টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে নির্মাণ খাতের ভূমিকা

প্রকাশিতঃ 10:48 am | December 13, 2022

শরিফুল ইসলাম :

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানব উন্নয়নের জন্য জ্বালানি সংক্রান্ত সঠিক পদক্ষেপ খুব জরুরি, কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জ্বালানি ব্যবহারের মধ্যে সম্পর্ক বিদ্যমান। ২০৩০ ও তার পরবর্তী সময়ে টেকসই জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬% কিংবা তার ওপরে রাখতে হলে প্রয়োজনীয় জ্বালানির আবশ্যকীয়তাসমূহ পূরণ করতে হবে। জ্বালানির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্বালানি খাতে স্থায়িত্ব অর্জন করতে হলে কেবল জ্বালানি সরবরাহ নয়, জ্বালানি ব্যবহারেরও উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

বিভিন্ন পণ্য ও সেবা প্রদানের জন্য আবশ্যকীয় জ্বালানির পরিমাণ হ্রাস করা এ ব্যাপারে আবশ্যক। বর্তমান সময়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশে একটি সংকটময় পরিস্থিতির তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতির উত্তরণে জ্বালানি দক্ষতাসম্পন্ন বিল্ডিং (ভবন) তৈরি করতে হবে, যা জ্বালানি সাশ্রয় করবে; একইসঙ্গে গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস করে অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করবে।

বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। অবকাঠামো নির্মাণ প্রসঙ্গও এর বাইরে নয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ কৌশল ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। অবকাঠামো পরিবেশবান্ধব তখনই হতে পারে, যখন টেকসই নির্মাণ পদ্ধতির পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীও টেকসই হবে। এমন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করতে হবে, যা অধিকতর কম কার্বন নিঃসরণ করবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর উচ্ছিষ্ট অংশ সুব্যবস্থাপনার আওতায় না এনে যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়, যা আশপাশের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে।

টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। আমাদের বর্তমান সরকারও এর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। যেমন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এক আলোচনা সভায় বলেন, ‘কার্বনমুক্ত, টেকসই, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ল্যান্ডস্কেপিং, সৌরবিদ্যুৎ ইত্যাদি প্রয়োগের মাধ্যমে গ্রিন বিল্ডিং টেকনোলজি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেও কাজ করা হচ্ছে।’

বিশ্ব উষ্ণায়নের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ভাবনা থেকে ‘গ্রিন বিল্ডিং কনসেপ্ট’ জন্ম নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে গ্রিন বিল্ডিংয়ের অনেক রকম সংজ্ঞা রয়েছে, তবে মূল ধারণাটি একই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থার (ইপিএ) মতে, গ্রিন বা টেকসই বিল্ডিং হলো এক ধরনের চর্চা যা নির্মাণ, সংস্কার, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ধ্বংসের স্বাস্থ্যকর এবং আরও বেশি দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে। গ্রিন বিল্ডিং পরিবেশগত প্রভাবের দিকে নজর দেয় এবং এলাকা রক্ষা ও সংরক্ষণ করে। প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি না করে তৈরি করা হয় পরিবেশবান্ধব গ্রিন বিল্ডিং। অবকাঠামো তৈরির জমি নির্বাচন থেকে শুরু হয় এই প্রজেক্টের প্রাথমিক প্রক্রিয়া। অর্থাৎ অনুর্বর বা অনাবাদি জমিতে ভবন নির্মাণ গ্রিন বিল্ডিংয়ের অন্যতম শর্ত। ভবন নির্মাণ প্রণালির উপকরণগুলোও হতে হবে পুনঃব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব। এছাড়া গ্রিন বিল্ডিংয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি ও শক্তির অপচয় রোধ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎশক্তি কম ব্যবহার করে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়। ফলে বিদ্যুৎ খরচ ও কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। গ্রিন বিল্ডিংয়ে বৃষ্টির পানি ব্যবহার ও অপচয় কমিয়ে আনার বিষয়ও নিশ্চিত করা হয়। বিল্ডিংয়ে ব্যবহারকৃত পানি পুনঃব্যবহার করা হয়।

গ্রিন বিল্ডিং বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব গ্রিন বিল্ডিং তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠান গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৪৫টি ভবন লিড সনদ অর্জন করেছে। এরমধ্যে ৪২টি প্লাটিনাম, ৮৭টি গোল্ড, ১৪টি সিলভার ও ২টি সাধারণ সার্টিফিকেট রয়েছে। এছাড়া ৫৩৯টি ভবনের লিড সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে বেশ কয়েকটি নির্মাণ খাতের প্রতিষ্ঠান গ্রিন ও জ্বালানি সাশ্রয়ী ভবন তৈরির দিকে মনোযোগী হয়েছে।

সর্বোপরি, টেকসই নির্মাণ খাত তৈরিতে সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। যা ভবিষ্যতে এ খাত সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ভবন তৈরিতে সাহায্য করবে।

লেখক: সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, মীর গ্রুপ

Print Friendly, PDF & Email