সশস্ত্র বাহিনী একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সর্বদা প্রস্তুত : সেনাপ্রধান

প্রকাশিতঃ 12:22 am | November 21, 2022

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড. এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী একবিংশ শতাব্দীর যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সর্বদা প্রস্তুত। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেশের দুর্যোগ মোকাবিলা, দুস্থদের সহায়তায় এবং দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডসহ যে কোন প্রয়োজনে সর্বাত্মক আত্মনিয়োগের মাধ্যমে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা প্রদান করে।

সোমবার (২১ নভেম্বর) ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস ২০২২’ উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে তিনি এসব কথা বলেন।

বাণীতে ড. এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘একুশে নভেম্বর’ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন, যা বাঙালি জাতির দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে পরিগণিত ১৯৭১ সালের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর অকুতোভয় বীর সেনানীরা মুক্তিকামী আপামর জনতার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জল, স্থল ও আকাশ পথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মিলিত ও সুপরিকল্পিতভাবে অপ্রতিরোধ্য আক্রমণের সূচনা করেছিল। এই সুসংগঠিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে ত্বরান্বিত হয় আমাদের চুড়ান্ত বিজয় এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র । তাই আজ আমরা ‘একুশে নভেম্বর’ বাংলাদেশের ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’ হিসেবে উদযাপন করতে পেরে গর্বিত।

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা’ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন। লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন মানচিত্র এবং লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা। প্রতি বছর, ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’ আমাদেরকে সেই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের কথা স্মরণের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করে। আজকের এই মহতী দিনে, আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি আমাদের স্বাধীনতার রূপকার এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি বাঙালি জাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। আমি শ্রদ্ধাভরে আরো স্মরণ করছি আমাদের প্রিয় সশস্ত্র বাহিনীসহ সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যারা মহান স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং যুদ্ধাহত হয়েছেন। আমি বিশেষভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেই সকল বীর শহীদদের প্রতি যারা মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী সময় প্রিয় মাতৃভূমির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমি মহান আল্লাহর নিকট তাদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। মুক্তিযুদ্ধের অদম্য চেতনাকে হৃদয়ে ধারণের জন্য আমি সশস্ত্র বাহিনীর সকল সদস্যদের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

সেনাপ্রধান বলেন, গত বছর আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীর সাথে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করেছি। জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশকে ক্রমাগত উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীও ক্রমাগত আধুনিক সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিশ্বমানের একটি বাহিনীতে পরিণত হচ্ছে। ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আধুনিক ট্যাংক, স্বয়ংক্রিয় গ্রেনেড লঞ্চার, মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম, দূরপাল্লার সারফেস-টু-সারফেস এবং সারফেস-টু-এয়ার ফায়ার ডেলিভারি সিস্টেম, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, গ্রাউন্ড সারভাইল্যান্স রাডার, আনম্যান্ড এরিয়্যাল ভেহিক্যাল (ইউএভি) ইত্যাদি সংযোজনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর আভিযানিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।

‘আর্মি এভিয়েশন গ্রুপের জন্য নতুন এভিয়েশন বেস তৈরির পাশাপাশি নতুন হেলিকপ্টার এবং বিমান সংযোজন করা হয়েছে, যা দূর্গম এলাকায় জরুরী রশদ ও সরঞ্জামাদি সরবরাহের পাশাপাশি জরুরী রোগী স্থানান্তরের জন্যও ব্যবহৃত হচ্ছে। আধুনিক দূরপাল্লার ওয়ারলেস সেট এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম সংযোজনের মাধ্যমে আমাদের যুদ্ধকালীন যোগাযোগ সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এছাড়াও, কম্ব্যাট ইঞ্জিনিয়ারের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক ফ্লোটিং ব্রীজ, প্ল্যান্ট ভেহিক্যাল, এলসিটি এবং টিসিভি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন দেশে ও বিদেশে একটি সুশৃঙ্খল, দক্ষ, পেশাদার এবং অনুকরণীয় বাহিনী হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি সক্ষম ও আধুনিক বাহিনীতে রূপান্তরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সকল প্রকার সহায়তা প্রদানের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলতে পারি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতির গর্ব হিসেবে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা অতিদ্রুততার সাথে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাহায্যের জন্য তাদের পাশে দাড়িয়েছে; যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। এছাড়াও, জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দেশের বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও নিরলসভাবে কাজ করছে সেনাবাহিনী।

ড. শফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের গন্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাসহ দুস্থ মানুষদের পাশে দাড়িয়ে তাদের মন জয় করতে সমর্থ হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক সশস্ত্র বাহিনীর নারী সদস্যরা অংশগ্রহণ করছে। সেনাবাহিনীর মহিলা অফিসারদের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যে শান্তিরক্ষা মিশনে কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘের অধীনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এখন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশগুলোর মানুষের কাছে বড় আস্থা ও বন্ধুত্বের প্রতীক এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত । বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ত্যাগ, শৃঙ্খলা, নিষ্ঠা এবং পেশাগত দক্ষতায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ এখন শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ, যা আমাদের সকলের জন্য একটি বড় অর্জন এবং গর্বের বিষয়।

‘বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী আমাদের জাতির শক্তি, ঐক্য ও গর্বের প্রতীক। ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উজ্জীবিত করে সকলকে দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগের অনুপ্রেরণা যোগাবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এই দিনের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে আমরা সৈনিক হিসেবে দেশ ও জাতির কল্যাণে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকব। সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপনের জন্য আমি বাংলাদেশের জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’

তিনি বলেন, এই বিশেষ দিনে, আমি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সকল সদস্যকে দেশের জন্য নিঃস্বার্থ ত্যাগ এবং আত্মনিয়োগের জন্য কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাই। ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস-২০২২’ উপলক্ষ্যে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশে যারা কাজ করেছেন, তাদের সবাইকে জানাই আমার কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর উত্তরোত্তর উন্নতি ও সমৃদ্ধি কামনা করছি।

কালের আলো/এসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email