Kaler Alo
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬
২৩ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ৮, ২০২৬, ১১:৩১ এএম

মস্তিষ্কে স্ট্রোক, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে মৃত্যুর লড়াই

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ৮, ২০২৬, ১১:৩১ এএম

মস্তিষ্কে স্ট্রোক, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে মৃত্যুর লড়াই

মস্তিষ্কে স্ট্রোক হয়েছে। এক পাশ অবশ হয়ে আসছে, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, মুখ বেঁকে যাচ্ছে। অথচ হাসপাতালে নেওয়ার বদলে কেউ অপেক্ষা করছেন, কেউ ছুটছেন কবিরাজের কাছে, কেউ আবার এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরছেন। এভাবেই কেটে যাচ্ছে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাড়ে চার ঘণ্টা। যখন রোগী পৌঁছাচ্ছেন উপযুক্ত হাসপাতালে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই আর দেওয়া যাচ্ছে না রক্তের জমাট গলানোর জীবনরক্ষাকারী ওষুধ।

রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের চিত্রটি উদ্বেগজনক। প্রতিদিন সেখানে স্ট্রোকের রোগী আসেন অন্তত ২ হাজার ১০০ জন। মাসে সংখ্যাটি প্রায় ৬৫ হাজার। অথচ তাঁদের মধ্যে থ্রম্বোলাইসিস চিকিৎসা পান মাত্র ছয় থেকে আটজন। অর্থাৎ প্রতি মাসে হাজার হাজার রোগীর ভিড়ে এই চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন হাতে গোনা কয়েকজন। ২০২৫ সালে পুরো বছরে এ সেবা পেয়েছেন মাত্র ৭৯ জন।

  • প্রথম সাড়ে চার ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ, অথচ ৮৭.৭২ শতাংশ রোগী হাসপাতালে আসেন দেরিতে
  • হাতছাড়া হচ্ছে জীবন বাঁচানোর চিকিৎসা 
  • ১০ হাজারে একজনও পাচ্ছেন না থ্রম্বোলাইসিস

স্ট্রোকের চিকিৎসায় প্রথম সাড়ে চার ঘণ্টাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’। এই সময়ের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে নির্দিষ্ট ধরনের স্ট্রোকের রোগীকে থ্রম্বোলাইসিস দেওয়া সম্ভব। শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা এই ওষুধ মস্তিষ্কের রক্তনালিতে জমাট বাঁধা রক্ত গলিয়ে রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। সময় পেরিয়ে গেলে এই চিকিৎসার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে আর থাকে না।

বাংলাদেশে স্ট্রোকের রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরির ভয়াবহতা উঠে এসেছে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায়। দেশের পাঁচটি তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে ৪৪৮ জন রোগীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ৮৭ দশমিক ৭২ শতাংশ রোগী স্ট্রোকের লক্ষণ শুরুর সাড়ে চার ঘণ্টা পর হাসপাতালে পৌঁছান। হাসপাতালে পৌঁছাতে মধ্যম সময় লাগে ১৪ ঘণ্টা। অর্থাৎ চিকিৎসার সবচেয়ে কার্যকর সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরই অধিকাংশ রোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের স্ট্রোক ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর হোসেন বলেন, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর এক মুহূর্তও নষ্ট করা উচিত নয়। কুসংস্কার, টোটকা চিকিৎসা কিংবা অপেক্ষার কারণে রোগীর চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সময় শেষ হয়ে যেতে পারে।

দেরিতে হাসপাতালে, বাড়ছে পঙ্গুত্ব
স্ট্রোক দুই ধরনের—ইসকেমিক ও হেমোরেজিক। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ ইসকেমিক স্ট্রোক। এ ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে থ্রম্বোলাইসিস দিয়ে সেই জমাট রক্ত গলানোর সুযোগ থাকে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরাই নির্ধারণ করেন রোগী এই চিকিৎসার উপযুক্ত কি না।

নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের মেরুন ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, স্ট্রোক দেশে দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্বের অন্যতম প্রধান কারণ এবং মৃত্যুরও অন্যতম কারণ। অথচ সচেতনতার অভাবে রোগীরা থ্রম্বোলাইসিসের সুযোগ হারাচ্ছেন। লক্ষণ শনাক্ত করতে না পারাই এ ক্ষেত্রে বড় বাধা।

হাসপাতালটির ১০০ শয্যার স্ট্রোক ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক সুবীর চন্দ্র দাস বলেন, রোগীরা দেরিতে আসায় স্থায়ী পঙ্গুত্বের হার বাড়ছে। দীর্ঘদিন রোগীর সেবা করতে গিয়ে পরিবারের সদস্যরাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক পরিবারকে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়। এর প্রভাব পড়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও।

হাসপাতাল বদলাতেই শেষ হচ্ছে সময়
স্ট্রোকের চিকিৎসায় দেরির আরেকটি বড় কারণ এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রোগী পাঠানো। গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরে মধ্যম বিলম্ব ১৯ দশমিক ৭৫ ঘণ্টা। বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে এই বিলম্ব ১৫ ঘণ্টা।

সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর হোসেনের মতে, রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘোরানোর পরিবর্তে কোথায় জরুরি সিটি স্ক্যান ও প্রয়োজনীয় স্ট্রোক চিকিৎসা পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এতে রোগী দ্রুত সঠিক চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবেন।

বর্তমানে দেশে থ্রম্বোলাইসিসের সুবিধা সীমিত কয়েকটি হাসপাতালে রয়েছে। রাজধানীতে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এ চিকিৎসা পাওয়া যায়। ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এ সুবিধা রয়েছে।

অধ্যাপক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সিটি স্ক্যানের ব্যবস্থা থাকলে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও থ্রম্বোলাইসিস দেওয়া সম্ভব। নিউরোলজিস্টের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত মেডিসিন বিশেষজ্ঞরাও এ চিকিৎসা দিতে পারবেন। বর্তমানে থ্রম্বোলাইসিসে খরচ হয় ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা। ভবিষ্যতে এই ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

লক্ষণ চিনুন, সময় নষ্ট করবেন না
স্ট্রোকের লক্ষণ শনাক্তে চিকিৎসকেরা ‘বি ফাস্ট’ পদ্ধতি মনে রাখার পরামর্শ দেন। হঠাৎ ভারসাম্য হারানো (ব্যালান্স), দৃষ্টিশক্তির সমস্যা (আইজ), মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া (ফেস), হাত বা পা দুর্বল হয়ে পড়া (আর্ম), কথা জড়িয়ে যাওয়া (স্পিচ)—এসব লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে নিতে হবে (টাইম)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে স্ট্রোকে মারা গেছেন ৬৭ দশমিক ৪ জন। নারীদের মধ্যে স্ট্রোকে মৃত্যুহার পুরুষদের চেয়ে বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোকের পর যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি তত কমানোর সুযোগ থাকে। রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনাও বাড়ে। অথচ সচেতনতার অভাব ও চিকিৎসাব্যবস্থার সমন্বয়হীনতায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে প্রতিদিন। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে তাই শুধু হাসপাতাল থাকা যথেষ্ট নয়, রোগীকে সঠিক সময়ে সেখানে পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কালের আলো/জেএন/এমকে

Link copied!