জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ‘সেরার মুকুট’ যেভাবে বাংলাদেশের মাথায়

প্রকাশিতঃ 8:11 am | September 13, 2020

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :

পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও নিষ্ঠায় এমনিতেই তারা সবার সেরা। বৈরী আবহাওয়া, অচেনা পরিবেশ, অশান্ত ও বিরোধপূর্ণ এলাকায় শান্তির পতাকা উড়ানোর কাজেও শ্রেষ্ঠ।

আরও পড়ুন: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য প্রেরণে শীর্ষে বাংলাদেশ

স্বভাবতই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে প্রায় ৮ বছর র‌্যাঙ্কিংয়েও এক নম্বর অবস্থানে ছিল ব্লু হেলমেটধারীরা।

কিন্তু আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া তাদের টপকে যায়। প্রায় ৫ বছর পর আবারও ঘনবসতিপূর্ণ দেশটির সেনাদের পেছনে ফেলে নিজেদের হারানো স্থান পুনরুদ্ধার করে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে এখন ৬ হাজার ৭৩১ জন বাংলাদেশী সৈন্য কাজ করছে।

আরও পড়ুন: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার হলেন মাঈন উল্লাহ চৌধুরী

উপমহাদেশের অপর দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তান জাতিসংঘে সেনা সরবরাহের দিক থেকে র‌্যাঙ্কিংয়ে পঞ্চম ও ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্ব শান্তি রক্ষায় প্রতিবেশী দুই দেশের তুলনায় যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানের মুকুট মাথায় দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের সময়ে। বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের মহাকাব্য রচনায় তাঁর নেতৃত্বের দৌলতেই হারানো গৌরব ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশ।

অতীতের ধারাবাহিকতায় এ সময়েও সর্বোচ্চমানের পেশাদারি মনোভাব, সাহসিকতা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে বিশ্বের দেশে দেশে সন্ত্রাস, সংঘাত ও দাঙ্গা দমনের মাধ্যমে শান্তি স্থাপন থেকে শুরু করে দেশ পুনর্গঠনে নির্ভীক ভূমিকা পালন করছে এদেশের শান্তি সেনারা।

মাস কয়েক আগে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস্ (বিইউপি) উপাচার্য মেজর জেনারেল আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান বলেন, ‘টানা ৩২ বছর যাবত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা।’

এ শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা সরবরাহের দিক থেকে বাংলাদেশের পুনরায় এক নম্বর অবস্থানের জন্য তিনি কৃতিত্ব দেন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদকে।

সেদিন ওই অনুষ্ঠানে আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান বলেন, ‘বর্তমান মাননীয় সেনাপ্রধান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখা দেশসমূহ সফর করেন।

সেখানে তিনি সাধারণ সৈনিক থেকে শুরু করে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলার বিষয়টিতেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি জাতিসংঘের সদর দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এসবের সুফল হিসেবেই আবারও সৈন্য প্রেরণের দিক থেকে টপ ওয়ানে জায়গা করে নিয়েছি আমরা।’

সূত্র মতে, জাতিসংঘের অধীনে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় তিন দশক সময় পার করছে বাংলাদেশ। বিশ্বে ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬৮ শান্তি মিশনের মধ্যে বাংলাদেশী শান্তি সেনাদের স্পর্শ পেয়েছে ৫৪ মিশন। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ১৩ মিশনে দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা।

সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ১৯৮৯ সাল থেকে পুলিশ বাহিনী এবং ১৯৯৩ সাল থেকে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করছে। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের একটি বিশাল স্থান দখল করে আছে বাংলাদেশী সেনারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্বশান্তি রক্ষা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রত্যয় এবং এ লক্ষ্যে জাতিসংঘের আহবানের প্রতি তাঁর দ্রুত ও ইতিবাচক সাড়া দেয়ার কারণেই জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে শীর্ষস্থান দখলের অর্জন লাভ করেছে বাংলাদেশ।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক দিনে দু’টি সুসংবাদের কথা জানান দেন দেশবাসীকে। প্রথম সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা বলেন, বর্তমানে শান্তিরক্ষী মিশনে সৈন্য প্রেরণকারী দেশের সংখ্যা ১১৯টি।

এর মধ্যে ৬ হাজার ৭৩১ জন শান্তিরক্ষী মোতায়েন করে বাংলাদেশ প্রথম স্থান অধিকার করেছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইথিওপিয়া। তাদের সৈন্য সংখ্যা ৬ হাজার ৬৬২ জন।

বৈশ্বিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী বাহিনী যেমন সুনাম অর্জন করেছে তেমনি বিভিন্ন মিশনে ডেপুটি কমান্ডার হিসেবেও নেতৃত্ব দিচ্ছে।

এক্ষেত্রে আইএসপিআর’র আরেকটি ‘গুড নিউজ’ ছিল এমন- ‘দক্ষিণ সুদানের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী।’

দক্ষিণ সুদান সম্পর্কে দেওয়া তথ্যে তারা আরও জানায়, বিশ্বের নবীনতম দেশ দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ কার্যক্রম শুরু করে ২০১১ সালে। বাংলাদেশের একটি কন্টিনজেন্ট দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ মিশনের শুরু থেকেই নিয়োজিত।

মিশনে বর্তমানে একটি পদাতিক কন্টিনজেন্টসহ বাংলাদেশের সর্বমোট ৩টি কন্টিনজেন্ট দক্ষিণ সুদানে ইউএনএমআইএসএস মিশনে নিয়োজিত। এই মিশনে বর্তমানে ১ হাজার ৬৪৪ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে।

কালের আলো/আরআই/এমএ

Print Friendly, PDF & Email