বাজারে শৃঙ্খলায় গুরুত্ব বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীর সমন্বিত উদ্যোগে ফিরবে স্বস্তি

প্রকাশিতঃ 9:19 pm | March 11, 2024

কালের আলো রিপোর্ট:

নিত্যপণ্যের বাজারে হাতবদলের ফলেই বেড়ে যায় প্রতিটি পণ্যের দাম। আর এর প্রভাব পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। তাদের স্বস্তি দিতেই বাজারে শৃঙ্খলা আনতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু এমপি। একে অপরকে দোষারোপের চিরায়িত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নিজের কাঁধেই দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন তিনি। বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করেছেন। নিয়মিত বাজার পরিদর্শনে ছুটছেন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে। কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনায় জোর দিয়েছেন।

বাজার শৃঙ্খলায় পরিবর্তন ঘটাতে বাজার মনিটরিং অব্যাহত রাখার মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের চক্র ভেঙে দিতে চাচ্ছেন শেখ হাসিনা সরকারের এ তরুণ তুর্কি। নিশ্চিত করার প্রয়াস নিয়েছেন ভোক্তাদের যৌক্তিক মূল্যে পণ্য কেনায়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান বাড়িয়েছেন। রোববার (১০ মার্চ) রাত থেকেই রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ প্রতিটি বাজারে তৎপরতা চালাচ্ছে অধিদপ্তরের বিশেষ টিম। প্রতিটি দোকানে মূল্য তালিকা রাখা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ক্রেতাদের যাচাই করে পণ্য কিনতে উৎসাহিত করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ব্যবসায়ীরা অসাধু পন্থা বেছে নিলে শাস্তির আওতায় আনতে উদ্যোগী হয়েছেন।

আগের দিনের মতো সোমবারও (১১মার্চ) বাজার পরিদর্শনে বের হন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু। এদিন রাজধানীর শান্তিনগর বাজার পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় প্রতিমন্ত্রী বাজারের রূপচাঁদা তেলের দামে কারসাজি হাতেনাতে ধরেন। সরকার নির্ধারিত ১৬৩ টাকার পরিবর্তে একটি দোকানে ১৭৩ টাকায় ভোজ্যতেল বিক্রির ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিমন্ত্রী রূপচাঁদা কর্তৃপক্ষকে ডেকে কথা বলে নতুন দামে তাদের তেল সরবরাহ করতে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

পরে প্রতিমন্ত্রী আমিনবাজার কো-অপারেটিভ মার্কেট সোসাইটি লিঃ এর সভাকক্ষে মতবিনিময় সভা করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘রমজানে বাজারে শৃঙ্খলা রাখতে কাজ করছে সরকার। ভোক্তা অধিদপ্তর বিশেষ অভিযান বাড়িয়েছে। পণ্যের দাম বেশি নিয়ে ভোক্তা অধিকারে (১৬১২১) ফোন দিয়ে অভিযোগ করতে পারে। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের লাইসেন্সের আওতায় আনার বিষয়টি প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অনেকের লাইসেন্স নাই, লাইসেন্স ছাড়া পাইকারি ব্যবসা করা যাবে না। উৎপাদক, আমদানিকারক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থা ‘সাপ্লাই চেইন’কে শৃঙ্খল করতে স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে সরকার।’

সভায় রোববার (১০ মার্চ) রাতে কারওয়ান বাজারে অভিযানের অভিজ্ঞতায় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস জানান পণ্যের হাতবদলে কাছাকাছি দূরত্বেও দাম বাড়ানো হচ্ছে।

বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাজারে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকারের চেষ্টাকে ইতিবাচক চোখে দেখতে গণমাধ্যমের প্রতি আকুল আবেদন জানান। পাশাপাশি রাতারাতি সফলতা ব্যর্থতা নিরূপণ না করতেও অনুরোধ জানান। তিনি এ সময় বলেন, ‘আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কৃষিপণ্য উৎপাদক থেকে ভোক্তা, আমদানীকারক থেকে ভোক্তা, মিল মালিক থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে কথা বলছি। সমস্যাটা কোথায়, সবাই কিন্তু যেখানে যাচ্ছি। সেটাই খোঁজার চেষ্টা করছি।’

বিকল্প ব্যবস্থা না করে সাপ্লাই চেইন ভেঙে দিলে সমস্যা আরও বাড়বে বলেও মনে করেন তিনি। রমজানকে কেন্দ্র করে যেসব পণ্যের দাম দ্বিগুণ বেড়েছে সেসব পণ্যের সাপ্লাই চেইন কোথায় থেকে আসে সেগুলো বেশি তদারকি করা হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কোন জায়গা থেকে পণ্যটি রাজধানীর বাজারে আসে, কার মাধ্যমে আসে, সেই বিষয়গুলো শান্তিনগর বাজার পরিদর্শন করে তদারকি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি রমজানকেন্দ্রিক যে পণ্যের চাহিদা থাকে সেই চাহিদাটির আসলে ঘাটতি কোথায় তা খুঁজতে সরেজমিনে গিয়েছি।’

আহসানুল ইসলাম টিটু বলেন, ‘বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের সদিচ্ছার কোন অভাব নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাজারে বড় কোন হাত থাকবে না। এজন্য যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তেলের শুল্ক কমিয়েছেন। এস আলমের চিনির কারখানায় আগুন লাগার পর আমরা প্রতিটি মিলে গিয়েছি যেন অবৈধভাবে চিনির দাম না বাড়ে।’

বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীর অনুরোধ, ‘বাজার থেকে কেউ রসিদ ছাড়া পণ্য কিনবেন না। আমরা কারওয়ান বাজারসহ সকল পাইকারি মার্কেটকে বলব, আপনারা রসিদ ছাড়া কোনো মালামাল বিক্রি করবেন না। তাহলে আমাদের নিরবচ্ছিন্ন যে সরবরাহ সেখানে সমস্যা হয়।’ তিনি জানান, ‘আমরা চেষ্টা করছি আমাদের এই জিনিসগুলো বাস্তবায়ন করতে। এরপর আমরা কঠোর হতে একটুও পিছপা হবো না।’

আহসানুল ইসলাম টিটু সাফ জানিয়ে দেন, ‘ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া কেউ ব্যবসা করতে পারবে না। পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদেরও লাইসেন্স দেওয়া হবে। বিকল্প ব্যবস্থা করে মৌসুমি বা এক রাতের ব্যবসায়ীদের আর ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না।’

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের যতো পদক্ষেপ
আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদের দুই মাস পূর্ণ হয়েছে। শুরুতেই আসন্ন রমজানে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত কঠোর বাজার মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। নিত্যপণ্যের কোনও সংকট নেই। এলসি মীমাংসায়ও কোনও জটিলতা নেই। কাজেই বাজারে কোনও ধরনের সংকট এবং এর ফলে অস্থির বাজার ব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ২১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আন্ত:মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি সভায় অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীকে প্রধান করে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আব্দুর রহমান, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটুকে নিয়ে গঠিত হয় উচ্চ পর্যায়ের কমিটি। কমিটি চাল, সয়াবিন তেল, চিনি ও খেজুরের শুল্ক কমানোর প্রস্তাব পাঠায় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। সরকারের প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই চাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও খেজুরের ওপর শুল্ক কমানোর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরেই এই চার পণ্যের শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় এনবিআর।

এনবিআর সিদ্ধ ও আতপ চাল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়। একই সঙ্গে সিদ্ধ ও আতপ চাল আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বা রেগুলেটরি ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করে। অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে প্রতি মেট্রিক টনে আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১ হাজার টাকা করা হয়েছে। আগে যা ছিল দেড় হাজার টাকা। আর পরিশোধিত চিনি আমদানিতে টনপ্রতি শুল্ক কমিয়ে করা হয়েছে ২ হাজার টাকা, আগে যা ছিল ৩ হাজার টাকা। পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং পাম তেল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। আর খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।

রোজায় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার অভিপ্রায়ে নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত জোগানের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এর অন্যতম হচ্ছে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে ভারত সরকারের কাছে ১ লাখ মেট্রিক টন চিনি এবং ৫০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ সরবরাহের জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর বাইরেও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দৈনিকভিত্তিতে কৃষিপণ্যের বাজারদর প্রকাশ করা হচ্ছে। পবিত্র রমজান উপলক্ষে আমদানি সংশ্লিষ্ট শুল্ক স্টেশনগুলো ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুর দ্রুত খালাসের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কালের আলো/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email