নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার দুটি ইউনিয়নের মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত দুর্ভোগ কমাতে দুটি খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে কাঠের সেতু। তমরদ্দি ইউনিয়নের কাটাখালি ও চরকিং ইউনিয়নের আজমা খালের ওপর এসব সেতু নির্মাণ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এতদিন ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের সাঁকো দিয়ে পারাপার হতে হতো স্থানীয় বাসিন্দাদের। নতুন সেতু নির্মাণে স্বস্তি ফিরেছে দুই এলাকার মানুষের মধ্যে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও খাল দুটির ওপর ছিল না কোনো স্থায়ী সেতু। ফলে কয়েকটি গ্রামের মানুষকে প্রতিদিন নানা ভোগান্তি নিয়ে চলাচল করতে হতো। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী ও দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হতো চরম দুর্ভোগ। অনেক সময় সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোই ছিল হাজারো মানুষের ভরসা
তমরদ্দি ইউনিয়নের কাটাখালি খালটি তমরদ্দি বাজারের দক্ষিণে কোস্ট গার্ড স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। খালের দক্ষিণ পাশে রয়েছে কোরালিয়া, পশ্চিম জোড়খালী ও মাইজচরা গ্রাম। এসব গ্রামে প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের বসবাস। বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের জন্য তাঁদের প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ একটি ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পার হতে হতো।
কোরালিয়া গ্রামের বাসিন্দা নুরউদ্দিন শেরআলী (৬০) খালের পাড়ে দোকান করেন। তিনি জানান, দোকানের মালামাল তমরদ্দি বাজার থেকে আনতে হয়। ভ্যানচালকেরা মালামাল খালের ওপারে রেখে যান। এরপর মাথায় করে সাঁকো পার হয়ে সেগুলো দোকানে নিতে হয়।
তিনি বলেন, গত বছর মালামাল নিয়ে পার হওয়ার সময় নুর ইসলাম নামের এক ভ্যানচালক চিনির বস্তাসহ সাঁকো ভেঙে খালে পড়ে যান। এতে তাঁর এক হাত ও এক পা ভেঙে যায়। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিয়েও তিনি সুস্থ হতে পারেননি। বর্তমানে পঙ্গু অবস্থায় বাড়িতে রয়েছেন।
শেরআলী আরও জানান, ২০২৫ সালের শেষ দিকে তমরদ্দি হাইস্কুলের এক ছাত্রী সাঁকো থেকে খালে পড়ে ভেসে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। তাঁর অভিযোগ, বালু-পাথর ব্যবসায়ীদের বাধার কারণে দীর্ঘদিনেও খালটির ওপর সেতু নির্মাণ সম্ভব হয়নি। স্থানীয় আরও কয়েকজন একই ধরনের অভিযোগ করলেও নাম প্রকাশ করতে চাননি।
আজমা খালেও ছিল একই দুর্ভোগ
চরকিং ইউনিয়নের আজমা খালের উত্তর পাশে চর বগুলা এবং দক্ষিণ পাশে পশ্চিম ক্ষিরোদিয়া এলাকা। দুই এলাকার অসংখ্য মানুষ দীর্ঘদিন ধরে খালের ওপর থাকা সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করতেন। ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পার হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হতে হতো তাঁদের।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম দুলাল বলেন, ‘স্বাধীনতার এত বছর পর এই কাঠের ব্রিজগুলো যেন হাতিয়ার জনপ্রতিনিধিদের অক্ষমতার প্রতীক হয়ে রইল। তাঁদের যদি সদিচ্ছা থাকত, তবে কোনো এলাকা অন্ধকারে থাকত না।’
প্রায় ১৪ লাখ টাকায় নির্মিত দুটি সেতু
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, তমরদ্দি ইউনিয়নের কাটাখালি খালের ওপর ১৬০ ফুট দীর্ঘ ও ৫ ফুট প্রস্থের কাঠের সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে, চরকিং ইউনিয়নের আজমা খালের ওপর ২০০ ফুট দীর্ঘ ও ৫ ফুট প্রস্থের সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকা। দুটি সেতুর নির্মাণব্যয় ভ্যাট ও আয়কর ছাড়া হিসাব করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা তহবিল থেকে এ অর্থের জোগান দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে উপজেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে এ উদ্যোগের প্রশংসা করছেন।
স্থায়ী সেতুর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, শুধু যোগাযোগব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা উদ্যোগ নিলে মানুষের ছোট ছোট সমস্যাও সহজে সমাধান করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘এই দুটি সাঁকোকে ব্রিজে রূপান্তর করে এখানকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।’এ ছাড়া খাল দুটির ওপর ভবিষ্যতে ইট-পাথরের স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি
