জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিরপুর অঞ্চলের সমন্বয়ক এস এম সায়েম। জবানবন্দিতে তিনি আন্দোলন চলাকালে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা দেন। একজনের পেটে গুলি লেগে ভুঁড়ি বের হয়ে গিয়েছিল, আরেকজনের মাথায় গুলি লেগে মগজ বেরিয়ে ঝুলছিল বলে জানান তিনি। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের এই শিক্ষার্থী।
সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে পাঁচ অভিযোগ
চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তাঁদের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে কারফিউ জারির মাধ্যমে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি, প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের ধারাবাহিক নির্দেশনা ও কর্মকাণ্ডের ফলে মিরপুরের ১, ২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের সশস্ত্র হামলায় বহু ছাত্র-জনতা নিহত হন। এসব নির্যাতন বন্ধে তাঁরা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সালমান ও আনিসুল সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯ জুলাই তাঁদের মধ্যে ফোনালাপ হয় বলেও মামলার অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
হাসপাতালে নেওয়া আহতদের ভয়াবহ অবস্থা
জবানবন্দিতে এস এম সায়েম বলেন, জাতিসংঘের তথ্যমতে, আন্দোলনের সময় সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর হামলায় ১ হাজার ৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারী নিহত হন। তাঁদের জানা মতে, নিহতের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। আহত হন ২৫ হাজারের বেশি মানুষ। তাঁদের মধ্যে প্রায় চার হাজার মানুষ হাত, পা কিংবা চোখ হারিয়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন বলে দাবি করেন তিনি।
সায়েম বলেন, আন্দোলন চলাকালে তিনি বেশ কয়েকজন আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন পরে মারা যান। তাঁদের একজনের পেটে গুলি লেগে ভুঁড়ি বের হয়ে গিয়েছিল। আরেকজনের মাথায় গুলি লেগে মগজ বেরিয়ে ঝুলছিল। গুলিতে আরেকজনের চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। আন্দোলনকারীদের দমনে শেখ হাসিনার নির্দেশে হেলিকপ্টার ব্যবহার করেও হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন সায়েম।
কারফিউ জারিকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ বললেন সায়েম
জবানবন্দিতে সায়েম বলেন, আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ ছিল কারফিউ জারি। কারফিউ না দিলে এত হত্যাকাণ্ড হয়তো ঘটত না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কারফিউ জারির মূল কারিগর ছিলেন সালমান এফ রহমান ও তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তাঁরা দুজনই এ সময় ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
ইন্টারনেট বন্ধের পেছনে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের ভূমিকা ছিল বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সায়েম। তাঁর দাবি, সালমান এফ রহমান পলককে ইন্টারনেট বন্ধে উৎসাহ দিয়েছিলেন।
বাড়িতে হামলা, দেয়ালে গুলির চিহ্ন
আন্দোলন চলাকালে তাঁকে আটক করতে কয়েকবার তাঁর বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছিল বলেও ট্রাইব্যুনালকে জানান সায়েম। তিনি বলেন, তাঁর বাসার একটি দেয়াল গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়। এ সময় তাঁকে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছিল, যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই মেরে ফেলা হবে। সায়েম জানান, ওই ঘটনার স্মৃতি এখনো তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
