ক্রিকেট বিশ্বকাপে চাই ভয়ডরহীন লড়াই

প্রকাশিতঃ 11:10 am | May 21, 2024

প্রভাষ আমিন:

বাংলাদেশের মানুষ খেলা প্রিয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, খেলাধুলা নিয়ে এই উপমহাদেশের মানুষের আবেগ একটু বেশিই। অস্ট্রেলিয়ান একজন তারকা ক্রিকেটার সে দেশে আরামে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। কিন্তু বাংলাদেশ বা ভারতে রাস্তায় নামলে তাকে ঘিরে ভিড় জমে যাবে।

ফুটবলে বাংলাদেশের বলার মত কোনো সাফল্য নেই। বিশ্বমঞ্চে তো নয়ই, আঞ্চলিক ফুটবলেও আমাদের অবদান সামান্যই। কিন্তু ফুটবলের ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ-উত্তেজনার শেষ নেই। একসময় ঘরোয়া ফুটবল নিয়ে যে পরিমাণ মাতামাতি হতো, তা এখনকার প্রজন্ম বিশ্বাসই করবে না। আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ গোটা দেশ দুই ভাগ হয়ে যেতো। স্টেডিয়ামে থাকতো উপচেপড়া ভিড়।

খেলার দুদিন আগে থেকে সংবাদপত্রের প্রথম পাতা দখল করে নিতো ফুটবল। খেলার পর গুলিস্তান পরিণত হতো রণক্ষেত্রে। ক্রিকেট এসে ফুটবলকে আড়াল করেছে বটে। কিন্তু ফুটবল এখনও রয়ে গেছে আমাদের রক্তে। চারবছর পরপর বিশ্বকাপ এলেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায় ভাগ হয়ে যায় বাংলাদেশ। এখনও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম রাত জেগে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, লা লীগ, বুন্দেসলিগার খেলা দেখে।

আমাদের ছেলেবেলায় ক্রিকেট ছিল অভিজাত মানুষের খেলা। আমরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফলো করতাম বটে, কিন্তু বাংলাদেশ কখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রিকেট খেলবে, এটা আমাদের কল্পনার সীমানায়ই ছিল না। আসলে শুধু ক্রিকেট নয়, নানা অর্জন এখন আমাদের বিশ্বে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু আমাদের ছেলেবেলাটা ছিল হীনমন্যতার। পরপর দুটি সামরিক শাসন আমাদের দমিয়ে রেখেছিল। তখন বাংলাদেশ বিশ্বে শিরোনাম হতো ঝড়-জলোচ্ছ্বাস-বন্যার কারণে। বাংলাদেশের বাজেট ছিল বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর। তাই বিশ্বমঞ্চে কিছু করার কথা ভাবারই সাহস ছিল না।

১৯৭৯ সালে আইসিসি ট্রফিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পথচলা শুরু। তবে ১৯৯৭ সালে আইসিসি শিরোপা জয়ের মাধ্যমেই প্রথম নিজেদের জানান দেয়। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে বাংলাদেশ ১৯৯৯ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়। কোনো একটা ডিসিপ্লিনে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলছে, এই ভাবনাটাই রাতারাতি বাংলাদেশে ক্রিকেটের জোয়ার এনে দেয়। আর প্রথম বিশ্বকাপেই শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বকেই জানান দেয়, বাংলাদেশ আসছে।

বিশ্বকাপ সাফল্যের জোয়ারে পরের বছর মানে ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে যায় বাংলাদেশ। ১৯৭৯ থেকে ধরলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বয়স ৪৫ বছর, ১৯৯৭ ধরলে ২৭ বছর। এই সময়ে বাংলাদেশের টুকটাক অনেক সাফল্য আছে। কিন্তু র্যাঙ্কিংএ আমরা এখনও তলানিতেই। বাংলাদেশের প্রথম সুপারস্টার মোহাম্মদ আশরাফুলের বিদায়টা হয়েছে বেদনাদায়ক।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাইনবোর্ড বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান এখনও খেলছেন। মাশরাফি, তামিম, মুশফিকরাও অনেক আনন্দময় স্মৃতি উপহার দিয়েছেন। কিন্তু মানতেই হবে ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের যতটা আবেগ, সেই তুলনায় আমাদের অর্জন সামান্যই। আমাদের তিন প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা বিশ্বকাপ জিতলেও আমরা এখনও সেই সম্ভাবনা জাগাতে পারিনি। ক্রিকেটে পুচকে আফগানিস্তানও আমাদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। ক্রিকেটে আমাদের অর্জন আমাদের আবেগের সমান্তরাল নয়।

তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটের মধ্যে ওয়ানডেতে আমাদের কিছু সাফল্য থাকলেও টেস্ট খেলাটা আমরা এখনও শিখে উঠতে পারিনি। আর যে ফরম্যাটে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা ছিল, সেই টি-২০তে আমাদের পারফরম্যান্স সবচেয়ে বেশি খারাপ। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমরা আরেকটি টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছি। ১৮ কোটি মানুষের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ দল উড়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। ১-২৯ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে বসবে টি-২০ বিশ্বকাপের নবম আসর। বাংলাদেশের গ্রুপে আছে শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস ও নেপাল।

বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচক, কোচ, অধিনায়ক কেউই বড় কোনো স্বপ্নের কথা বলেননি। ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়েই এগুতে চান তারা। সবার কথায় মনে হচ্ছে প্রথম পর্ব পেরুতে পারলেই আমরা খুশি। তবে সেই কাজটাও সহজ নয়। প্রথম পর্ব পেরুতে হলে নেদারল্যান্ডস, নেপালকে তো হারাতে হবেই, শ্রীলঙ্কা বা দক্ষিণ আফ্রিকাকেও হারাতে হবে। কাজটা অত সহজ নয়। আরো অনেকের মত আমিও বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্ধ অনুরাগী। শেষ বল পর্যন্ত আশা ছাড়ি না। কিন্তু বাস্তবতা দেখে বুঝি, বেশি আশা না করাই ভালো। তাতে আশাভঙ্গের বেদনা বাড়বে।

প্রধান নির্বাচক, কোচ, অধিনায়কের মত আমরাও জানি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ আহামরি কিছু করে ফেলবে না। প্রথম রাউন্ড টপকাতে পারলেই আমরা খুশি। তবে আমার একটাই চাওয়া, আমরা যেন হারার আগেই হেরে না যাই। ক্রিকেটারদের কাছে আমার ব্যক্তিগত চাওয়া হলো, আমরা যেন সাহসের সাথে লড়াই করি, ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলি।

গত ১৪ মে প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ লিপু টি-২০ বিশ্বকাপের জন্য ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করেছেন। দলে আসলে কোনো চমক নেই। বাংলাদেশের যে পাইপলাইন তাতে চমকের সুযোগও নেই। ইনজুরি থেকে ফিরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে ৮ উইকেট পেয়েও দলে জায়গা পাননি সাইফউদ্দিন। একই সিরিজে ২ ম্যাচে ১ উইকেট পাওয়া তানজিম হাসানের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও যা কিছু আলোচনা।

সাইফউদ্দিন থাকতে পারতেন। তবে তাতে যে বিশাল কিছু হয়ে যেতো তেমন নয়। অলরাউন্ডার মিরাজ দলে থাকতে পারতেন কিনা, তা নিয়েও কেউ কেউ কথা তুলেছেন। ব্যস এটুকুই। তার মানে বাংলাদেশ আসলে তার সর্বোচ্চ দলটা নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র গেছে। ভারত বা অস্ট্রেলিয়ার বাদ পড়াদের নিয়ে দল করলেও সেটা বিশ্বকাপে ভালো লড়াই করতে পারবে। সেখানে আমাদের ১৫ জনের দল বানাতেই টানাটানি লেগে যায়।

দল ঘোষণায় আসল চমক আসলে তাসকিন। ইনজুরির কারণে যার বিশ্বকাপ খেলাই কিছুটা অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা, তাকে দেয়া হয়েছে সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব। এটা ঠিক বদলে যাওয়া তাসকিন এখন আমাদের বোলিং বিভাগের নেতা। শুধু নেতা নয়, আমাদের সাহস। আমাদের বিশ্বকাপ স্বপ্নের অনেকটাই নির্ভর করছে তাসকিনের সুস্থতার ওপর।

বিশ্বকাপের আগে দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৪-১এ সিরিজ জয়কে অনেকে দারুণ প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচনা করছেন। কিন্তু আমার তেমন মনে হয় না। জিম্বাবুয়ের মত দুর্বল দলকে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু আমরা খুব রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে সিরিজ জয় নিশ্চিত করেছি। টসে জিতে টি-২০তে বোলিং নেয়া মানেই কোনোরকমে মান বাঁচানোর চেষ্টা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যে পারফরাম্যান্স, বিশ্বকাপে তেমনটা হলে আমাদের ভরাডুবি ঘটবে। টি-২০ মূলত ব্যাটসম্যানদের খেলা। কিন্তু আমাদের পুরো ব্যাটিং বিভাগই ফর্ম হারিয়ে খুঁজছে। অধিনায়ক শান্ত সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারছেন না।

লিটন দাস দারুণ প্রতিভাবান সন্দেহ নেই। ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট’ এই যুক্তি দিয়েও লিটনের সাম্প্রতিক ব্যর্থতাকে ব্যর্থতাকে আড়াল করা যাবে না। সৌম্য সরকার প্রতিভাবান সন্দেহ নেই। কিন্তু অধারাবাহিক। কোচ হাতুরুসিংহের স্নেহের জোয়ারে আবার ফিরেছেন জাতীয় দলে। ওপেনার তানজিদ হাসান আর মিডলঅর্ডারের তাওহিদ হৃদয় ছাড়া কেউ আসলে ফর্মে নেই।

একের ভেতরে দুই সাকিব আল হাসান বরবরই বড় আসরে আমাদের মান বাঁচান। ৩৮ বছর বয়সে দলে ফিরে আসা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদও ফাইটার হিসেবে দলে সাহস জোগাবেন। জাকের আলী অনিক বা রিশাদ হোসেনের হাতেও বড় শট খেলার সাহস আছে। তবে ব্যাটিং বিভাগ পুরো ফর্মে থাকলেও বিশাল কিছু হওয়ার সুযোগ কম।

আমাদের ব্যাটসম্যানদের স্ট্রাইক রেট ১৩০এর নিচে। সেখানে এখন ১৫০-৬০ স্ট্রাইক রেটের ব্যাটসম্যানরাও অনেক দলে সুযোগ পান না। বাংলাদেশ এখনও ১৪০-৫০ করতে পারলেই খুশি। কিন্তু টি-২০র রান এখন ১৮০র ঘরে উঠে গেছে। ব্যাটসম্যানরা যাই করুক, বোলাররা এসে মান বাঁচিয়ে দেন। তাসকিন, মুস্তাফিজ, সাকিবরাই আসলে আমাদের ডিফেন্ড করেন।

এতক্ষণ পরে মনে হতে পারে, আমি বুঝি হতাশা ছড়াচ্ছি। আসলে আমি বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি। আগেই যেমনটি বলেছি, আমি আসলে আশাবাদী সমর্থক। শেষ বল পর্যন্ত হাল ছাড়ি না। আগে আমরা সম্মানজনক পরাজয়ের জন্য মাঠে নামতাম। এতদিন পরও সেই বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া দুঃখজনক।

প্রধান নির্বাচক, কোচ, অধিনায়কের মত আমরাও জানি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ আহামরি কিছু করে ফেলবে না। প্রথম রাউন্ড টপকাতে পারলেই আমরা খুশি। তবে আমার একটাই চাওয়া, আমরা যেন হারার আগেই হেরে না যাই। ক্রিকেটারদের কাছে আমার ব্যক্তিগত চাওয়া হলো, আমরা যেন সাহসের সাথে লড়াই করি, ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলি।

লেখক : বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ।

Print Friendly, PDF & Email