গঠনমূলক সমালোচনার অনুমতি!

প্রকাশিতঃ 7:31 am | February 06, 2024

প্রভাষ আমিন:

৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে গঠিত হয়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ। এরই মধ্যে গত ৩০ জানুয়ারি বসেছে দ্বাদশ সংসদের অধিবেশনও। ৩০ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী ৫ বছর থাকবে এই সংসদের মেয়াদ। ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তারপর থেকে টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের নবম নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। তবে এরপর থেকে বিএনপি কার্যত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে। তাই আওয়ামী এককভাবে সংসদ, সরকার, রাজনীতি- সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। দশম, একাদশ, দ্বাদশ- প্রতিটি সংসদেই ধাপে ধাপে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ আরো নিরঙ্কুশ হয়েছে। তবে দ্বাদশ সংসদটি হয়েছে অভিনব। দ্বাদশ সংসদে মোট ৫টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি আছেন। এরমধ্যে আওয়ামী লীগের আসন ২২৪টি, জাতীয় পার্টির ১১টি; ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও কল্যাণ পার্টির একটি করে আসন রয়েছে। এছাড়া ৬২ জন স্বতন্ত্র সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। মজাটা হলো, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, কল্যাণ পার্টি- সবাই জিতেছেন আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে, আওয়ামী লীগের ছেড়ে দেয়া আসনে। আওয়ামী লীগও আসন ছেড়েছিল নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী। যে ৬২ জন স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ঘুরেফিরে তারাও অধিকাংশই আওয়ামী লীগ। বিএনপি অংশ না নেয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি করতে আওয়ামী লীগ এবার কিছু আসন উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। তাতেই দলের বিদ্রোহীরা এবার প্রচ্ছন্ন অনুমতি নিয়েই দলের প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ জানাতে মাঠে নেমেছিল। এবার নির্বাচনী মাঠে লড়াইটা হয়েছে মূলত মনোনীত আওয়ামী লীগ আর সমর্থিত আওয়ামী লীগের মধ্যে। তবে সব আসনে স্বতন্ত্র নির্বাচনের সুযোগ ছিল না। আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয়ভাবে ঠিক করে দিয়েছে, কারা স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে পারবে। তাতে আওয়ামী লীগের অনেক মন্ত্রী, এমপি, হেভিওয়েট কেন্দ্রীয় নেতাদের ভরাডুবি ঘটেছে। আওয়ামী লীগের এই অভিনব নির্বাচনী কৌশলের কারণে এবার সর্বোচ্চ সংখ্যক স্বতন্ত্র সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

নির্বাচনের পর একটা নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কারা হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধী দল, ১১ আসনের জাতীয় পার্টি নাকি ৬২ আসনের স্বতন্ত্র- এ নিয়ে দারুণ কৌতূহল সৃষ্টি হয়। চাইলে ৬২ জন স্বতন্ত্র সদস্য মিলে একটা গ্রুপ করে নিজেদের নেতা ঠিক করে বিরোধী দলের আসনে বসতে পারতেন। কিন্তু বিরোধী দল হওয়ার ব্যাপারে স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। তারা বরং সরকারি দলে মিশে যাওয়ার উপায় খুঁজছিলেন। ৬২ স্বতন্ত্র সদস্যের অধিকাংশই যেহেতু আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, তাই তারা বিরোধী দলের আসনে বসে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করতে চাননি। এবার না হয় দলের অনুমতি পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জিতে এসেছেন। কিন্তু দল না চাইলে তো ভবিষ্যতে মনোনয়ন বা নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। তাই তারা আওয়ামী লীগের সাথেই থাকতে চাইছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাদের ইচ্ছায় পূরণ হয়েছে। ৬২ আসনের স্বতন্ত্র নয়, ১১ আসনের জাতীয় পার্টিই বসছে বিরোধী দলের আসনে।

৩০ জানুয়ারি সংসদ অধিবেশনের দুদিন আগে ২৮ জানুয়ারি গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বতন্ত্র সদস্যদের আমন্ত্রণ জানান। ৬২ জন সদস্যই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। লতিফ সিদ্দিকী ও এ কে আজাদ ছাড়া সবাই কমবেশি কথা বলেছেন। ৬২ জন স্বতন্ত্র সদস্য নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০ আসনের ৬টি পেতেন। এ নিয়ে নানা কানাঘুষা, এমনকি বাণিজ্যের খবরও ভাসছিল বাতাসে। কিন্তু গণভবনে স্বতন্ত্র সদস্যরা তাদের প্রাপ্য সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের ক্ষমতা শেখ হাসিনার হাতে অর্পণ করেছেন। তার মানে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০ আসনের মধ্যে ৪৮টি আসনেই আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেবে। বাকি দুটি আসন পাবে জাতীয় পার্টি। সে দুটি আসনও নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগের ইচ্ছার বাইরে হবে না। তার মানে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের পর দ্বাদশ সংসদে আওয়ামী লীগের আধিপত্য আরো একচ্ছত্র হবে।

গণভবনে স্বতন্ত্র সদস্যরা অধিকাংশই নিজেদের আওয়ামী লীগের লোক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা সংসদে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভূমিকা রাখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগের দলীয় ও স্বতন্ত্র সব সংসদ সদস্যই আমার। একটা ডান হাত, অন্যটা বাম হাত। বলা যায়, এ-টিম ও বি-টিম। তবে সংসদে তিনি সবাইকে স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, সংসদে ক্ষমতাসীন দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে স্বতন্ত্র থাকার লাভ আছে। কারণ, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা বিলের ওপর সমালোচনা বা দোষ-ত্রুটি তুলে ধরেন না। স্বতন্ত্র সদস্যরা এই কাজ ভালোভাবে করতে পারবেন। এতে দেশও লাভবান হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের স্বতন্ত্র সদস্য সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামান বিএনপি নেতা। তিনি তার বক্তৃতার সেটি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘আমি তো আপনার দলের নই।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তুমিও আমার’। এরপর একরামুজ্জামান বলেন, ‘আমি তো বিএনপি থেকে এসেছি।’ তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সবই জানি। সবাই আমার লোক।’ এভাবেই সংসদের ওপর শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ হয়েছে।

তবে কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদের জন্য বিরোধী দল, বিরোধী মত, বিরোধী কণ্ঠ লাগে। সরকারের ভুল ধরিয়ে দেয়ার জন্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিরোধী দল লাগে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একাই কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন প্রথম সংসদ। রুমিন ফারহানা আর হারুন অর রশিদ মাতিয়ে রেখেছিলেন একাদশ সংসদ। এবার তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। স্বতন্ত্র সদস্য যেভাবে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছেন, তাতে দ্বাদশ সংসদ কতটা প্রাণবন্ত হতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।

২৮ জানুয়ারি গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে স্বতন্ত্র সদস্যদের বৈঠকের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘স্বতন্ত্ররা স্বতন্ত্রই থাকবেন। তবে তারা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারবেন।’ তার মানে একটা বিষয় পরিষ্কার, স্বতন্ত্ররা যেভাবে আওয়ামী লীগের ইচ্ছায় এবং অলিখিত অনুমতি নিয়ে নির্বাচন করার এবং নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। সংসদেও তাদের ভূমিকা হবে নিয়ন্ত্রিত। সরকারি দলের অনুমতি নিয়ে তাদের সুবিধা অনুযায়ীই সংসদে কথা বলতে হবে। চাইলে স্বতন্ত্র সদস্যরা নিজেদের মত ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু তারাই সেটা চাইছেন না। এখন তাদের ভূমিকা রাখার জন্য সরকারি দলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। তারা সমালোচনা করতে পারবেন, তবে ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় সেটা হতে হবে ‘গঠনমূলক’। আমার ধারণা নির্বাচনে যেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরির জন্য স্বতন্ত্রদের জন্য নির্বাচন উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল, সংসদকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর দেখানোর স্বার্থে হয়তো স্বতন্ত্র সদস্যদের ভূমিকা রাখার, সমালোচনা করার সুযোগ দেয়া হবে। তবে নিশ্চয়ই সেটা নিয়ন্ত্রিত হবে, অদৃশ্য সুতার টানেই নাচতে হবে স্বতন্ত্রদের। আমার ধারণা স্বতন্ত্র সদস্যরা আনন্দের সাথেই অদৃশ্য সুতার নাচের পুতুল হবেন। ভালো-মন্দ জানি না, এভাবেই নিয়ন্ত্রিত সমালোচনার সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ।

Print Friendly, PDF & Email