আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই : প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিতঃ 11:52 am | November 24, 2022

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যেকোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য জনগণের আস্থা-বিশ্বাস একান্তভাবে দরকার। তাছাড়া আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, এই নীতি আমরা বিশ্বাস করি।

বৃহস্পতিবার (২৪ নভেম্বর) যশোর বিমানবাহিনীর কুচকাওয়াজে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

এর আগে সকালে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে যশোর আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সকাল সাড়ে ১০টায় যশোর বিমান বাহিনী একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে অবতরন করেন তিনি। এ সময় বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।

প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রীকে সশস্ত্র সালাম জানায় বিমান বাহিনীর চৌকস সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রী খোলা জীপে করে প্যারেড পরিদর্শন এবং সালাম গ্রহণ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, অনেক দেশে যখন দুর্ঘটনা হয়, আমরা তাদের সহযোগীতা করি, আবার আমাদের দেশে যখন ঝড়, বন্যা বা দুঘর্টনা ঘটে তখন বিমানবাহিনীর সদস্য, সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা জনগণের পাশে দাঁড়ায়, জনগণের সেবা করে, এটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, যেকোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য জনগণের আস্থা-বিশ্বাস একান্তভাবে দরকার। তাছাড়া আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, এই নীতি আমরা বিশ্বাস করি। তারপরেও দক্ষতার দিক থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আমাদের সব ধরনের উৎকর্ষতা বজায় রেখে চলতে হবে, সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশমাতৃকার প্রতি এবং দেশের জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। যেটা বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছেন, দেশ ও দেশের জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ, এটা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, আমাদের বিমান বাহিনী অত্যন্ত চৌকস দক্ষ বিমান বাহিনী। সঙ্গে আমাদের মেয়েদেরও বিমানবাহিনীতে যুক্ত করছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের বিমান বাহিনী অত্যন্ত চমৎকার ভূমিকা পালন করছে। আমরা সত্যিই সে জন্য গর্বিত।

তিনি বলেন, জাতির পিতা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তিনি আমাদের প্রতিরক্ষা নীতিমালা করে গিয়েছিলেন, আমরা তা বাস্তবায়ন করছি।

সরকারপ্রধান বলেন, আমাদের বিমানবাহিনীর একটি গৌরব উজ্জ্বল অধ্যায় রয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের।

জাতির পিতাকে হত্যার পর অন্তত ৬০০ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, পঁচাত্তরের পর থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত নানা ঘটনা ঘটে। আমরা আবার সরকারে আসার পর বিমান বাহিনীকে আবার নতুন করে গড়ে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করি।

‘শুধু অপারেশন এবং প্রশিক্ষণই নয়, আমরা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত সকল সদস্যদের জীবনযাত্রার মনোন্নয়নে নানামুখী কল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’

তিনি বলেন, আমি চাই আমাদের ক্যাডেটদের জীবন সুন্দর হোক, সফল হোক এবং বাংলাদেশ যেন আমাদের ক্যাডেটদের নিয়ে গর্ব করতে পারে। তাছাড়া শান্তিরক্ষা মিশনেও আমাদের বিমান সেনারা কাজ করে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চলতে হয়। সে জন্য প্রশিক্ষণের কথা সবসময় মনে রাখতে হবে এবং প্রশিক্ষণের ওপরই সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশিক্ষণ উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করে এই কথা সবসময় মনে রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা স্বাধীন দেশ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছি। আমরা বিজয়ী জাতি। আমরা বিশ্ব দরবারে সবসময় মাথা উঁচু করে চলবো, এটাই আমাদের লক্ষ্য।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। জাতির পিতার উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর একটি ড্যাকোটা বিমান, একটি অটার বিমান ও একটি অ্যালুয়েট হেলিকপ্টারসহ ৫৭ জন সদস্য নিয়ে ‘কিলো ফ্লাইট’ নামে এ বাহিনী যাত্রা শুরু করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও সামরিক কৌশলগত দিক বিবেচনায় রেখে একটি আধুনিক, শক্তিশালী ও পেশাদার বিমান বাহিনী গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তে স্বাধীনতার পরপরই বিমান বাহিনীতে সংযোজিত হয় সেই সময়কার অত্যাধুনিক সুপারসনিক যুদ্ধবিমান, পরিবহন বিমান, হেলিকপ্টার এবং এয়ার ডিফেন্স রাডার।

সরকারপ্রধান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার জাতির পিতার অপরিসীম প্রজ্ঞা এবং দূরদৃষ্টিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে একটি যুগোপযোগী, প্রযুক্তিগতভাবে সুসজ্জিত ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাঁর সরকারের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে বিমান বাহিনীতে সংযোজিত হয় চতুর্থ প্রজন্মের অত্যাধুনিক মিগ-টুয়েন্টি নাইন যুদ্ধবিমান, সি-ওয়ান থার্টি পরিবহন বিমান এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এয়ার ডিফেন্স রাডার।

তিনি আরো বলেন, ২০০৯ সাল হতে এ যাবৎ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন ও অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এফ-সেভেন বিজিআই যুদ্ধবিমান, সর্বাধুনিক অ্যাভিওনিক্সসমৃদ্ধ সি-ওয়ান থার্টি জুলিয়েট পরিবহন বিমান, এম আই-ওয়ান সেভেন ওয়ান এসএইচ হেলিকপ্টার, মেরিটাইম সার্চ এন্ড রেসকিউ হেলিকপ্টার সংযোজনসহ আমরা নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৪ সালে প্রণীত জাতির পিতার প্রতিরক্ষা নীতির আলোকে তাঁর সরকার সশস্ত্র বাহিনীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ প্রণয়ন করেছে। যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন ধরনের বিমান, হেলিকপ্টার, রাডার ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের সুষ্ঠু, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী রক্ষণাবেক্ষণ এবং ওভারহলিং এর লক্ষ্যে আমরা নির্মাণ করেছি ‘বঙ্গবন্ধু এরোনটিক্যাল সেন্টার’। দেশের অ্যাভিয়েশন সেক্টরকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে আমাদের সরকার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপন করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী একাডেমির সুনাম আজ দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ব্যপ্তি লাভ করেছে। বন্ধুপ্রতিম বিভিন্ন দেশের অফিসার ক্যাডেটগণ এই একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। আজ এই প্যারেডে অংশগ্রহণ করছেন নেপাল, ফিলিস্তিন ও জাম্বিয়ার অফিসার ক্যাডেটগণ।
তিনি এ সময় জাতির পিতার ভাষণের উদ্ধৃতি তুলে ধরেন।

জাতির পিতা মিলিটারি একাডেমিতে একদিন বলেছিলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, এমন দিন আসবে, এই একাডেমির নাম শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়, সমগ্র দুনিয়াতে সম্মান অর্জন করবে’। সত্যিই আমরা জাতির পিতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছি।

তাঁর সরকার সবসময় বিমান বাহিনীর সদস্যদের সার্বিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ সুবিধাদির উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের উপর গুরুত্ব প্রদান করে যাচ্ছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, উন্নততর ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ সুনিশ্চিত করার জন্য সংযোজন করা হয়েছে অত্যাধুনিক ফ্লাই-বাই-ওয়্যার এবং ডিজিটাল ককপিট সম্বলিত ইয়াক ওয়ান থার্টি কমব্যাট ট্রেইনার, কে-এইট ডব্লিউ জেট ট্রেইনার, এল ফোর ওয়ান জিরো ট্রান্সপোর্ট ট্রেইনার, এ ডব্লিউ ওয়ান ওয়ান নাইন কেএক্স হেলিকপ্টার ট্রেইনার এবং বিভিন্ন ধরনের সিমুলেটর। অতি সম্প্রতি সংযোজন করা হয়েছে গ্রোব প্রশিক্ষণ বিমান। এছাড়াও, বিমান বাহিনীর বৈমানিকগণের নৈশকালীন উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ সহজতর করার লক্ষ্যে নাইট ভিশন ট্রেইনার সংযোজন করা হয়েছে।

তাঁর সরকার হেলিকপ্টার সিমুলেটর ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং এয়ারম্যান ট্রেনিং ইনস্টিটিউট-এর সাংগঠনিক কাঠামোরও অনুমোদন দিয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, অতি সম্প্রতি এয়ার কমান্ড অপারেশন সেন্টারের সাংগঠনিক কাঠামোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে, আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন নিশ্ছিদ্র হয়েছে, তেমনই দেশের আকাশ সীমায় বিমান পরিচালনার সুবিস্তৃত পরিসর পর্যবেক্ষণ সহজতর হয়েছে।

কালের আলো/এনএল/পিএম

Print Friendly, PDF & Email