বিশৃঙ্খল সড়কে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

প্রকাশিতঃ 10:15 am | January 08, 2023

প্রভাষ আমিন :

বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান আরাফাত ইসলামের বয়স মাত্র পাঁচ বছর। বাড়ি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার চর বাউসিয়া বড়কান্দি গ্রামে। এবারই স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে আরাফাতকে। তবে আর দশটা শিশুর মতো সুস্থ নয় আরাফাত। বছর দুয়েক আগে আরাফাতের থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে। তারপর থেকে প্রতিমাসে তাকে রক্ত দিতে শান্তিনগরের থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনে আসতে হয়। সোমবার মা আইরিন আক্তার আরাফাতকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। তারা যাত্রাবাড়ির কাজলা এলাকায় নামেন। সেখানে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মায়ের সামনেই একটি মিনিবাস আরাফাতকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত আরাফাতকে থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের বদলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই ডাক্তারদের সকল চেষ্টা, মা-বাবার সকল প্রার্থনা, প্রতিমাসে রক্তের চাহিদার ঊর্ধ্বে উঠে যায় আরাফাত। চলে যায় একেবারে। যে সন্তানকে নিয়ে প্রতিমাসে ঢাকা আসতেন আইরিন, চোখের সামনে সেই সন্তানের মৃত্যু দেখার বিভীষিকা নিয়ে তাকে বাকি জীবন কাটাতে হবে। ফিটনেবিহীন সেই মিনিবাস এবং চালককে আটক করেছে পুলিশ। কিন্তু তাতে কি ফিরে আসবে আরাফাত? শিশু আরাফাতের খুনি চালকের কি বিচার হবে? বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমরা জানি, এই চালকের কিছুই হবে না।

শুধু আরাফাত নয়, বাংলাদেশের রাজপথে প্রতিদিন এমন অসংখ্য ট্যাজেডি রচিত হয়। কোনও কোনও ঘটনা আমাদের অভ্যস্ত জীবনে একটু আলোড়ন তোলে। তারপর আমরা ভুলে যাই। কিন্তু যার বা যাদের সন্তান বা স্বজন আহত বা নিহত হয়, তাদের সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয় সেই বেদনার পাষাণভার। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কথা কিন্তু কম হয়নি। ১৯৯৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে হারানোর পর থেকে জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। তার এই আন্দোলনে সমর্থন মিলেছে অনেক, কথা হয়েছে অনেক। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

যেদিন আরাফাতের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে রাজপথ সেদিনই যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে প্রণীত এ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিদায়ী বছরে সড়ক, রেল ও নৌপথে সাত হাজার ৬১৭টি দুর্ঘটনায় ১০ হাজার ৮৫৮ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৮৭৫ জন। এই সংখ্যা আগের আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইলিয়াস কাঞ্চনদের আন্দোলনে কোনও কাজ হয়নি, সেটা বলবো না। বিরতিহীন আন্দোলন না থাকলে হয়তো মৃত্যুর মিছিল আরও লম্বা হতো। আন্দোলন শুধু ইলিয়াস কাঞ্চন একা করছেন না। বিভিন্ন সময়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন হয়েছে।

২০১১ সালে তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীরের মতো দুই প্রতিভাকে হারিয়ে থমকে গিয়েছিল গোটা বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়ার মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা নজিরবিহীন আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। নটরডেম কলেজের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর গতবছরও শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছিল রাজপথে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। শিক্ষার্থীদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নানা কথা হয়েছে। ২০১৮ সালে একটি আইনও হয়েছে। কিন্তু সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামেনি। পরিবহন মাফিয়ারা দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া মানুষের চেয়ে শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিতে গেলেই তারা ধর্মঘট ডেকে গোটা দেশ অচল করে দেয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সরকার ২০১৮ সালে সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করেছিল। কিন্তু বিধিমালা না থাকায় তা কার্যকর যায়নি। চার বছর পর দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ পাঁচ লাখ টাকা করে একটি বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু যার যায় সে বোঝে। পাঁচ লাখ টাকা কখনও একটি জীবনের দাম হতে পারে না। তারচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই পাঁচ লাখ টাকা পাওয়া নিহতের পরিবারের জন্য লটারির পাওয়ার মতো ব্যাপার হবে। সড়ক দুর্ঘটনার অধিকাংশ মামলায় শেষ পর্যন্ত পরিণতি পায় না।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে একটি জনপ্রিয় স্লোগান আছে- একটি দুর্ঘটনা সারাজীবনের কান্না। ২০২২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় যে ১০ হাজার ৮৫৮ জন মারা গেছেন, আমরা সবাই তাদের কথা ভুলে গেছি। তারা আমাদের কাছে এখন সংখ্যামাত্র। কিন্তু সেই ১০ হাজার ৮৫৮টি পরিবারের কান্না কিন্তু কখনও থামবে না। আর যে ১২ হাজার ৮৭৫ জন আহত হয়ে বেঁচে আছেন, তাদের জীবন আরও দুর্বিসহ। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি যখন পরিবারের বোঝা হয়ে যায়, সে বেদনা আরও দুর্বহ। করোনা থেকে বাঁচতে আমরা হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলে মাসের পর মাস লকডাউন করেছি। সেই করোনায় চার বছরে বাংলাদেশে মারা গেছে, ২৯ হাজার ৪৪০ জন। আর দুর্ঘটনায় একবছরেই মারা গেছেন ১০ হাজার ৮৫৮ জন। অথচ দুর্ঘটনা নিয়ে আমাদের তেমন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু আমরা চাইলেই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য না হলেও অনেক কমিয়ে আনতে পারি। আর এর জন্য হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগেরও দরকার নেই। চাই একটু সচেতনতা আর প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগ।

দুর্ঘটনা কেন হয়, সেটা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। চালক সর্বোচ্চ সতর্ক থাকলেও সড়কে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে চালকের খামেখেয়ালি, অদক্ষতা, বেপরোয়া গতি এবং আইন না মানার প্রবণতা থেকে। কোনও সেনানিবাসে কখনও কোনও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেনি। কারণ সেখানে সবাই আইন মেনে চলে। কিন্তু সেনানিবাস থেকে বেরুলেই আমরা সবাই রাস্তার রাজা। আইন মানার আর কোনও দরকার নেই যেন। চালকরা জানেন, কোনোরকমে ঘটনাস্থল থেকে বেরুতে পারলে আর তাদের ভয় নেই। মালিক এসে তাদের ছাড়িয়ে নেবে।

প্রাথমিক দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা থেকেই অনেকসময় প্রাণহানী ঘটে। কদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষকের গাড়িতে আটকে যান মোটরসাইকেল আরোহী এক নারী। তাৎক্ষণিকভাবে সেই শিক্ষক গাড়িটি থামালে সেই নারী প্রাণে বেঁচে যেতেন। কিন্তু গণপিটুনির ভয়ে সেই শিক্ষক সেই নারীকে নিয়েই এক কিলোমিটারের বেশি পথ গাড়িটি চালিয়ে নেন। তাতে নিশ্চিত হয় সেই নারীর মৃত্যু। গণপিটুনির বদলে আমরা যদি আহত মানুষটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করি, তাতে অনেক প্রাণ বাঁচতে পারে। কিন্তু পালিয়ে গেলে আর বিচার হবে না, এই ধারণা থেকে সবাই গণপিটুনিকেই বেছে নেন সহজ বিচার হিসাবে।

২০২২ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দুর্ঘটনায় সবাইকে ছাড়িয়ে উঠে এসেছে মোটরসাইকেল। গত বছরের দুর্ঘটনার ২৮ শতাংশই ঘটেছে মোটরসাইকেলে। এই বাহনটি এখন পরিণত হয়েছে আতঙ্কে। ঢাকার ফুটপাতগুলো যেন বানানোই হয়েছে মোটরসাইকেলের জন্য। তারা কিছুই মানতে চান না। বিআরটিএর হিসাবে, ২০১০ সালে দেশি নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল সাড়ে সাত লাখের মতো। বর্তমানে এ সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। আর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেশিরভাগ মারা যান তরুণ, শিক্ষার্থী বা কর্মক্ষম ব্যক্তি। সব মিলিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের অর্থনীতিকেও শ্লথ করে দিচ্ছে। একজন কর্মক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু বা পঙ্গু হয়ে যাওয়া একটু পরিবারকেও পঙ্গু করে দেয়।

দুর্ঘটনার মূল কারণ আইন না মানার প্রবণতা, আইনকে তোয়াক্কা না করা এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা। আমি নিজে ২০ বছর ধরে গাড়ি চালাই। এখনও বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে এই সময়ে অন্তত ১০টি দুর্ঘটনা ঘটলে আমি নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকতাম- আমার দোষে দুর্ঘটনাটি ঘটেনি। বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোতে বিভিন্ন গতির যানবাহন চলা, উল্টো দিক থেকে যানবাহন আসা যেন বৈধ। এমনকি পদ্মা সেতু এক্সপ্রেসওয়েতেও মানুষকে দৌড়ে রাস্তা পেরোনোর চেষ্টা করতে দেখেছি।

আমরা নিজেরা যতদিন আমাদের জীবনের মূল্য না বুঝবো, চালকরা যতদিন সাবধান না হবেন, পথচারীরা যতদিন সতর্ক না হবেন; সবচেয়ে বড় কথা আইনের কঠোর প্রয়োগ যতদিন নিশ্চিত না হবে, চালকরা যতদিন আইনকে ভয় না পাবে; ততদিন সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামবে না।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Print Friendly, PDF & Email