হ্যাঁ ভাই, ডুবিতেছে রুপালি পর্দা

প্রকাশিতঃ 9:38 am | September 15, 2020

প্রভাষ আমিন:

করোনা গোটা বিশ্বকেই থমকে দিয়েছে। কত শিল্পকে যে কতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তার কোনও লেখাজোখা নেই। তবে করোনা সম্ভবত বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সিনেমা শিল্প এমনিতেই কোমায় ছিল,করোনা তাকে ডিপ কোমায় ঠেলে দিয়েছে। করোনা গেলেও বাংলাদেশের সিনেমা শিল্প আর কখনও আগের জায়গায় ফিরবে না। ফিরবে তো পরে, সিনেমা শিল্প আদৌ বাঁচবে কিনা, তা নিয়ে আরও অনেকের মতো আমারও সন্দেহ আছে। গোটা সিনেমা শিল্পের বাঁচামরা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও করোনার পরে যেসব সিনেমা হল আর খুলবে না, এটা একশ’ ভাগ নিশ্চিত।

আমাদের ছেলেবেলায় সিনেমা ছিল বিনোদনের প্রধান উৎস। সত্তরের দশকে চট্টগ্রামে সপরিবারে সিনেমা দেখতে যাওয়ার স্মৃতি এখনও আনন্দ দেয়। তবে আমার মাথায় সিনেমার পোকাটা ঢুকে কলেজে ওঠার পর। কুমিল্লায় তখন পাঁচটি সিনেমা হল ছিল। আর আমি সপ্তাহে পাঁচটি সিনেমা দেখতাম। পরীক্ষা থাকলে একদিনে একাধিক সিনেমা দেখে ফেলতাম। আব্বা গুনে গুনে টাকা দিতেন, তারপরও সিনেমা দেখার টাকা কীভাবে ম্যানেজ করতাম, সেটা এখনও হিসাব মেলাতে পারি না। এই লেখার জন্য খোঁজ নিয়ে জানলাম, কুমিল্লায় এখন কোনও সিনেমা হল চালু নেই। দীপিকা আর মধুমতি ভেঙে মার্কেট বানানো হচ্ছে। লিবার্টি ভবন বিধ্বস্ত, পরিত্যক্ত।

রূপকথা ও রূপালীও বন্ধ। এখানে মার্কেট বানানোর পরিকল্পনা চলছে। কুমিল্লার মতো একটি ঐতিহ্যবাহী পুরনো শহরে একটিও সিনেমা হল নেই, এটা অবিশ্বাস্য। ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য গভীর বেদনার। প্রতিটি হলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার কত আনন্দ-বেদনার স্মৃতি। শুধু কুমিল্লা নয়, দেশের অন্তত ৩০ জেলায় এখন কোনও সিনেমা হল নেই। নব্বইয়ের দশকেও দেশে হাজার দেড়েক সিনেমা হল ছিল। করোনাভাইরাস আসার আগে এ সংখ্যা কমতে কমতে ৬০-এর ঘরে নেমে এসেছিল। আমার আশঙ্কা করোনা গেলেও সব সিনেমা হল আর খুলবে না। তেমনই এক থেকেই এই লেখার ভাবনা।

কয়েকদিন আগে শুনলাম, বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্স আর খুলছে না। বসুন্ধরা সিটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্টার সিনেপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের চুক্তি শেষ হয়ে গেছে। চুক্তি নবায়ন হবে না, তাই স্টার সিনেপ্লেক্স আর খুলছে না। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাহাকার, স্টার সিনেপ্লেক্স বন্ধ হলে বুঝি সিনেমা শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে স্টার সিনেপ্লেক্স বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়ার চুক্তি জটিলতায়, এর সঙ্গে সিনেমা শিল্পের কোনও সম্পর্ক নেই। দুইপক্ষ, মানে বসুন্ধরা সিটি এবং স্টার সিনেপ্লেক্স কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ; তারা চুক্তি নবায়ন করছেন এবং বসুন্ধরা স্টার সিনেপ্লেক্স আবার খুলবে। এখন ঢাকায় স্টার সিনেপ্লেক্সেরই আরও শাখা আছে। এর বাইরেও আরও কয়েকটি সিনেপ্লেক্স আছে। তবে বসুন্ধরা স্টার সিনেপ্লেক্স একটি ইতিহাস।

বাংলাদেশের সিনেমার ধ্বংসের জন্য সিনেমা সংশ্লিষ্ট লোকেরাই দায়ী। নব্বইয়ের দশকে কাঁচা টাকার লোভে অশ্লীলতার আমদানি করে সিনেমাকে নিষিদ্ধ বিনোদন বানিয়ে ফেলা হয়, মধ্যবিত্তের সপরিবারে সিনেমায় যাওয়ার সংস্কৃতিটা ফুরিয়ে যায় তখনই। স্টার সিনেপ্লেক্স এসে মধ্যবিত্তদের আবার হলে ফিরিয়ে আনে। তারা সিনেমা দেখার সংস্কৃতিটায় আভিজাত্যের প্রলেপ দেয়। ব্ল্যাকারের উৎপাত নেই, ঝালমুড়ির বদলে পপকর্ন, কোল্ড ড্রিংকসের বোতলের সম্মোহনীর বদলে ওয়ানটাইম গ্লাসের সফিসটিক্যাসি। এখন আর সিনেমা হলে সিটি বাজে না। ভদ্রলোকেরা নিঃশব্দে সিনেমা দেখেন। বাংলাদেশের সিনেমাকে হল থেকে সিনেপ্লেক্সের আভিজাত্য উন্নীত করা, মধ্যবিত্তকে সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব অবশ্যই স্টার সিনেপ্লেক্সের। তবে আমার কথা যদি বলেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টার সিনেপ্লেক্সে পিনপতন নীরবতায় পপকর্ন খেতে খেতে সিনেমা দেখাটা অতটা রোমাঞ্চকর নয়, যতটা ছিল আশির দশকে। মারামারি করে ব্ল্যাকে টিকিট কাটা, কখনও কখনও থার্ড ক্লাসে ঘামে ভিজে যাওয়া, বিরতির সময় কোল্ড ড্রিংকসের টুংটাং শব্দ যে ঝঙ্কার তুলতো হৃদয়ে, তার তুলনা কিছুতে পাই না।

স্টার সিনেপ্লেক্স তবু কোরামিন দিয়ে সিনেমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু গোটা দশেক সিনেপ্লেক্স আর গোটা পঞ্চাশেক সিনেমা হল দিয়ে একটা দেশের সিনেমা শিল্প বাঁচতে পারে না। আবার ২/৩ বছর পরপর দুয়েকটা হিট ছবি দিয়ে সিনেপ্লেক্স বা সিনেমা হল টিকবে না। সিনেপ্লেক্সগুলো তবু বিদেশি সিনেমা দেখিয়ে পুষিয়ে নেয়, বাংলাদেশের সিনেমা দেখিয়ে তো হল চলবে না। তাই ধীরে ধীরে সব সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

তাহলে সমাধান কী? সিনেমা হল এবং সিনেমা শিল্প বাঁচানোর উপায় কী? অনেকে সিনেপ্লেক্সের সংখ্যা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। খুব ভালো। কিন্তু দেশজুড়ে সিনেপ্লেক্স গড়ে তুলে সেখানে আপনি দেখাবেন কী? ভালো সিনেমা কই? বিদেশি সিনেমা দেখিয়েই যদি হল-সিনেপ্লেক্সকে টিকে থাকতে হয়, তাহলে বাংলাদেশের সিনেমা তো টিকবে না। অভিযোগের প্রথম তীর দর্শকদের দিকে। দর্শকরা যান না বলে সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আবার হল কমে যাচ্ছে বলে ভালো সিনেমা বানানো হচ্ছে না। আমার বিবেচনায় সমস্যাটায় ভালো সিনেমার অভাবে, দোষ দর্শকের নয়। বাংলাদেশের দর্শক সিনেমা দেখে না, এই অভিযোগ সত্যি নয়। আয়নাবাজি, ঢাকা অ্যাটাক দেখার জন্য তো দর্শকের অভাব হয়নি। বেশি দিন আগের কথা নয়, কোনও একটা ইংরেজি সিনেমার টিকিটের জন্য তরুণেরা ভোররাত থেকে স্টার সিনেপ্লেক্সের সামনে লাইন ধরেছিল। অত দূর যাওয়ার দরকার নেই, এই করোনাকালে বাংলাদেশের মানুষ যত সিনেমা দেখেছে, আনুপাতিক হার বিবেচনায় তা ওপরের দিকেই থাকবে। নেটফ্লিক্স, হইচইয়ের মতো স্ট্রিমিং সাইটগুলো এই কয় মাসে কত টাকা নিয়েছে, খোঁজ নিয়ে দেখুন।

বাংলাদেশের দর্শকদের সিনেমা দেখার অভ্যাস ফিরেছে, এটা ভেবে যদি কেউ আত্মপ্রসাদ লাভ করে থাকেন; তাহলে তিনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। বরং আমার ধারণা এই করোনাকালের সিনেমা দেখার অভ্যাস, বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পের সংকটকে আরও গভীর করবে। বাংলাদেশের সিনেমা দেখা আমার মতো কুয়ার ব্যাঙদের হাতেও এখন বিশ্ব সিনেমার মহাসমুদ্রের ভান্ডার। হিন্দি, ইংরেজি, তামিল, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, হাতের কাছের পশ্চিমবঙ্গ—সব ছবি এখন হাতের মুঠোয়। ভাষার দূরত্ব ঘুচিয়েছে সাব টাইটেল। এবার বিপদটা টের পাচ্ছেন, আমি প্রতিদিন সিনেমা দেখবো। কিন্তু আমার হাতে যেহেতু অপশন আছে, আমি কেন বিশ্বমান ছেড়ে আপনার বানানো ট্র্যাশ দেখবো? বেশি দূর যেতে হবে না, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সিনেমার তুলনায়ও তো আমরা এখনও কুয়োর ব্যাঙই। আগে যে দূর কোনও দেশের সিনেমা নকল করে পার পেয়ে যেতেন, সে সুযোগও এখনও। চট করে পাবলিক ধরে ফেলবে। অরিজিনালটা দেখার সুযোগ থাকলে নকলটা কেন দেখবো?

আমি আগেই বলেছি, মূল সমস্যা ভালো সিনেমার জোগানে। আর যারা সিনেমা বানান, তাদের অভিযোগ, মূল সংকট পুঁজির। যেহেতু সিনেমা হিট করে না, তাই কেউ এখানে বিনিয়োগ করে না। আর টাকা নেই বলে ভালো সিনেমা বানানো যাচ্ছে না। আমি এই যুক্তির সঙ্গে একমত। হলিউড-বলিউডে শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সিনেমা বানানো হয়, লাভ হয় তার কয়েক গুণ। আমাদের এখন যা অবস্থা, সিনেমা সুপারহিট হলেও গোটা পঞ্চাশেক হলে দেখিয়ে পুঁজি তুলে আনাই কঠিন। তারপরও আমি মনে করি, আসল সংকট হল বা বিনিয়োগে নয়, সংকট ভাবনায়। কম বাজেটেও ভালো সিনেমা বানানো সম্ভব। কিন্তু কন্টেন্টে সেই চমক কই? আপনি ভালো সিনেমা বানালে দর্শক অবশ্যই হলে যাবে। আর দর্শক গেলে হলের সংখ্যাও বাড়বে। এটা তো ব্যবসা। লাভ হলে বিনিয়োগ আসবেই। তবে সবার আগে ভালো সিনেমা বানাতে হবে। যারা সিনেমা আন্দোলন করেন, তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন আপনাদের কাছে কয়টা মৌলিক চিত্রনাট্য আছে, যেটা আপনি টাকার অভাবে বানাতে পারেননি। দর্শকদের দোষ না দিয়ে নিজেরা আগে ভালো সিনেমা বানান।
সরকারি অনুদানেও ভালো সিনেমা বানানো সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের এখানে ‘ভালো সিনেমা’ মানে সাধারণ দর্শকদের মাথার অনেক ওপর দিয়ে যাওয়া আর্ট ফিল্ম, যেগুলো জুরি বোর্ডের সদস্যরাই শুধু দেখেন, আমজনতা নয়। সিনেমা বাঁচাতে হলে আমজনতার জন্য ভালো সিনেমা বানাতে হবে। তারপর সুযোগ পেলে জুরিদের জন্যই দুয়েকটা বানান আপত্তি নেই। ভাই, সিনেমাটা আমাকে পকেটের পয়সা দিয়ে দেখতে হয়। সিনেপ্লেক্সে গিয়ে দেখলেও টাকা খরচ করতে হয়, বাসায় বসে নেটফ্লিক্সে দেখলেও টাকা দিতে হয়। নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে আমি আপনার এক্সপেরিমেন্ট কেন দেখবো। টেলিফিল্মে হাত পাকিয়ে তারপর সিনেমা বানাতে আসবেন। সিনেমা মানে সিনেমা, পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সিনেমা। টেলিফিল্মের মাঝখানে দুটো গান বসিয়ে হলে মুক্তি দিয়ে হাপিত্যেশ করবেন না। জুরিদের বুঝ দিতে পারবেন, সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়।

বাংলাদেশে এখন যারা সিনেমা আন্দোলন করেন বা সিনেমার জন্য মায়াকান্না কাঁদেন; তারা সবাই এফডিসি থেকে দূরে। এফডিসিকে যেন কিছু তৃতীয় শ্রেণির মাস্তানের কাছে লিজ দেওয়া হয়েছে। তারা সেখানে নানা সংগঠন করে, গ্রুপিং করে, বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কার করে; খালি সিনেমাটা করে না। অথচ একসময় আলমগীর কবরীরা এফডিসিতে গিয়েই সিনেমা বানিয়েছেন, আন্দোলন করেছেন। সিনেমা আন্দোলন যদি বিকল্পধারা হয়, এফডিসি নিশ্চয়ই মূলধারা। আসলে মূলধারাকে বয়কট করে বিকল্পধারা এগোতে পারবে না। সিনেমাকে বাঁচাতে হলে মূলধারাকে শক্তিশালী করতে হবে, দুর্বৃত্তদের কবল থেকে এফডিসিকে রক্ষা করতে হবে। চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে মূলধারায় মেধার প্রবাহ চাই।

চাই বটে, কিন্তু পাবো কিনা জানি না। ভয় হয়, কোমায় থাকা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, কবে না জানি একেবারে মরে যায়। আশির দশকে পত্রিকার পুরো পৃষ্ঠায় সিনেমার বিজ্ঞাপন থাকতো, দেয়ালে পোস্টার, রিকশা পেইন্টিংয়ে সিনেমা। মফস্বল শহর বা গ্রামে ঘোড়ার গাড়ি বা রিকশায় মাইকে সিনেমার বিজ্ঞাপন হতো। তখন প্রতি সপ্তাহে দুটি করে সিনেমা মুক্তি পেতো। দুপুরে কান খাড়া করে থাকতাম, রেডিওতে সেই ভরাট কণ্ঠের জন্য, হ্যাঁ ভাই আসিতেছে রুপালি পর্দায়…। এই কণ্ঠ দিয়েই তারকা ছিলেন নাজমুল হুসাইন আর মাজহারুল ইসলাম। এখন আর সেই ‘হ্যাঁ ভাই’ আমাদের চিত্ত চঞ্চল করে না, রক্তে নেশা ধরায় না। বরং আমি যেন শুনি, কেউ যেন আড়ালে ডাকছে, হ্যাঁ ভাই, ডুবিতেছে রুপালি পর্দা।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Print Friendly, PDF & Email