ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় রেলের টিকিট বিক্রির দরপত্রে কেলেঙ্কারি

প্রকাশিতঃ 12:31 pm | February 18, 2021

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

দীর্ঘদিন ধরে অত্যাধুনিক ব্যবস্থায় কম্পিউরাইজড পদ্ধতিতে টিকিট বিক্রি করছে রেল কর্তৃপক্ষ। ভেন্ডরের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত গণপরিবহনটি। তবে চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার আগে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে নতুন প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করা হয়। কিন্তু কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে ট্রেনের টিকিট বিক্রির সেই দরপত্রে কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে।

এর মধ্যে বাদ পড়া প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগেরটি বাতিল করে নতুনভাবে দরপত্রের আহ্বান জানিয়েছে সরকারের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)। পাশাপাশি জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

এদিকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কম্পিউটারাইজড টিকিট বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা নেই রেল কর্তৃপক্ষের। বাধ্য হয়ে তাই চুক্তি ছাড়া আগের প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী এখনই পেপার সিøপের মাধ্যমে ট্রেনের টিকিট বিক্রি করতে হলে দেশব্যাপী বড় ধরনের বিপর্যয়ের শঙ্কায় এ উদ্যোগ বলে জানায় রেল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হঠাৎ করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টিকিট বিক্রি করতে গেলে যাত্রী আর রেলের মধ্যে অনেক সমস্যা হবে। কেননা দীর্ঘদিনের চর্চা হঠাৎ করে পরিবর্তন সহজ ব্যাপার নয়।

এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, “দরপত্রের বিষয়ে সিপিটিইউর পর্যবেক্ষণ জেনেছি। তা ছাড়া কোর্টের ‘স্টে অর্ডার’ রয়েছে। এটি আইনগতভাবে মোকাবিলা করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করতে হবে। তবে এর সঙ্গে টিকিট বিক্রি কার্যক্রমের সম্পর্ক নেই। চুক্তির মেয়াদ শেষেও আগের প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে। কারণ হঠাৎ করে এ সেবা নিজেদের মাধ্যমে দেওয়ার সক্ষমতা নেই রেলওয়ের। তাই কাজ চালানো হচ্ছে জরুরি বিবেচনায়।”

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলের পরনির্ভরতা কমিয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। সংস্থার নিজস্ব জনবল দিয়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে একটি করে স্টেশনের মাধ্যমে সক্ষমতা অর্জন দরকার। তবে এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হতে পারে সিস্টেম বা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের মতো পদে বেতন-নিয়োগে। সে ক্ষেত্রে কোম্পানি আইনের মাধ্যমে উদ্যোগটি নেওয়া যেতে পারে। আর ভেন্ডর নিয়োগে দরপত্রে শর্তারোপে

কর্মকর্তাদের অনিয়মের অভিযোগ আছে। একটি প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ বছরের টিকিট বিক্রির অভিজ্ঞতা এবং সক্ষমতার বিষয়ে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় সংশ্লিষ্টদের স্বার্থে। বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে শর্তে কী কী থাকা দরকার তা নতুন করে ভাবতেও পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। তারা এ-ও বলেছেন, মামলা দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর কাজের সুবিধা পেয়ে যাবে এটাও অনৈতিক।

দরপত্র আহ্বান এবং এর সব প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত বিভাগ সিপিটিইউ। তার আগে রেল কর্মকর্তারা জানান, দরপত্রের ব্যপারে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি নাকচ করে দেয় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। ৬০ মাসের চুক্তি বা পাঁচ বছরের মেয়াদ আর টিকিট বিক্রির কমিশনমূল্য- এ নিয়েই দেখা দেয় সমস্যা। প্রতি টিকিট বিক্রিতে ২ টাকা ৯৯ পয়সা কমিশন পায় রেল নিযুক্ত ভেন্ডর। চুক্তিমূল্যের টাকা তার আগে পেয়ে গেলেও ওই প্রতিষ্ঠান দিয়ে কাজ অব্যাহত রাখে রেল। কিন্তু ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বলে, নির্ধারিত অর্থ এবং সময়- যেটা আগে পার হবে সে বিবেচনায় শেষ হবে চুক্তির মেয়াদ। এ হিসাবে মেয়াদ অতিক্রমের পরে ক্রয় প্রস্তাব পাঠিয়েছিল রেল মন্ত্রণালয়।

রেলের দাবি, তারা টাকার পরিমাণের পরিবর্তে চুক্তির সময়কেই ‘গুরুত্ব’ দিয়েছিল। সাড়ে তিন বছরের মাথায় টিকিট বিক্রির কমিশনের টাকা পেয়ে গেছে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু মন্ত্রিসভা কমিটিতে ১৮ মাস পর চুক্তি বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল।

এদিকে সিপিটিইউর সাম্প্রতিক রায়ে রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. মিয়া জাহান এবং বর্তমান যুগ্ম মহাপরিচালক (অপারেশন) রাশিদা সুলতানা গনিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চক্রান্তমূলকভাবে সম্পৃক্ত থাকার কথা বলা হয়। বিশেষ করে রেলের তৎকালীন মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামানের পক্ষ থেকে সচিবের কাছে পাঠানো সারসংক্ষেপে ‘সত্যকে গোপন’ করা হয়েছে বলে অভিমত এসেছে। আর দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর জমা দেওয়া মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ‘হাইড অ্যান্ড সিক’ পন্থার কথা তুলে ধরা হয়। ১০টি সভায় অংশ নেওয়ার কথা উল্লেখ করলেও সভার কার্যবিবরণি বা মূল্যায়ন শিট প্যানেলে দিতে না পারার কথা বলেছে সিপিটিইউ।

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে রেলওয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক, যুগ্ম মহাপরিচালক (অপারেশন), সিএসটি টেলিকমসহ জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সংস্থাটি তাদের প্যানেল পর্যবেক্ষণে পদের নাম উল্লেখ না করলেও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ‘কর্মকর্তা’ হিসেবে ইঙ্গিত করেছে। এ দরপত্রের প্রকল্প পরিচালক রাশিদা সুলতানা গনি। প্রক্রিয়াটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কার্যক্রমকেই ‘দুরভিসন্ধিমূলক ও চাতুর্যপূর্ণ’ বলে রায় দিয়েছে সিপিটিইউর রিভিউ প্যানেল। এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের বেলায় ‘যোগসাজশে ও দুর্নীতি করার মানসে’ শব্দগুচ্ছ উল্লেখ করা হয়। তবে দরপত্রে অনিয়ম হয়ে থাকলে মূল্যায়নকালে কমিটির সদস্য হিসেবে সম্পৃক্ত কম্পিউটার কাউন্সিল এবং বুয়েটের শিক্ষকরা এর দায় এড়াতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্নও উঠেছে। তাদের ব্যাপারে মন্তব্য করা হয়নি কেন জানতে চান একাধিক রেলকর্তা।

২০২০ সালের ২৩ মার্চ দরপত্র উন্মুক্ত করে দেখা যায়, তাতে নয়টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। পরে দুটি প্রতিষ্ঠানকে কারিগরিভাবে রেসপনসিভ করা হয়। সবশেষে একটি প্রতিষ্ঠানকেই কেবল মনোনীত করে অনাপত্তি দেয় রেল কর্তৃপক্ষ। এ দরপত্র প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব সংস্থার যুগ্ম মহাপরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক রাশিদা সুলতানা গণি। অথচ ২০১৯ সালে রেল মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তার ব্যাপারে বলা হয়- ‘তিনি ১২১ জন সুইপার নিয়োগে সরকারি আদেশ নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে নিয়োগ কার্যক্রমে চরম অনিয়ম করেছেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫-এর ৩(বি) বিধি মোতাবেক অসদাচরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হলো এবং একই বিধিমালার বিধি ৪(২) (ক) অনুযায়ী তাকে তিরস্কার করা হলো।’ এ নিয়ে পরে আবেদনের মাধ্যমে ক্ষমা পান রাশিদা সুলতানা। ওই ঘটনার দুবছর পর তিনি আবারও বিতর্কিত হলেন দরপত্র মূল্যায়নের ঘটনায়।

সদ্য অবসরে যাওয়া দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক মিয়া জাহান এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি। প্রকল্প পরিচালক রাশিদা সুলতানা গণি অবশ্য বলেন, ‘স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ করার পরও নানা কথা উঠছে, তাই মন্তব্য করব না। এমনিতেই মিডিয়ায় মন্তব্য করা নিষেধ।’

সূত্রমতে, টিকিট বিক্রির কার্যক্রমে ২ টাকা ৯৯ পয়সাকে ভিত্তি ধরে যাত্রীপ্রতি ৪ দশমিক ৩৫ টাকা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে ইনটিগ্রেটেড টেকনিক্যাল সিস্টেম। এখানে সর্বনিম্ন দরদাতার দশমিক ২৫ টাকার উদ্ধৃত দরকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ করেছে। এ নিয়ে বলা হয়েছে- প্রাক্কলনটি ‘অতি মূল্যায়িত’। আর রেলের কর্মকর্তারা সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করাকে ‘একপেশে’ পর্যবেক্ষণ হিসেবে দেখছেন। রাষ্ট্রের স্বার্থে সর্বনিম্ন দরদাতাকে মনোনীত করাই বরং যৌক্তিক মনে করেন তারা।

২০১৪ সালে সেপ্টেম্বরে সর্বশেষ চুক্তিবদ্ধ হয় রেলে নিযুক্ত অপারেটরটি। এরও আগে তথা শুরু থেকেই সেবা দিচ্ছে ওই প্রতিষ্ঠান। ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি, স্টপেজ বৃদ্ধি, কোচ ও আসন বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণসহ নানা যুক্তিতে চুক্তিমূল্য বাড়ায় কয়েক ধাপে।

কালের আলো/ডিএসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email