রমজানে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ডিএমপির ‘বিশেষ ব্যবস্থা’: ডিএমপি কমিশনার

প্রকাশিতঃ 5:42 pm | March 11, 2024

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

রমজান মাসে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে বিকাল তিনটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান।

তিনি বলেছেন, রমজান মাসের আমাদের বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে সব বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ট্রাফিক। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। এতে নগরবাসীর সচেতনতা ও সহযোগিতা দরকার। যারা গাড়ি ব্যবহার করছেন, যারা গাড়িতে চড়ছেন এবং যারা রাস্তার আশপাশে ব্যবসা করছেন তাদের সহযোগিতা দরকার। তা নাহলে ৩০৬ বর্গকিলোমিটার জায়গার ভিতরে যেখানে সোয়া ২ কোটি লোক বসবাস করে সেখানে পুলিশ রাতারাতি ট্রাফিক সমস্যা সমাধান করে দিতে পারবে না। তবে আমরা আশাবাদী সকলে যদি সহযোগিতা করেন তাহলে ট্রাফিক সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। আর পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা পুলিশের সহযোগিতায় স্থানীয়ভাবে ট্রাফিক সমস্যা সমাধান করতে পারেন।

সোমবার (১১ মার্চ) দুপুরে ডিএমপি সদরদপ্তরের ৬ষ্ঠ তলার সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘আসন্ন পবিত্র মাহে রমজানে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ব্যাংক, বিপণি বিতান, শপিং মলসমূহের নিরাপত্তা, ভেজাল খাদ্যদ্রব্য ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ সার্বিক নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্তে সমন্বয় সভা হয়। সভা শেষে ডিএমপি কমিশনার এ কথা জানান।

তিনি বলেন, রাস্তায় যারা সংস্কার কাজ করেন; ওয়াসা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ অন্যান্য সংস্থা যে উন্নয়ন কাজ করে থাকেন তারা রমজান মাসে সবার স্বার্থের কথা মাথায় রেখে এসব কাজ বন্ধ রাখবেন। এটা আমাদের প্রত্যাশা। এসব কাজ বন্ধ রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে চিঠি দিয়ে জানাব।

সড়কে ছিনতাই রমজানে মাসে আরও একটি চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, রমজানে মাসে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে আরও একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিভিন্ন শপিংমল ও রাস্তায় এবং ব্যাংকের সামনে থেকে ছিনতাই। এছাড়া অবৈধ মজুদ করে কৃত্রিমভাবে মূল্য বৃদ্ধি এবং খাদ্যদ্রব্যে ভেজালও রমজান মাসে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা সমাধানে পুলিশ ইতোমধ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানে আমাদের পোশাকধারী ও সাদা পোশাকে পুলিশ কাজ করবে।

তিনি বলেন, রমজানে মানুষ যেন বাসায় গিয়ে প্রিয়জনের সঙ্গে ইফতার করতে পারেন সে লক্ষ্যে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি ক্রাইম বিভাগও কাজ করবে। বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত আমাদের বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। একই সময়ে রাস্তায় আমাদের বিশেষ ডিপ্লোমেন্ট থাকবে যাতে করে মানুষ ঘরে গিয়ে ইফতার করতে পারে। মার্কেটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ট্রাফিক সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে আমাদের ট্রাফিক ও ক্রাইমের অফিসাররা।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবৈধভাবে কেউ রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না? জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার বলেন, কেউ যদি কৃত্রিম উপায়ে ও কারসাজি করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে তাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে পুলিশ কাজ করবে।

ঈদের সময় ফাঁকা ঢাকায় ও রমজানে ছিনতাই প্রতিরোধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে? উত্তরে তিনি বলেন, ছিনতাই একটা সমস্যা। রমজান মাসে এই সমস্যা সমাধানে একটি বিশেষ পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। পোশাকধারী পুলিশ ও ডিবি পুলিশ ছিনতাই প্রতিরোধে তারা সবাই তৎপর থাকবে। আমি আশা করি রমজান মাস ও ঈদের পর পর্যন্ত মানুষ স্বস্তি বসবাস করবে।

বেইলি রোডের ঘটনার পর পুলিশ বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে অভিযান পরিচালনা করেছে। রমজান মাসে পুলিশ বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে অভিযান পরিচালনা করবে কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এছাড়া ডিএমপি কমিশনার যেসব দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন-
▶ মহানগরীর সার্বিক নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পবিত্র রমজান উপলক্ষে তিন ধাপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা, পুলিশী টহল জোরদার করা, শপিং মল, স্বর্ণ মার্কেট এবং বাজারসমূহের পৃথক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ইফতারীর পর হতে তারাবী নামাজ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি সংক্রান্তে পিক আওয়ার বিবেচনায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পিক আওয়ারে সন্ধ্যা ছয়টা হতে রাত এগারটা পর্যন্ত) সোয়াট ও বোম্ব ডিসপোজাল টিম স্ট্যান্ডবাই রাখা, মাদকের স্পটসমূহে টহল এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অজ্ঞানপার্টি, মলমপার্টির অপতৎপরতা এবং স্পট চিহ্নিত পূর্বক তা রোধকল্পে পোশাকে ও সাদা পোশাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মার্কেটকেন্দ্রিক এপিবিএন ফোর্স মোতায়েন, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের প্রতি বিশেষ নজরদারি রাখা।

▶ সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং ও সাইবার ক্রাইম সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধ এবং অপরাধী সনাক্তকরণ, গুজব প্রতিরোধে সাইবার পেট্রোলিং অব্যাহত রাখা, কাদিয়ানি ও শিয়া মসজিদের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

▶ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিরসনে ইফতারীর পূর্বে পিক আওয়ারে বিকাল তিনটা হতে রাত সাতটা অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা। ট্রাফিক পিক আওয়ার বিবেচনায় বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। ট্রাফিক পুলিশ এবং থানা পুলিশ যৌথভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনে দায়িত্ব পালন করা।

▶ সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী, ফুলবাড়িয়া ভিত্তিক বিভিন্ন টার্মিনালের পরিবহন মালিক এবং শ্রমিকদের সাথে সভার আয়োজন করা। ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত বিভিন্ন ইন্টারসেকশনের মোড়ে মোড়ে যেন রিক্সা, মোটরসাইকেল, সিএনজি যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যানবাহনের গতি ব্যহত না করে সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকা।

▶ যেসব বাণিজ্যিক ভবনে পার্কিংয়ের সুবিধা আছে তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পাশে সড়কে এক লেনের অতিরিক্ত কোন যানবাহন দাঁড়িয়ে থেকে সড়কের প্রশস্ততা যেন কমে না যায় সে বিষয়ে নজরদারি করা।

▶ প্রধান সড়কে হকাররা যেন কোন অবস্থাতেই তাদের পসরা সাজিয়ে না বসে সে দিকে খেয়াল রাখা। বিভিন্ন টার্মিনাল, মার্কেট, বিপনী বিতানে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খল করার জন্য ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা এবং প্রয়োজনীয় ওয়াচ টাওয়ার রাখা।

▶ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি হ্রাস করতে গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট/ দোকান মালিক সমিতির সাথে সমন্বয় সভা করে মার্কেটের নিজস্ব জনবলের মাধ্যমে নজরদারী বৃদ্ধি করাসহ প্রশিক্ষণ এবং তদারকির ব্যবস্থা করা। প্রতিটি মার্কেট/ দোকানে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপনী যন্ত্র বা ফায়ার বল ইত্যাদি রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

▶ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সিড়িঁতে মালামাল রাখা বা দোকান বসানো থেকে বিরত থাকা এবং প্রয়োজনে সংস্কার করা। জরুরি বহির্গমনের রাস্তা ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত নির্দেশক চিহ্ন ব্যবহার করা। অগ্নি নির্বাপণ মহড়ায় মালিক/ কর্মচারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বৈদ্যুতিক শটসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে রমজানের পূর্বেই বৈদ্যুতিক সংযোগ ও তার পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা।

▶ দোকানে গাদাগাদি করে মালামাল না রেখে একাধিক গোডাউনে মালামাল রাখার ব্যবস্থা করা। গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট/ দোকান মালিক সমিতির মাধ্যমে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও দিন রাত ২৪ ঘন্টা মনিটরিং নিশ্চিতকরণ করা। গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট/ দোকানসমূহে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কিনা এবং সচল আছে কিনা তা যাচাই করা। সিসি ক্যামেরার ডিভিআর সচল আছে কিনা তা যাচাই করা।

▶ সকল ব্যবসায়ী প্রতিনিধিগণ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের বিরুদ্ধে ডিএমপি’র তত্ত্বাবধানে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা।

▶ ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং সংক্রান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, নগদ, ডাচবাংলা মোবাইল ব্যাংকিং ইত্যাদি) কর্তৃপক্ষ/এজেন্ট/ডিস্ট্রিবিউটরদের সাথে টাকা পরিবহন সংক্রান্তে সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিভাগের সমন্বয় সভা করা। শপিং মল ও মার্কেট সমূহে জালনোট সনাক্তকরণ মেশিন স্থাপন করা।

▶ ব্যাংক ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানসমূহে বড় ধরনের লেনদেনের জন্য মানি এস্কর্ট সহায়তা নেয়া। শপিং মল, জুয়েলারী মার্কেট এবং বাজার কেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। শপিং মল, জুয়েলারী মার্কেট ও বাজার কমিটির সাথে বিভাগভিত্তিক সমন্বয় সভা করা। শপিং মল সমূহে অপরাধ প্রতিরোধে গোয়েন্দা বিভাগ কর্তৃক সাদা পোষাকে পুলিশ মোতায়েন করা ও সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা।

▶ প্রতিটি শপিং মলের সামনে ও আশেপাশে কমিউনিটি পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের ব্যবস্থা করা। প্রতিটি জুয়েলারী দোকানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করাসহ এ্যালার্ম সিষ্টেম চালু করা। শপিং মল/মার্কেটসমূহে কর্মরত নারী বিক্রয় কর্মীদের বাড়ী ফেরার পথে রাত্রীকালীন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।

অন্যান্য সেবা প্রদানকারী সংস্থার প্রতি ডিএমপির সুপারিশ-
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং বাড়ানো এবং ব্যবসায়ীদের সাথে সভা করা। রাস্তায় স্ট্রিট লাইট নতুন করে সংযোজন এবং মেরামতের ব্যবস্থা করা। রাস্তায় বা ফুটপাতে ইফতার সামগ্রী বিক্রয়ের সময় পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। রমজানে রাস্তা খনন বন্ধ রাখা, পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়মিত রাখা। পাওয়ার স্টেশন ও গ্যাস স্টেশন এর নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা এবং ঢাকা মহানগরী এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।

সমন্বয় সভায় ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ স্পেশাল ব্রাঞ্চ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), ডিজিএফআই, এনএসআই, ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, সিটি-এসবি, পুলিশ সদরদপ্তর, এমআরটি পুলিশ, তিতাস গ্যাস, ঢাকা ওয়াসা, ডিপিডিসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, এফবিসিসিআই, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি, ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতি, ইসলামপুর কাপড় ব্যবসায়ী সমিতি, বাংলাদেশ ডাল ও ছোলার ডাল ব্যবসায়ী সমিতি, পিঁয়াজ ব্যবসায়ী সমিতি, কাওরান বাজার কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতি ও বাংলাদেশ জুয়েলারী সমিতির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/ডিএস/এমএম

Print Friendly, PDF & Email