লোকসানেই ছুটছে ম্যাংগো স্পেশাল, ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বাড়তি পথ

প্রকাশিতঃ 8:37 am | June 13, 2024

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

আম পরিবহনের জন্য প্রতিবারের মতো আবারও চালু হয়েছে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন। রাজশাহী থেকে ঢাকা কেজিপ্রতি আম পরিবহনে খরচ দেড় (১.৫০) টাকা। এরপরও সাড়া নেই ব্যবসায়ীদের।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, রেলকে ডাকবিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজিটাল সেবা দিতে না পারলে আম পরিবহনে আগ্রহী হবেন না ব্যবসায়ীরা। প্রতিবছর ম্যাংগো ট্রেনে আয়ের চেয়ে ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি। নতুন করে বেড়েছে পথ। আগে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে ট্রেনটি পরিচালনা করা হলেও এখন হচ্ছে পদ্মা সেতু দিয়ে। এতে বেড়েছে ৪৯ কিলোমিটার পথ। ফলে নতুন করে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ ৪৯ কিলোমিটার পথ। এ পথ পাড়ি দিতে বাড়তি খরচ হচ্ছে।

রেলওয়ের তথ্যমতে, আম পরিবহনে সংকট কাটাতে ২০২০ সাল থেকে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন সার্ভিস চালু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় এবারও আম নিয়ে রহনপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী হয়ে ম্যাংগো ট্রেন ছুটছে ঢাকার উদ্দেশ্যে।

গেল বছর বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে ম্যাংগো ট্রেন চলাচল করায় রহনপুর থেকে ঢাকার দূরত্ব ছিল ৩৪৬ কিলোমিটার আর চলতি বছর পদ্মা সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচলে দূরত্ব বেড়েছে ৪৯ কিলোমিটার। এতে প্রতিদিন রেলকে বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে এক লাখ ২৭ হাজার টাকা।

আগে ট্রেনটি বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে ৩৪৬ কিলোমিটার পাড়ি দিতে খরচ হতো ৮ লাখ ৯৬ হাজার ৪৩২। পদ্মা সেতু দিয়ে এই পথ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯৫ কিলোমিটারে। এতে খরচ হচ্ছে ১০ লাখ ২৩ হাজার ৮৪০ টাকা। ফলে পদ্মা সেতু দিয়ে ট্রেন ঢাকায় নিয়ে বাড়তি খরচ হচ্ছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৮ টাতা। বাড়তি ৪৯ কিলোমিটার পাড়ি দিতে প্রতিবার খরচ হচ্ছে ৭৭ হাজার ২০৪ টাকা। ট্রেনটি ফিরে আসতেও সমপরিমাণের খরচ হচ্ছে।

এদিকে ট্রেনটি চালুর পর থেকেই গুনছে লোকসান। ২০২০ সালে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন চলাচল করেছে ৪৭ দিন। আম পরিবহন করেছে ১১ লাখ ৯৯ হাজার ৫৯ কেজি। এতে আয় হয়েছে ১৩ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩৬ টাকা। আর ব্যয় হয়েছে ৫৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ২০২১ সালে ট্রেনটি চলাচল করেছে ৪৯ দিন। আম পরিবহন করেছে ২২ লাখ ৯৯ হাজার ৯২০ কেজি। এতে আয় হয়েছে ২৬ লাখ ৩০ হাজার ৯২৮ টাকা। ব্যয় হয়েছে ৫৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ২০২২ সালে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন আম পরিবহন করেছে এক লাখ ৭৮ হাজার ৭৭৮ কেজি। সেখানে আয় হয়েছে দুই লাখ ১২ হাজার ১৭৪ টাকা। ব্যয় ১২ লাখ ৪০ টাকা।

সর্বশেষ ২০২৩ সালে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন আম পরিবহন করেছে ১২ লাখ ৭ হাজার কেজি। এতে আয় হয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫০২ টাকা। আর ব্যয় হয়েছে ১৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা। অর্থাৎ গত চার বছরে ট্রেনটি আয় করেছে ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ১৪০ টাকা। আর ব্যয় এক কোটি ৪৭ লাখ ২২ হাজার টাকা। দিন শেষে রেলের লোকসান এক কোটি ৮২ হাজার ৮৬০ টাকা।

এদিকে ১৭৩ টন ধারণক্ষমতা ট্রেনে প্রথম দিনে আম গেছে মাত্র সাড়ে ৪ টন। প্রতি কেজি আম পরিবহনে খরচ ১ টাকা ৪৭ পয়সা। এরপরও সাড়া নেই ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ সুযোগ-সুবিধা না বাড়ালে এ পথে ব্যবসা সম্ভব নয়। এরপরও রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, ব্যবসায়ীদের আগ্রহী করতে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

রাজশাহী নগরীর আমচাষি আনোয়ার আলী বলেন, কুরিয়ার সার্ভিসে বেশি ভাড়া হলেও আমরা ট্রেনের থেকে কুরিয়ার সার্ভিসে আম বুকিং দিতে বা পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ কুরিয়ার সার্ভিস কাস্টমারদের কাছে পৌঁছে দেয় পণ্যগুলো। কিন্তু স্টেশনে গিয়ে আম পড়ে থাকলেও তথ্য দেওয়ার কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউ জানায়ও না যে আমটি পৌঁছে গেছে। স্বাভাবিকভাবে ভোগান্তির কারণেই ব্যবসায়ীরা আগ্রহী নয়। কম টাকা হলেও আগ্রহী নয়। বেশি টাকা হলেও কুরিয়ারই ভালো।

রাজশাহীর বাঘার আমচাষি এনামুল হক বলেন, ট্রেনে করে আম পাঠালে আমগুলো হয় কমলাপুরে, না হয় বিমানবন্দর স্টেশনে রাখতে হবে। কিন্তু সেখান থেকে নিদিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার বিড়ম্বনায় পড়তে হয় গ্রাহকদের। যার ফলে তারা ট্রেন নয় কুরিয়ার সার্ভিসকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।

তবে ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এ খাত আরও বেশি লাভজনক করতে রেলকে ডাকবিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। সেই সঙ্গে রেলকে আরও বেশি পেশাদারত্ব দেখাতে হবে।

কথা হয় রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকুর সঙ্গে। তিনি বলেন, স্পেশাল ট্রেনে করে আম পরিবহন নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। তবে ব্যবসায়ীরা এটা থেকে তেমন সুফল পান না। কারণ এটি ডোর টু ডোর সার্ভিস দেয় না। আমাদের ডাকবিভাগের অনেক গাড়ি আছে। তাদের ডিজিটাল সিস্টেমও আছে। তারা যদি আন্তঃবিভাগীয় মিটিং করে আমগুলো ট্রেনে পরিবহনের পর আবার ডোর টু ডোর পরিবহন করে তবেই এটি লাভজনক হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও এতে আগ্রহ দেখাবেন।


তবে, রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেনের সেবা আম ব্যবসায়ীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করছে রেল বিভাগ।

বাংলাদেশ পশ্চিমাঞ্চল রেলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ ভুঁঞা বলেন, ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেনের প্রচারের জন্য রেলমন্ত্রী রাজশাহী এসেছিলেন। পাশাপাশি প্রচারণার জন্য গত এক মাস ধরে কাজ চালাচ্ছেন রেলওয়ের একটি টিম। আশা করি, দ্রুতই ব্যবসায়ীদের সাড়া পাবো।

তিনি জানান, যেহেতু বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে একটি মাত্র ট্রাক। তাই এটিকে পদ্মা সেতু দিয়ে পাঠানো হচ্ছে। এতে ঈদে যাত্রীদের চাপ কমাতে ও শিডিউল বিপর্যয় কম হবে। তাই পদ্মা সেতুর পথ ব্যবহার করছেন তারা।

তিনি আরও বলেন, এখানে লোকসান নেই। এটি জনস্বার্থের একটি উদ্যোগ। আমরা চাই জনগণ যাতে এখান থেকে উপকৃত হয়। এ জন্যই প্রতিবছর জনগণের উপকারের কথা চিন্তা করে চালু করা হয়। তবে আমরা অচিরেই এটি ব্যবসায়ীদের আস্থার প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলতে পারবো।

কালের আলো/ডিএইচ/কেএ

Print Friendly, PDF & Email