বিআরটিএর দুর্বলতা চিহ্নিত করে সংস্কার চায় যাত্রী কল্যাণ সমিতি

প্রকাশিতঃ 5:34 pm | February 11, 2024

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে সরকারি উদ্যোগে বিআরটিএর অধীনে প্রাথমিক উৎস থেকে পূর্ণাঙ্গ ডাটা ব্যাংক চালু করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সড়কে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে বিআরটিএর চলমান গতানুগতিক কার্যক্রম অডিট করে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতা সংস্কার করা জরুরি বলেও মনে করে সংস্থাটি।

রবিবার বেলা ১১টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি আয়োজিত ‘এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে সরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক ডাটা ব্যাংক চাই’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এ কথা বলা হয়।

এসময় ২০২৩ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় মাত্র ৭টি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৫৩ হাজার ২০৭ জন আহত রোগী ভর্তির তথ্য তুলে ধরা হয়, যেখানে বিআরটিএর তথ্য বলছে, মাত্র ৭ হাজার ৪৯৫ জন।

আলোচনা সভায় বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো বিআরটিএ সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, বিআরটিএ প্রতিবেদনের সঙ্গে পুলিশের প্রতিবেদন ও যাত্রীকল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবেদনের অমিল রয়েছে। বিআরটিএর সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৩ সালে দেশে ৫ হাজার ৪৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ২৪ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৪৯৫ জন আহত হয়েছেন। পুলিশের প্রতিবেদনে ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৪৭৫ জন নিহত হয়েছেন।”

যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে ২০২৩ সালে ৬ হাজার ২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯০২ জন নিহত, ১০ হাজার ৩৭২ জন আহতের তথ্য রয়েছে।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার গ্লোবাল রোড সেইফটি রিপোর্ট ২০২৩-এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২১ সালে ৩১ হাজার ৫৭৮ জন নিহত হয়েছে। বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার খতিয়ে দেখা ছাড়াই বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার রিপোর্টকে অবাস্তব, যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা নিহত এবং আহতের সংখ্যা কাছাকাছি হওয়ায় বিআরটিএর সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।”

“যাত্রী কল্যাণ সমিতিসহ সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করে, যে কোনো ঘটনায় একজন নিহতের পেছনে ৩ থেকে ১০ জন পর্যন্ত আহত হয়ে থাকে, যা বিআরটিএর রিপোর্টে আসেনি। অন্যদিকে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন তথা সেকেন্ডারি সোর্সের সমপরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের তথ্য বিআরটিএর বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনে তুলে আনতে না পারায় এই রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে”-বলেন মোজাম্মেল।

তিনি বলেন, “প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ না করায় বিআরটিএর মাঠ পর্যায়ে তাদের রিপোর্টের উৎস ও রিপোর্ট তৈরির মেকানিজম সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকায় রিপোর্টে এহেন দুর্বলতা ফুটে উঠেছে বলে পরিবহন সংশ্লিষ্ট ও বুয়েটের দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞরা মনে করে।”

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব আরও বলেন, “বিআরটিএর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৪৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ২৪ জন নিহত, ৭ হাজার ৪৯৫ জন আহত হয়েছে। এ সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিআরটিএ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও এখানে কোনো হাসপাতালের তথ্য নেওয়া হয়নি। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ তাদের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান সঠিক এবং নির্ভুল দাবি করলেও যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল) জরুরি বিভাগে ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ১৪ হাজার ৩৫৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৯ হাজার ৮৭৯ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৯ হাজার ২৯৩ জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৪ হাজার ৭৮৪ জন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ৩ হাজার ৫৬৩ জন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৬ হাজার ৭৪৮ জন, ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ খানপুর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৪ হাজার ৫৮৩ জন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভর্তি হয়েছে। ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দেশের মাত্র এই ৭টি হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ভর্তির তথ্য মিলেছে ৫৩ হাজার ২০৭ জন।”

বিআরটিএর প্রতিবেদনে দেশের একটি বিভাগীয় সদর হাসপাতালে ভর্তিকৃত সড়ক দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যাও সারাদেশ থেকে তুলে আনতে পারেনি দাবি করে তিনি আরও বলেন, “যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সারাদেশে ৬৪টি জেলা সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ জন, ৮ বিভাগে ১০টি বিভাগীয় বড় হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২০ জন করে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী ভর্তি হচ্ছে। সারাদেশে ৮০০০ নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতালের চিত্রও অনুরূপ।”

তিনি বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর ১৫ শতাংশ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। আড়াই থেকে তিন লাখ আহত রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় কী পরিমাণ মারা গেছে তার চিত্র বিআরটিএর রিপোর্টে আসেনি। ফলে বিআরটিএর রিপোর্টে হতাহতের সংখ্যা ও দুর্ঘটনার সংখ্যাতে যে বিভ্রান্তি রয়েছে তা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।”

সভায় বক্তারা বলেন, “গত একদশকে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে ৪৫ লাখে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে ৩০ লাখের বেশি ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা, মোটর রিকশাসহ ছোট ছোট যানবাহন বেড়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেসবিহীন যানবাহনও দিগুণ হয়েছে। কৃষি শ্রমিকেরা বেশি লাভের আশায় ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ছে। এসব কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে।”

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০১২ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ হাজার ৩১৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, যা ২০১৫ সালে ২৪ হাজার ৯৫৪ জনে উন্নীত হয়। ২০২৩ সালের গ্লোবাল রোড সেইফটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহতের সংখ্যা নিহতের প্রায় ৯ থেকে ১০ গুণ। দেশের মাত্র ৭টি হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী ভর্তির চিত্র এহেন হতাহতের সাক্ষ্য দেয়।

সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার দেওয়া তথ্যকে আমলে নিয়ে কাজ করতে বাংলাদেশ সরকারকে আহ্বান জানিয়ে বক্তারা আরও বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা যে রিপোর্টটি দিয়েছে এটা বাংলাদেশের জন্য আলাদাভাবে করা হয়নি, যা সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও একটি বেসরকারি সংস্থা পর্যবেক্ষণে ২০১৬ সালে ১ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ হাজার ৩৬০ জন নিহতের তথ্য পেয়েছে। তখন সরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার প্রতিবেদন অনুসরণ করে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই সড়ক দুর্ঘটনা কমে এসেছে। ২০১০ সালের তুলনায় মৃত্যুর হার কমেছে অন্তত ১০৮টি দেশে। শ্রীলঙ্কা, বেলারুশ, ব্রুনাই দারুসসালাম, ডেনমার্ক, জাপান, লিথুয়ানিয়া, নরওয়ে, রাশিয়া, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভেনিজুয়েলার মতো ১০টি দেশ মৃত্যুর হার অর্ধেকের বেশি কমিয়ে এনেছে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারকে সড়ক নিরাপত্তায় বড় ধরনের অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার ডাটাবেজ সিস্টেম আধুনিকায়নের প্রকল্পও এতে সংযুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি মনে করে, বিআরটিএ প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ডাটা সংগ্রহ করলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টের সমপরিমাণ হতাহত ও দুর্ঘটনার তথ্য উঠে আসবে। কিন্তু বিআরটিএ সেকেন্ডারি সোর্স ব্যবহারের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে পারছে না। ফলে দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে সরকার সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে সরকারি উদ্যোগে বিআরটিএর মাধ্যমে প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ডাটা ব্যাংক চালুর দাবি জানান বক্তারা। একই সঙ্গে ছোট যানবাহন বন্ধ করে নিরাপদ সাশ্রয়ী ও স্মার্ট গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

কালের আলো/এসএইচ/এসবি

Print Friendly, PDF & Email