনে থাকতে বলেন। আসামি অমি ও নিহাল বিকেল ৪টার আগেই হাসিবের বাড়ির সামনে উপস্থিত হন। ভুক্তভোগী রবিউল বিকেল ৪টার দিকে হাসিবের বাড়ির সামনে গেলে অমি, নিহাল, হাসিব তার অটোরিকশা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করেন। বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা দেন। এক পর্যায়ে শিবপুর থানার সাতপাইকস্থ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অনুমানিক ১০ থেকে ১৫ মিনিট আড্ডা দেন। আড্ডা শেষে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা বলে আসামিদের দুইজন পেছনে এবং একজন সামনের আসনে চালক রবিউলের পাশে বসেন। পরে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গোপনে নিয়ে আসা চাপাতি বের করেন এবং আসামি হাসিব ও নেহাল ভুক্তভোগী রবিউলের হাত-পা জাপটে ধরে রাখেন। এ সময় আসামি অমি চাপাতি দিয়ে বেপরোয়াভাবে তার গলায় কোপান। ঘটনাস্থলেই রবিউল মৃত্যুবরণ করেন। তখন আসামিরা ভুক্তভোগীর মরদেহ ধাক্কা দিয়ে রাস্তার পাশে থাকা ধানক্ষেতে ফেলে দিয়ে অটোরিকশা নিয়ে চলে যান।

পরে রাকিব, নাহিদ, জুয়েল ও হুমায়ুন অটোরিকশাটির রং ও মডেল পরিবর্তন বিক্রয় ও হস্তান্তর করেন এবং আসামি লিটন মিয়া ৩০ হাজার টাকায় গাড়িটি ক্রয় করেন।

মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, আসামি অমির স্বীকারোক্তি মতে নাহিদের চাচাতো ভাই বিশালের বাড়ি থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতিটি উদ্ধার করা হয়। পলাতক আসামি নেহালকে ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে।

ভয়ংকর নেশা থেকে জুয়া, ছিনতাই ও হত্যা প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি পরামর্শ তুলে ধরেন পিবিআইয়ের এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অটোরিকশা ছিনতাই করে চালককে হত্যা করার প্রবণতা বেড়েছে। এই ছিনতাই ও হত্যা প্রতিরোধে প্রতিটি অটোরিকশার তিনদিকে গ্রিলের গেট রাখতে হবে। চালকের পাশে কোনো ধরনের যাত্রী তোলা যাবে না। প্রয়োজনে গাড়িতে জিপিএস ট্র্যাকার লাগাতে হবে এবং এই সমস্ত গাড়িগুলো রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনতে হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/কেএ 

Print Friendly, PDF & Email