দুর্নীতিপরায়ণ ‘সুপারম্যান’ বাবা ও তাদের সন্তানরা

প্রকাশিতঃ 11:09 am | June 27, 2024

শাহানা হুদা রঞ্জনা:

প্রায় সব সন্তানের কাছেই তাদের বাবা সুপারম্যান। কারণ তারা বড় হতে হতে দেখে বাবা ক্ষমতাবান, বাবা আয় করেন, বাবাই সবার চাহিদা মেটাতে কাজ করে যাচ্ছেন, বাবা অসুস্থ হলে বা বাবা না থাকলে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সময়ের সাথে সাথে এখন মায়েরাও সংসারের আয়ের হাল ধরেছেন। কিন্তু এরপরেও অধিকাংশ পরিবারে এখন পর্যন্ত বাবারাই মূল চালিকাশক্তি। বাবারাই সন্তানের খাওয়া-পড়ার খরচ জোগান, আব্দার মেটান, অকুণ্ঠ ভালোবাসা দেন, পথ দেখান, ন্যায়-অন্যায় বোধ জাগিয়ে তোলেন। আমার বাবা আমার জীবনের আদর্শ। তার ছোট ছোট আচরণও আমি লক্ষ্য করেছি ও মেনে চলার চেষ্টা করেছি।

সেই সময় বাবার আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল অধিকাংশ পরিবার। সৎপথে থেকে কষ্ট করে আয় করতে হতো বলে তার দেওয়ার হাত ও আমাদের চাওয়াটাও ছিল সীমাবদ্ধ। হয়তো তারও ইচ্ছা করতো সব থেকে ভালো ও দামি জিনিসটা আমাদের হাতে তুলে দিতে, হয়তো চাইতেন আমাদের সব চাহিদা পূরণ করতে। কিন্তু তার সাধ্যের মধ্যেই ছিল সব সাধ, আমাদেরও তাই। আমাদের ‘সুপারম্যান’ বাবা হয়তো ১৫ লাখ টাকার খাসি, ২ কোটি টাকার ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি, ৩ লাখ টাকার শাড়ি বা লেহেঙ্গা কিনে দিতে পারেননি কিন্তু দিয়েছেন ভালোবাসা, নির্দেশনা ও শিক্ষা, যা আমাদের সম্মানিত করেছে, লজ্জিত করেনি।

আব্বা যখন আমাদের হাতে হঠাৎ কোনো উপহার বা সামান্য দামি পোশাক এনে দিয়েছেন আমরা জানতে চাইতাম আব্বা এখন এটা কিনলে কেমন করে, টাকা পেলে কোথায়? এমনকি ১৯৮৩ সালে চরম আর্থিক অনটনের সময় আব্বা যখন ৩০০ টাকা দিয়ে আমাকে ইতিহাসের একটা রেফারেন্স বই কিনে দিয়েছিলেন, তখনও আমি বিস্মিত হয়েছি। একটা অপরাধবোধ আমাকে চেপে ধরেছিল। মনে হয়েছিল আব্বা এত কষ্ট করে আমাকে যে বইটি কিনে দিয়েছেন, আমি যেন তার এই ভালোবাসার সম্মান রাখতে পারি।

যার টাকা আছে, তাকেই সবাই কদমবুচি করেন এবং সুপারম্যানের আসনে বসান। তিনিই হন ব্যাংকের পরিচালক, মসজিদ কমিটির সভাপতি, সমাজের মোড়ল, এতিমখানার পরিচালক এবং আরো অনেককিছু। পদ ও পদবিতে ভরিয়ে দেওয়া হয় তাদের। অথচ একটা সময় ছিল যখন অসৎ মানুষের সাথে কেউ মিশতে চাইতেন না, বাঁকা চোখে দেখতেন। কিন্তু এখন ঠিক উল্টোটাই দেখতে পারছি। জানি না রাষ্ট্রব্যবস্থা কবে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে, কবে পরিবার ও সমাজ তাদের প্রশ্ন করবে?

আজকে যারা চোর-বাটপার পরিবারের সন্তান, তারা কখনো কি তাদের বাবার আয়ের পরিমাণ ও উৎস জানতে চেয়েছেন? কোন স্ত্রী কি জানতে চেয়েছেন স্বামী কেন, কোথা থেকে এত টাকা আয় করছেন এবং স্ত্রী-সন্তানের নামে গচ্ছিত রাখছেন? কোন সন্তান কি জানতে চেয়েছেন তাদের চাকুরে বাবা ডজন খানেক বাড়ি বানাচ্ছেন কীভাবে?

বেনজীর আহমেদের মেয়ে কি জানতে চেয়েছেন, তার আরাম নিশ্চিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে কীভাবে কোটি টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন তার চাকরিজীবী বাবা? কীভাবে মতিউর তার ছেলে ইফাতকে ১৫ লাখ টাকার খাসি ও ৭০ লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনে দিতে পারছেন? মতিউরের স্ত্রী কি জানতে চেয়েছেন ৭০ হাজার টাকা বেতনের কর্মকর্তা তার স্বামী কীভাবে স্ত্রীকে তিন কোটি টাকা দিতে পেরেছেন?

দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতিটি সদস্যই আসলে একজন অপরাধী হয়ে বড় হতে শেখে। এসব পরিবারের গৃহিণীরা স্বামীর অর্জিত সম্পদ ব্যবহারে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন যে, তাদের মধ্যে কোনো পাপবোধ কাজ করে না, বরং অহমিকা বাড়তে থাকে। সম্পদ গিলতে গিলতে এরাও হয়ে ওঠেন সম্পদখেকো। কার টাকা, কোথা থেকে এলো এই টাকা, কেন এলো এই টাকা এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করার মতো মানসিকতা তাদের থাকে না।

প্রতিটি পেশায় যারা দুর্নীতিবাজ, যারা বেশুমার অর্থ সম্পদের মালিক, তাদের সন্তানরা বাপের সম্পদ শুধু ভোগ করতে শেখেন, কোন প্রশ্ন করতে নয়। কারণ তাদের বাবারাও তো তাদের কাছে সুপারম্যান। বাবা যেভাবে পারেন সেভাবেই টাকা আয় করেন সন্তানকে সুখের সাগরে ডুবিয়ে রাখার জন্য। এই সুখ যে কতটা ‘অ-সুখ’ কতটা ক্ষতিকর তা বোঝার ক্ষমতাও সেই বাবা ও তার সন্তানদের থাকে না। এসব দুর্নীতিপরায়ণ মানুষের ছেলেমেয়েই একদিন বিদেশে পড়তে যায়, সেখানে বাড়ি-গাড়ি কিনে বসবাস করতে শুরু করেন। আর বউরা আরাম-আয়েশে বেগমপাড়ার মতো জায়গায় থাকতে শুরু করেন।

যতদিন অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তিটি কোন বিপদে না পড়েন, ততদিন পরিবারের টনক নড়ে না। যেমন ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারের খুন হওয়ার পর মুষড়ে পড়েছেন তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। নৃশংসভাবে বাবার খুন হওয়ার বিষয়টি মন ভেঙে দিয়েছে তার। তাই তো হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই বাবার কথা স্মরণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একের পর এক স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি।

স্ট্যাটাসগুলোতে বারবার বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন এবং বাবার হত্যার বিচার দাবি করেছেন। অথচ বাবার ব্যবসা, অর্থ ও ক্ষমতার উৎস সম্পর্কে কি মেয়ে ও তার পরিবার জানতো না? বাবার সম্পদ ও ভালোবাসা তারা উপভোগ করেছেন, কিন্তু বাবার অবৈধ ব্যবসা নিয়ে কেউ কি কোনোদিন কথা বলেছেন? বাবাকে থামানোর চেষ্টা করেছেন? পরিবার যদি সম্মিলিতভাবে শুরুতেই সতর্ক করতো বা থামানোর চেষ্টা করতো, তাহলে হয়তো এমপি আনারকে এ মর্মান্তিক মৃত্যুর ভেতর দিয়ে যেতে হতো না।

একজন অপরাধীর অর্থ-বিত্তের সুখের সাথে পরিবারের সদস্যরা এমনভাবে জড়িয়ে পড়েন যে তারা আর সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারেন না। এই জীবনে অভ্যস্ত হতে হতে তারাও ভোগবাদী হয়ে ওঠেন। কারণ বাবার অবৈধ উপার্জনের বড় বাড়িতে তারা থাকেন, দামি গাড়িতে চড়েন, বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় খানাপিনা করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেড়াতে যান এমনকি উচ্চশিক্ষিত হওয়ার তকমা অর্জন করেন এই টাকায়। এদের কাছে এদের ‘দূষিত চরিত্র’র বাবা এতটাই সুপারম্যান, যারা চাইলে সন্তানকে আকাশের চাঁদও এনে দিতে পারেন। এই চাঁদ আনতে গিয়ে তারা যে পথ অনুসরণ করেন, তা ঘৃণিত।

আমাদের অনেকের বাবাই হয়তো আকাশের চাঁদ এনে দিতে চাননি বা পারেননি। কিন্তু যা দিয়েছেন, সেটাইবা কম কী। যেমন আমার বাবা একজন উদারমনা, সৎ ও ভালো মানুষ ছিল। জীবনে শত দুঃখ কষ্টের মধ্যেও কীভাবে মাথা উঁচু করে চলা যায়, হাসিখুশি ও সুখে থাকা যায়, এই মন্ত্র তিনি জানতেন এবং সেটাই আমাদের শিখিয়েছেন। সারাটা জীবনে যা আয় করেছেন, তা খুব বেশি নয়। কিন্তু সেই টাকা এতটাই যথেষ্ট ছিল যে আমাদের বৃহৎ পরিবার এই ঢাকা শহরে খেয়ে-পরে, পড়াশোনা করে ও আনন্দ নিয়ে বেঁচে ছিলাম, বেঁচে আছি।

সেই ৭০ থেকে ৯০ এর দশক পর্যন্ত আমাদের জীবনযাপন এতটাই সাদামাটা ছিল যে মাঝেমধ্যেই আমরা সামান্য অস্থিরতা প্রকাশ করতাম। আব্বা বড় পদে আসীন হওয়ার পরেও কেন আমাদের এই সাদামাটা জীবন? ঘরে একটাই পর্দা, সোফাটা পুরোনো, টিভিটা সাদাকালো, ফ্রিজটা সপ্তাহান্তে নষ্ট হয়? কিন্তু কেন এই জীবন আমাদের? আব্বাকে যদি প্রশ্ন করতাম এত অল্পতে তুমি সুখী থাকো কেমন করে? আব্বা বলতো সুখী হওয়ার সবচেয়ে বড় ওষুধ আত্মার শান্তি। কার কী আছে, এটা নিয়ে না ভেবে তোর কী আছে, তাই নিয়ে ভাব। দেখবি ভালো লাগবে। কত মানুষ অসুস্থ, কত মানুষের একবেলা খাবার জোটে না, কত মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই, পরনে শতছিন্ন কাপড়, কত মানুষের সন্তান নাই কিংবা প্রতিবন্ধী, অসংখ্য মানুষ শিক্ষার আলো পায় না। তোমরা তো এই মানুষগুলোর চাইতে ভালো আছ, তাহলে দুঃখ কোথায়? আল্লাহর কাছে শোকর কর।

সাংবাদিক ও শিক্ষক মুনীর হাসানের ফেসবুক স্ট্যাটাসে দার্শনিক মন্টেকিউইয়ের একটি বাণী পড়ে আমার সুপারম্যান বাবার কথা মনে হলো। মন্টেকিউই ৩০০ বছর আগে বলেছেন, ‘তুমি যদি শুধু সুখী হতে চাও তাহলে সহজেই হতে পারবে। কিন্তু আমরা চাই অন্যদের চেয়ে বেশি সুখী হতে যা সবসময় কঠিন। কারণ অন্যরা যত সুখী আমরা তাদের তার চেয়ে বেশি সুখী মনে করি”।

আমাদের দেশে বিভিন্ন সেক্টরের যারা এলেমদার চোর-বাটপার আছেন, তারা কিন্তু সবাই ম্যাজেশিয়ানও বটে। হঠাৎ করে এই লুটেরাদের আবির্ভাব ঘটছে, তাদের নিয়ে আলোচনা ডালপালা মেলতে না মেলতেই এরা হুট করেই আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছেন। সেই ‘সুপারম্যান’ বাবারা কেমন করে, কার হাত ধরে, কীভাবে বা কোন চ্যানেলে তারা পগারপাড় হচ্ছেন, তা কেউ বলতে পারছে না। এমনকি এসব দুর্নীতিবাজের অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানাতে পারছেন না স্বয়ং পুলিশ কর্মকর্তারাও। চোর পালিয়ে যাওয়ার পর অকারণেই দুদক নড়েচড়ে বসছে বলে শোনা যাচ্ছে।

মতিউর, বেনজীর আহমেদের মতো ‘সুপারম্যান বাবা’ দের অবৈধ আয় ও সম্পত্তির হিসাবও জনগণকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। একে একে বের হয়ে আসছে এসব চোর-বাটপারদের রূপকথার গল্পের মতো সম্পদের পাহাড় গড়ার কথা। অবাক হয়ে যাই এই ভেবে যে একটি দেশের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পদে এমন সব বাটপাররা বসে আছে, যারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। যাদের কখনই বিচারের আওতায় আনা যায় না।

এই দেশে দুর্নীতিবাজ এমন লোকের সংখ্যা বাড়ছে এবং তাদের দুর্নীতি, লুটপাট ও টাকা পাচারের কারণে কষ্ট পেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অথচ এই দুর্নীতিবাজ লোকটার আয়টা হালাল কি না, এটা নিয়ে তার পরিবার, আত্মীয়, প্রতিবেশী, সহকর্মী কেউ কোনো প্রশ্ন করে না, বরং সবাই সেটা এনজয় করেন। আমরা সবাই সাধারণত সেইধরনের বন্ধু ও আত্মীয়কে নিয়ে গর্বও করি, সবার কাছে পরিচয় দেই। সমাজে এসব মানুষ ও ১৫ লাখ টাকা দামের খাসি কেনা তাদের সন্তানরা আদৃত ও সম্মানিত হন।

কেউ যদি দুর্নীতি ও অনিয়ম করে সম্পদ গড়েন তাহলে সেই টাকার উৎস নিয়ে প্রথমে তার পিতামাতা, স্ত্রী ও সন্তানকে প্রশ্ন তুলতে হবে। শুধু সরকারি চাকরিজীবী নন, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, বিচারক, সাংবাদিক, শিক্ষক, উপাচার্য, প্রকৌশলী, বেসরকারি চাকরিজীবী কিংবা যেই হোন না কেন, তার সম্পদের একটা বৈধ উৎস থাকতে হবে। আমার-আপনার বাবা, ভাই বা পরিবারের অন্য সদস্য যদি অঢেল সম্পদের মালিক হন বা বিলাসী জীবন বেছে নেন, তবে তো তাকে সন্দেহ করাই উচিত।

যার টাকা আছে, তাকেই সবাই কদমবুচি করেন এবং সুপারম্যানের আসনে বসান। তিনিই হন ব্যাংকের পরিচালক, মসজিদ কমিটির সভাপতি, সমাজের মোড়ল, এতিমখানার পরিচালক এবং আরো অনেক কিছু। পদ ও পদবিতে ভরিয়ে দেওয়া হয় তাদের। অথচ একটা সময় ছিল যখন অসৎ মানুষের সাথে কেউ মিশতে চাইতেন না, বাঁকা চোখে দেখতেন। কিন্তু এখন ঠিক উল্টোটাই দেখতে পারছি। জানি না রাষ্ট্র ব্যবস্থা কবে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে, কবে পরিবার ও সমাজ তাদের প্রশ্ন করবে?

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।

Print Friendly, PDF & Email