প্রতিরোধে তারুণ্য

প্রকাশিতঃ 10:45 am | October 11, 2020

তুষার আবদুল্লাহ:

আমাদের যৌথ পরিবারে এক সন্তান, ফেসবুকে একজনের মন্তব্যে ‘সহমত’ মন্তব্য করেছে। অবশ্যই সে পুত্র সন্তান। ওর সঙ্গে বেশ কিছুদিন দেখা হয় না। কথাও হয়নি। বিশেষ করে যখন দেশে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে, এ নিয়ে ফেসবুকে রকমারি বক্তব্যে ঘূর্ণিঝড় বইতে শুরু করেছে, সেই সময়টায় ওর সঙ্গে কথা বলা হয়নি। এমনিতে সরাসরি কথা না হলেও ফেসবুকে ওর প্রতি নজর থাকে। কী স্ট্যাটাস দিলো, অন্যের স্ট্যাটাসে ও কী মন্তব্য দিলো, সেদিকে মনোযোগ থাকে। কয়েকদিন মনের সেই যোগাযোগটুকুও ছিল না। সেজন্য মেয়ের কাছে ধমক খেতে হলো—তুমি দেখেছো ও ফেসবুকে কী লিখেছে, দেখনি কেন? মেয়ের কাছে হরহামেশাই ক্ষমা চাইতে হয়।

এবারও তাই করতে হলো। এবং ক্ষমা করে দিয়ে মেয়ে জানালো—কোনও একজন ফেসবুকে মেয়েদের পোশাকের প্রতি ইঙ্গিত করে লিখেছেন, মেয়েদের পোশাকই ধর্ষণ উসকে দিচ্ছে। সেখানে যৌথ পরিবারের ওই পুত্র সন্তান ‘সহমত’ মন্তব্য করেছে। এতে আমার মেয়ে বিব্রত এবং বিষণ্ণ। পরিবারের শিক্ষাতে তাহলে এখনও কোনও খাদ রয়ে গেছে হয়তো। এ এরই মধ্যে যাচাই বাছাই করতে শুরু করেছে—ওই পুত্র স্কুলে বা কোচিংয়ে কোনও বন্ধুর সঙ্গে চলাফেরা করে। ওদের বাসা শহরের অন্যপ্রান্তে। সেখানে ওদের পরিবারে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্কটা আসলে কেমন। ওদের প্রতিবেশী সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করছে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কী ধরনের বই পড়ে ওই পুত্র এবং তার ইন্টারনেট বা টিভির সঙ্গের সম্পর্কটাও বোঝার চেষ্টা করছে মেয়ে।

মেয়ের মূলকথা হলো—কে কী পোশাক পরছে, সেটি তার ব্যক্তিগত রুচি ও বিশ্বাসের বিষয়। অন্য মানুষের কোনও অধিকার নেই সেই বিষয় নিয়ে কথা বলার। ছেলেমেয়ে উভয়ের পোশাকের দিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে যিনি তাকাচ্ছেন, সমস্যাটি আসলে তার ব্যক্তিগত। তিনি পোশাকের মধ্যে নগ্নতা বা অশ্লীলতা খুঁজছেন। পরিবার তার সন্তানদের শেখাবে, পোশাকের সৌন্দর্যবোধ এবং রুচি। একই সঙ্গে অন্যের পোশাকের দিকে যে বিরূপ বা নোংরা চোখে তাকানোটাই অভদ্রতা, অরুচিকর, সেই শিক্ষাটিও পরিবারের কাছ থেকে আসতে হবে। পরিবার এই শিক্ষা দিলে ছেলে কিংবা মেয়ে উভয়ের চোখ সুন্দরভাবে তৈরি হবে না। বিদ্যায়তনে সহপাঠীর দিকে, পথে কোনও মেয়ে বা ছেলের দিকে তাকানোর ক্ষেত্রে নেমে আসবে না অশ্লীলতার ছায়া।

এই ছেলেমেয়েরাই পরবর্তী চাকরিতে বা সমাজ, রাষ্ট্রে যে অবস্থানেই পৌঁছাক না কেন, সুন্দর চোখের আলোই ছড়াবে। বাস্তবতা হলো আমাদের পরিবারগুলো সন্তানদের সুন্দর চোখ তৈরির আঁতুড় ঘর ভেঙে দিচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ না থাকায় কমে গেছে পারস্পরিক কথোপকথন। ভোগের ব্যাপকতা বেড়েছে। বেহিসেবি রোজগারে বেসামাল পরিবার। এ অবস্থায় প্রত্যেক পরিবারই নিজেদের ‘চকচক’ ভাবটি প্রদর্শনে ব্যস্ত। প্রদর্শনের আকুলতা নৈতিকতা ও শুভবোধ থেকে পরিবারের সদস্যদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এই কথাগুলো প্রযোজ্য উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারে। কিন্তু নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীনদের শুভবোধ চর্চার সময় নেই। পরিবারের রুটির জোগান দিতে গিয়েই পরিশ্রান্ত তারা। যদিও এই পরিবারগুলোর মধ্যেও এক সময় দারিদ্র্যের অহংকার ছিল।

সেই অহংকারের সঙ্গে যুক্ত ছিল নৈতিকতা। কিন্তু ওপরের বেসামাল ঢেউয়ের ছিটে আছড়ে পড়ছে এই পরিবারগুলোতে। ভোগের তৃষ্ণায় বৈচিত্র্য এসেছে এদের মাঝেও। ‘দখল’-এর জাদুকরী বিদ্যে এখন তাদেরও জানা। জমি, সম্পদ দখল না করতে পারলে ‘শরীর’ তো দখল করা গেলো। এই দখলদারিত্বের রোগটি সারানোর জায়গা হতে পারে বিদ্যায়তন। কিন্তু আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষায় শিশুর মন ও চোখ সুন্দর করে দেওয়ার বিদ্যে অনুপস্থিত। সেখানে চরম শ্রেণি বৈষম্য। উল্টো সেখানে শিক্ষার্থীদের উসকে দেওয়া হয় ভোগের প্রতিযোগিতায়। ধর্মীয় নৈতিকতার বিষয়গুলো উপস্থাপিত হচ্ছে না যথাযথভাবে। প্রকৃত শিক্ষক তৈরি হচ্ছে না। বরং শিক্ষকদের দ্বারাই ছেলেমেয়েরা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।

মেয়ে তার স্কুল, কলেজ জীবন শেষ করে এসে এই উপলব্ধির কথাগুলোই বলছিল। কোনোটি পাশ কাটিয়ে যাওয়া বা অস্বীকার করার মতো যুক্তি প্রমাণ আমার কাছে নেই। বরং বিস্মিত হয়েছি, আমাদের চেয়েও সমাজের প্রতি তরুণরা যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে তা দেখে। বিপ্লবী চে গুয়েভারার মৃত্যুদিন গেলো কাল। আমি তো দেখছি চে’র মৃত্যু হয়নি। অপশক্তির বিরুদ্ধে জাগ্রত আছে কোটি ‘চে’।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

Print Friendly, PDF & Email